আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ১

কানাডা, ২৫ জানুয়ারী ২০২১, সোমবার

আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ১

আবুল জাকের | ২৫ নভেম্বর ২০২০, বুধবার, ১২:৪৭


আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ১

আমার ৫ রাতের ভুটান সফর। সময় ২২ এ এপ্রিল ২০১৮ থেকে ২৭ এ এপ্রিল ২০১৮। ভুটান দেখার ইচ্ছাটা জেগেছিল  বোধহয় ২ বছর আগে। তারপর আমার বাংলাদেশের আইনজীবী কফিল ভাই এই ইচ্ছাটাকে আরও তীব্র করে তুলে । রোটারিয়ান কাদের ভাইকে জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন, সুন্দর জায়গা, ভালো লাগবে। ঠিক হয়ে গেলো যাওয়া। ২২ এ এপ্রিল সকালে ফ্লাইট। ছোট বিমান। একটাই বিমান যায় ওখানে ঢাকা থেকে। ভুটান সরকারের।  যাবার প্রস্তুতি হিসাবে গরম কাপড় ও নিতে হল। জেকেট ছিল না বলে মুস্তফা থেকে কেনা হল একটা। সাথে কান্টুপি ও  অন্যান্য় সামগ্রী যোগার করে দিলো তিথি, আমার মেয়ে। গুছিয়ে দিলো সবকিছু। আর একজনের কথা না বললেই নয়। সোহেলি। আই টি সি র ম্যানেজার। সব কিছু সাজিয়ে দিয়েছে ও।

পারোতে এসে নামলাম দুপুরে। রীতিমত ঘাবড়ে গিয়েছিলাম লান্ডিং এর সময়। ট্রাভেল এজেন্ট আগেই সাবধান করেছিল। পর্বত মালার ফাকে ফাকে পাঁচ টি টার্ন নিয়ে লেন্ড করতে হয়। চতুর্দিকে পর্বতমালা। মাঝখানে বিমান নামার জায়গা। নেমে দেখালাম খুব সুন্দর এয়ারপোর্ট। একেবারে অন্য রকম। ভুটানের ঐতিহ্যর সাথে মিল রেখে তৈরি। খুব কালারফুল।

কাস্টম ও ব্যাগ পেতে খুব একটা দেরী হোল না। আমার প্যাকেজ টা ছিল একটু অন্যরকম। আমি একা। সাথে আমার নাতনী আদিরা যাবার কথা ছিল। তাই শেষে   আমি একাই গেলাম। তাই আমি একা, আমার জন্য বুক করা ছিল প্রাইভেট কার। সাথে চালক কাম গাইড। পুরো সাপ্তাহর জন্য। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। বের হয়ে  দেখলাম সে দাড়িয়ে আছে প্ল্যাকার্ড হাঁতে। কম বয়সী এক যুবক। নাম সুনম। অমায়িক ছেলে। বিবাহিত। এক সন্তানের জনক। দু জনই কাজ করে। সুমন আমাকে সাহায্য করলো সুটকেস নিতে। একটু দূরে ছিল পারকিং।

আমাকে যেতে হবে ভুটানের রাজধানী থিম্ফুতে। এক ঘণ্টার ড্রাইভ। পর্বত মালার দেশ ভুটান।  হিমালয়ের অংশ। এ রকম দেশ আমি প্রথম দেখছি। অনেকে এটাকে সুইজারল্যান্ডের সাথে তুলনা করে। যাত্রা শুরু হোল। খুব সুন্দর রাস্তা। পাহাড়ের গা ঘেঁষে। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পথে পাহাড়ি নদীর পারে নামলাম। হিমালয় থেকে নেমে আসা পাথরের মাঝ দিয়ে হেসে খেলে বয়ে যাচ্ছে। একটা পর্যটকের দলকে দেখালাম। খুব স্বচ্ছ পানি। তলা পর্যন্ত দেখা যায়। বেশ কতক্ষণ দাড়িয়ে উপভোগ করলাম এর বয়ে যাওয়া। রোপ স্লাইড দিয়ে অনেকে নদীর ওপার যাচ্ছে ও ফিরে আসছে। দেখলাম এক মহিলা চালু করেছে এটা। নদীর অপারে থাকে।

 

