৭ মার্চের ভাষণ বাজানো নিয়ে নিজের অবস্থানে অনড় ইমি
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিনে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল ছাত্র সংসদের সাবেক সহসভাপতি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি বলেছেন, ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো নিয়ে তার কর্মসূচি ছিল ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ’ এবং সেই অবস্থান থেকে তিনি সরে আসবেন না।
‘স্লোগান ৭১’ এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইমি গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি এখনো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আমি কোনো অন্যায় করিনি, আমার সঙ্গে রাষ্ট্র অন্যায় করেছে।”
গত ৭ মার্চ রাতে রাজধানীর শাহবাগ থানার সামনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানোর সময় ইমিকে আটক করা হয়। পরদিন ৮ মার্চ তাকেসহ তিনজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায় ঢাকার মহানগর হাকিম জুয়েল রানার আদালত।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানো অপরাধ কি না, সেই প্রশ্ন তখন ওঠে। ইমিকে গ্রেপ্তার করার বিষয়টি নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় নানামুখী আলোচনাও হয়।
এরপর গত ৩০ এপ্রিল বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের হাই কোর্ট বেঞ্চ তাকে জামিন দেন। দুই মাস কারাভোগের পর ৭ মে বিকালে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান ইমি।
তার ভাষ্য, ৭ মার্চ দুপুরে শহীদুল্লাহ হলের সামনে থেকে আসিফ আহমেদ নামে এক শিক্ষার্থীকে ‘অন্যায়ভাবে তুলে নেওয়ার’ প্রতিবাদেই তিনি কর্মসূচি দিয়েছিলেন।
চানখাঁরপুল মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজাতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ আহমেদ এবং এক মাইক অপারেটর আটক হন।
ইমি বলেন, “৭ মার্চের ভাষণ যেহেতু আমাদের গৌরবের একটি অংশ এবং এটি যেহেতু নিষিদ্ধ করা হয়নি কিংবা এটি শুধু আওয়ামী লীগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না, এটি আসলে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়।
“তো সেইজন্য আমার মনে হয়েছিলম এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ হওয়া উচিত। সেই কারণে আমি শাহবাগ থানার অপোজিটেই কর্মসূচি দিই, যাতে আসিফকে ছেড়ে দেওয়া হয়।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ–ডাকসু নির্বাচনে বাম সংগঠনগুলোর ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী ছিলেন ইমি।
তিনি বলেন, কর্মসূচিতে তারা শুধু ভাষণ বাজিয়েছিলেন, নিজেদের কোনো বক্তব্যও দেননি।
“আমাদের কর্মসূচি এতটুকুই ছিল। তো এরকম একটা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও যে এত বাজেভাবে সংঘাতময় করা যায়, এটি আসলে আমার ধারণার বাইরে ছিল।”
ইমির অভিযোগ, প্রথমে রিকশার ব্যাটারি ছিনতাই করা হয়, এরপর রিকশা ভাঙচুরের চেষ্টা হয়। তিনি রিকশায় বসে বাধা দিতে গেলে তাকে টেনে শাহবাগ থানার ভেতরে নেওয়া হয়।
“আমার পাশে যে আমার ছোট ভাই মামুন ছিল, নৃশংসভাবে ওইদিন ওর গায়ে হাত তোলা হয়। ওকে রক্তাক্ত করা হয়। আমার গায়ে হাত তোলা হয়।”
ইমির অভিযোগ, ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদ ও সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়েরের নেতৃত্বে জাতীয় ছাত্রশক্তির কয়েকজন সেই হামলায় ছিলেন।
“আরও অনেকে সেখানে ছিল। রাইয়ান নামে একজন ছিল, ছাত্রশক্তির তাহমিদ…।”