আবার শুরু হোল যাত্রা। পথে গাইড দেখাল নদীর পাড়ের মন্দির ও সেখানে যাবার জন্য আয়রন ব্রিজ। নামিনি  কারন পুলটা বেশ নিচে। হাটতে হবে বেশ খানি। সাহস করলাম না। হোটেলে এসে পৌঁছলাম দুপুরের আগে। নাম মিগ্মার হোটেল। রুম টা চার তালায় ছিল। সুন্দর রুম । ছিমছাম। বিশাল বেড। সবসময় রুমে ঢুকে আমি বাথরুম দেখে নেই। বাথরুম টা বেশ সাজানো। সব সুবিধা আছে। লাঞ্চ করে বেরতে হবে। গাইড সুমন তিনটার সময় লবিতে থাকবে।

ডাইনিং হল টা বেশ বড় ও ঝকঝকে। বুফে। সব খাবার সাজানো আছে। আমি তো ভেজিটারিয়ান। তাই খাবার গুলি কি জানতে চাইলাম। বেশ কিছু শব্দ জানতে পারলাম তাতে। যেমন মাশরুম কে ওরা বলে “সামু”, পনির কে বলে “ডাটসি”, চিকেন কে বলে “জসা”, মাংস কে বলে “সা” , কারিকে বলে “তেসেম”। সবজি ভালই ছিল। বুদ্ধিস্ট কান্ট্রি। বোধহয় সে জন্য।

দু দিন ছিলাম থিম্পুতে। দেখা হোল জাতীয় পার্ক বা চিড়িয়াখানা, সাঙ্গিয়ান ভিউ পয়েন্ট, ফরট ভিউ পয়েন্ট , ফরট্রেস ও ফ্লেগ স্টেন্ড, ফারমারস মার্কেট, ফুটবল স্টেডিয়াম , ক্লক টাওয়ার  এরিয়া,  বুদ্ধা পয়েন্ট , থিম্পু গার্ডেন ও চেরি মনাস্টারি। বিশাল পাহাড়ের উপর প্রাকৃতিক চিড়িয়াখানা। সামান্য উঠার চেষ্টা করলাম। গাইড হাত ধরে সাহায্য করছিল। বেশ কিছু পথ উঠে আর উঠতে সাহস হয় নি। নিচে নেমে এলাম। সেখান থেকে বেরিয়ে একটা স্পট এ এসে দাড়াল গাড়ী। রাজা যেখানে থাকেন সেই দুর্গ টা সুন্দর দেখা যায় সেখান থেকে। হোটেলে লাঞ্চ সেরে আবার বেরিয়ে পরলাম। দেখা হোল ক্লক টাওয়ার প্রাঙ্গন। সারি সারি দোকান , হাঁতে তৈরি জিনিস বিক্রি করে তারা এখানে। ইয়াক উলের ছোট্ট একটা বেগপেক কিনলাম নাতনি ইনারার জন্য। ফুটবল স্টেডিয়াম ও দেখা হোল।  সুন্দর মাঠ টি। এবার বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মেয়েদের খেলা এখানেই হয়েছে।  এক্টুকুও ময়লা নেই সমস্ত মাঠে। বেশ কালারফুল গ্যালারি। সেখান থেকে সোজা রাজ বাড়ীতে। ফ্লেগ নামাবার অনুষ্ঠান দেখতে। অদ্ভুত সুন্দর করে এক দল সৈন্য ফ্লাগ নামাল ও তার পর সারি বেধে দাড়িয়ে ঘাড়ে করে মার্চ পাস্ট করে নিয়ে গেলো। এমনটি আর আগে দেখিনি নি। প্রায় আধ ঘন্টা লাগলো তাদের চলে যেতে। ফিরে এলাম হোটেলে।

পরের দিনের দেখা জায়গা গুলু হোল  বুদ্ধা পয়েন্ট , থিম্পু গার্ডেন ও চেরি মনাস্টারি। সকালের দিকে যাত্রা শুরু বুদ্ধা পয়েন্ট এর দিকে। পর্বতের মাথার উপর এই বুদ্ধা  পয়েন্ট। সদ্য সমাপ্ত হয়েছে চীনাদের অনুদানে। শুধু  উঠছি তো উঠছি। মাঝে একবার নামলাম  নিচে শহরকে কেমন দেখা যায় দেখতে। মাঝে মাঝে রঙিন কাপড়ের ছোট ছোট টুকরা ঝুলানো। বুদ্ধার বাণী লিখা। ওদের বিশ্বাস এটা নাকি পথচারিদের বিপদ্মুক্ত রাখে। বাতাসে পত পত করে উড়ছে। বেশ কিছুক্ষন ড্রাইভের পর দৃষ্টিতে আসলো বুদ্ধা পইন্ট। এলাহি কান্ড সেখানে। না গেলে বুঝা মুশকিল। অনেকটা তাইওয়ানের  পেসিফিকের পারে পাহাড়ের চুড়ায় বিশাল বুদ্ধা মূর্তির মতো। তাইওয়ানকে পাহারা দিচ্ছে। আমি আর জেসমিন ২০১১ তে গিয়েছিলাম ওখানে। ভুটানের বুদ্ধা  সে রকমের।  রক্ষা করছে ভুটানকে। ভিতরে অসংখ্য ছোট ছোট বুদ্ধা মূর্তি। চারিদিক অপূর্ব কারুকাজ করা। তবে ভিতরে ছবি তোলা বারন। তাই তার ছবি নেই।  চারিদিক থেকে বুদ্ধাকে ঘিরে আছে স্বর্গের অপ্সরীরা। অনেক্ষন বসে ছিলাম ওখানে । বেশ ভালো লাগছিল। কেমন একটা  প্রশান্তি মনটাকে ছেয়ে যাচ্ছিল। যেতে মন চাইছিল না।

ওখান থেকে বেরিয়ে শহরে সোজা  থিম্পু গার্ডেনে। রাজার বোনের নামে। খুব সুন্দর বাগান টা। ফুলে ফুলে  ছেয়ে আছে। হরেক রকম ফুল। ঘন্টা খানিক কাটিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে লাঞ্চ খেতে। আবার বেরতে হবে। যেতে হবে চাগ্রি বা চেরি মনাস্টারিতে।

পাহাড়ের কোল বেয়ে মন মাতানো পথ। মসৃণ রাস্তা। কোথাও একটু ভাঙ্গা নেই। একে বেঁকে উপরে উঠছে তো উঠছে। গাইড খুব সুন্দর ভাবে গাড়ী চালাচ্ছে। নিয়ম মেনে চলছে। শহরেও দেখেছি কেউ হর্ন বাজায় না। যে যার যার লেইনে  চলছে। বাংলাদেশ ভুটানের এত কাছে, তবু আমারা এটা শিখি নি। মাঝে মাঝে থেমে ছবি তুলছিলাম। নিচে তাকালে দেখা যায় শহর। তবে খুব ছোট, খেলনার মত। আমরা তখন ২০০০ মিটার এর ও বেশী উপরে। দূরত্ব বেশী নয়। কিন্তু আঁকা বাঁকা পথে যেতে সময় লাগছিল। প্রায় ২ ঘন্টা পর ওখানে  পৌঁছলাম। এখানেই জন্ম হয়েছিল ভুটান রাজ্য ১৬০০ এর দিকে। তিব্বত থেকে এসেছিলেন রাজা। তখন নেপাল ও সিকিম ভুটানের ভিতরে ছিল। ইতিহাস বলে ৮  চেঞ্চুরি তে প্রথম পা  পড়ে তিব্বত রাজাদের। ১৩ চেঞ্চুরিতে প্রথম ভূটান রাজ্য ঘটন হয়। ১৭০০ সাল পর্যন্ত রাজা ওখানেই থাকতেন। বর্তমানে এটা একটা ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র। মেডিটেসানের স্থান। আমি পর্বতের নিচ থেকে দেখেছি। অনেক উপরে ওটা। জাতীয় উদ্যানের মাঝ দিয়ে হাটতে হবে উপরে যেতে হলে। খুব সুন্দর একটা কাঠের পুল আছে সেখানে। নিচে বয়ে চলেছে  খরস্রোতা পাহাড়ি নদী। ইচ্ছা হচ্ছিল আর একবার এসে তিন মাস থাকব যদি জীবন সময় দেয়।

ফেরার পথে আবার ক্লক টাওয়ার ঘুরে হোটেলে ফিরে এলাম। পরের দিন যেতে হবে পুনাখা। দু  ঘন্টা ড্রাইভ  পাহাড়ি পথ বেয়ে।

চলবে…

আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ১  ।। ধারাবাহিকভাবে চলবে… পরবর্তী  পর্ব দেখার জন্য চোখ রাখুন এবং সিবিএনএ২৪ এর সঙ্গে থাকুন …

 

 



সর্বশেষ সংবাদ

দেশ-বিদেশের টাটকা খবর আর অন্যান্য সংবাদপত্র পড়তে হলে CBNA24.com

সুন্দর সুন্দর ভিডিও দেখতে হলে প্লিজ আমাদের চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Facebook Comments

চতুর্থ বর্ষপূর্তি

cbna 4rth anniversary book

Voyage

voyege fly on travel

cbna24 youtube

cbna24 youtube subscription sidebar

Restaurant Job

labelle ads

Moushumi Chatterji

moushumi chatterji appoinment
bangla font converter

Sidebar Google Ads

error: Content is protected !!