সেদিন রাত সাড়ে ৯টায় কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর রাত ১০টার দিকে কয়েকজন এসে মাইক ও ব্যাটারি ভেঙে ফেলে। আয়োজকরা বাধা দিলে হাতাহাতি হয়।
এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ডাকসু ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা সেখানে যান। পরে মোসাদ্দেক ও জুবায়ের রিকশাটি টেনে শাহবাগ থানার ভেতরে নিয়ে যান।
এ সময় ইমির সঙ্গে থাকা মামুনকে ছাত্রলীগ তকমা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে থানার ফটকে নিয়ে মারধর করা হয়। মারধর করা হয় ইমিকেও। জুলাই অভ্যুত্থানের পর মামুন সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে ইমি বলেন, “আমাদেরকে যখন পেটানো হচ্ছিল, যে পুলিশ আমাদেরকে নিরাপত্তা দিতে পারে নাই, যে পুলিশ আসলে এই নৃশংসতার হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করতে পারে নাই, তারাই যখন আবার আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়, এর চাইতে বড় হতাশার আসলে কিছু হয় না।”
পরদিন ইমিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে শাহবাগ থানা পুলিশ।
মামলায় অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা “মসজিদের দিকে মুখ করে লাউড স্পিকারে উসকানিমূলক স্লোগান” দেন। তারা “সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কার্যক্রম সচল করার” চেষ্টা করেন।
তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাজে বাধা ও থানা হেফাজত থেকে আসিফ আহমেদকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও আনা হয়।
এ অভিযোগের জবাবে ইমি বলেন, “একটা যৌক্তিক দাবি আদায় করার জন্য বা একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য যদি আমাকে নিষিদ্ধ সংগঠনের ট্যাগ দেওয়া হয়, সেই ট্যাগ নিতে আমার আসলে কোনো আপত্তি নাই এবং আমি আসলে সেগুলো পরোয়াও করি না।”
তার ভাষ্য, নিষিদ্ধ সংগঠনের নাম দিয়ে কাউকে নিপীড়ন করা হলে তার প্রতিবাদ তিনি চালিয়ে যাবেন।
“ভবিষ্যতেও আমার এই কর্মসূচিগুলো যদি কখনো প্রয়োজন পড়ে, সময়ের প্রয়োজনে আমি যেহেতু রাজপথের মেয়ে, আমি বারবারই হয়ত রাজপথে নেমে আসব।”
পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে জানতে চাইলে ইমি বলেন, ‘‘মামলা মোকাবিলার পাশাপাশি যারা তাদের ওপর হামলা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ‘ন্যায়বিচার পাওয়ার’ চেষ্টা থাকবে তার।’
যারা সেদিন আমাদেরকে আঘাত করেছিল, তারা তো ফৌজদারি অপরাধ করেছিল। যারা আমার সহযোদ্ধা ছিলেন, তাদের সাথে যোগাযোগ করে, তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে অবশ্যই আমরা আমাদের ন্যায়বিচারটি যাতে নিশ্চিত হয় সেই ব্যাপারে আমাদের প্রচেষ্টা তো থাকবেই।”
ওই ঘটনার পর পরিবারের উদ্বেগের কথা তুলে ধরে ইমি বলেন, তার পরিবার এখন তাকে কোথাও একা ছাড়তে সাহস পাচ্ছে না।
“আমার বাবা শারীরিকভাবে অনেকখানি অসুস্থ হয়ে গিয়েছেন শুধু আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কারণে।”
রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, “আমি তো আসলে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে কখনো আপস করি নাই এবং আমি কখনো অন্যায়ের সাথে আপস করি নাই। কারো সাথেই করি নাই। তো আমি ভবিষ্যতেও এই অবস্থানে অনড় থাকব ইনশআল্লাহ।”
আবারও ওই ধরনের কর্মসূচি দেবেন কি না–এমন প্রশ্নে ইমি বলেন, “আমি যেহেতু রাজপথের মেয়ে, সময়ের প্রয়োজনে বারবার আমি রাজপথেই ফিরে আসব। আসলে রাজপথ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।” –বাংলাদেশ জার্নাল




