ভ্রমণ

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের  | পর্ব ৩

পূর্ব প্রকাশের পর…

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের  | পর্ব ৩

৭ টায় ডিনার। ডেকে শেখ রহমতুল্লার সাথে আড্ডা মারছিলাম। ছবি তুলছিলাম মাঝে মাঝে। মেঘলা আকাশ ,তবুও সুন্দর। ডুবে যাওয়া সূর্য অপূর্ব রং ছড়াচ্ছে আকাশে। ডিনার ভালই ছিল। পাংগাস ফিলে, স্টার ফ্রাই ভেজ, বাঁধাকপি সাথে হরেক রকম সি ফুড।

ডিনার এর পর চলে গেলাম ছাদে। ছিলাম প্রায় ১০ টা পর্যন্ত। ছবি তুললাম ভরা চাঁদের। আমাদের গাইড “মিস থুম্ব” বেশ ফ্রেন্ডলি। বুঝিয়ে দিলো আগামী কালের রুটিন। আমাকে অনেক সাহায্য করেছে মহিলা। হাত ধরে নামানো উঠানো। লাগেজ কেরি করা। ইত্যাদি ইত্যাদি। ফিরে এলাম রুমে। ভুল করেছিলাম পুরো লাগেজ নিয়ে এসে। হোটেলে রাখা উচিৎ ছিল।

রুম সুন্দর ও আরামদায়ক। বাথরুম সত্যিই সুন্দর। ঝক ঝক করছে। কুইন বেড বিছানা। সুন্দর করে সাজানো। ঠিক হোটেলের মত। ড্রেসিং টেবিল, কাবারড, ইন্টারকম সব আছে।  কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে এলাম বাইরে। ফিশিং এর ব্যবস্থা আছে। এই প্রথম স্কুইড দেখলাম পানিতে। চেষ্টা করলাম ধরতে। পারলাম না। স্টাফ টা বেশ কিছু স্কুইড ধরেছে তখন। আগামী কালের জন্য। রুমে ফিরে গেলাম। সকাল ৪ টায় উঠতে হবে সূর্য উঠা দেখতে।

৬:৩০ টায় ডেকে “তাই চিঁ” এক্সারসাইজ। ৭:৩০ টায় ডেকে প্রাতরাশ। আমরা তখন এগুচ্ছি “তিএন কা সঙ” কেভ এর দিকে। গুহায় আমার যাওয়া হয় নি। কারন কিছুটা পাহাড়ে উঠতে হবে। তাই ল্যান্ডিং স্টেসানে রয়ে গেলাম। আমার সাথে আরও অনেকেই ছিল। বিভিন্ন বোট থেকে আসা যাত্রীরা। আমি আর শেখ বেঞ্চে বসে গল্প করছিলাম।উপসাগরের মাঝে, ছোট্ট একটা দ্বীপ, চারদিকে শুধু জল আর জল।ভীষণ চুপচাপ। ছবি তুলছিলাম। বোটে শেষ লাঞ্চ খেলাম ১২ টার দিকে। একটু আগেই হয়ে গেলো। ভালো খাবার। বহুদিন পর কেশর খেলাম। অনেক আগে বাংলাদেশে পাওয়া যেত। আমি তখন ছোট। এখন হারিয়ে গেছে। গরমে ভালো লাগে খেতে। কাঁচা খেতে হয়। হালকা মিষ্টি। কচকচে। আমাদের দেশ থেকে অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে।নরসিংদীর সাগর কলা ত আর নেই। ১৯৭৫/৭৬ এর অনেক কিনেছি। কাটারি ভোগ চাল এখন শুধু গল্পকাথা। বড় কালো জাম ও এখন খুব একটা দেখা যায় না। মাখনা ত হারিয়েই গেছে। বিলেতি গাব টিকে আছে অনেক কষ্টে। আমি ঢাকা গেলে গুলশান থেকে কিনে খেতে হয়, একটি নিরদ্রিষ্ট জায়গা থেকে। এখন ত যা আরম্ভ হয়েছে, প্রাচীন কিছু আর থাকবে না উন্নতি ও আধুনিকতার জ্বালায়। শুনলাম টি এস সি এবং কমলাপুর রেল স্টেসান ভেঙ্গে ফেলা হবে উন্নয়নের জোয়ারে। সব শেষে মজার গ্রিন টি। ভিয়েতনামের এই চা টা সত্যি অনন্য।

বিকেলে ফিরে আসি হোটেলে। আসার পথে একটা শপে নামলাম। লোকাল প্রডাক্ট বিক্রি করছে। আমাদের আরং এর মত।  কতক্ষণ দেখে বেরিয়ে এলাম। আমার যেটা দরকার পেলাম না। অপূর্ব স্টেচু দেখলাম বাইরে। লাইম স্টোনের। মেয়েদের।উলঙ্গ কিন্তু খুব আরটিস্টিক। ভীষণ নিখুত কারুকাজ। আমার বন্ধু নীলকে পাটঠিয়েছিলাম। বলেছে চমৎকার আর্ট। মেয়েরা অনেক আগেই তাদেরকে পণ্য বানিয়েছে এই শিল্পে। তবে শিল্প ত শিল্পই। রাস্তায় কোনও ট্র্যাফিক পুলিশ দেখি নি। কোনও রাশ ড্রাইভিং নেই। কোন হর্ন নেই। সবাই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছে। রাতের খাবার একটি ভিয়েতনামের রেস্টুরেন্ট এ খেয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। আগামী কাল সকালে চেক আউট করে বেরতে হবে। কিছুক্ষন রেস্ট নিয়ে চলে গেলাম ছাদে। ১৫ তালায়। ছবি তুললাম রাতের হেনয় এর। চাঁদ তখন আকাশে। হেনয় এর আকাশে চাঁদ। ছবি নিলাম কিছু। ছাদে বেশ কিছু ফুলের গাছ ছিল। ধরে রাখলাম ক্যামেরায়।

১৮ জুন। চেক আউট করে লবিতে বসে আছি। বিমান বন্দরে যাবার আগে বেশ কয়েকটি পুরানো জায়গায় যাবো। আমার আবার আবদার ছিল একটি পুরানো পার্কে যাবার বিশাল বট গাছ দেখতে ও পদ্মের ছবি তোলার। পদ্ম তাদের জাতীয় ফুল। মেঘলা আকাশ। প্রথমে গেলাম “হো চিঁ মিন” কমপ্লেক্স । তাদের নেতা ও ফাউন্ডার এর মৃতদেহ এখানে সংরক্ষিত। লম্বা লাইন। গাইড জানালো সময় কম হাতে। তাই ভিতরে যাওয়া হল না। ওখানে মায়ানমারের দম্পতিদের সাথে দেখা। ছবি তুলে নিলাম একসাথে। এক মধ্যে সময় ও শেষ। বের হয়ে যেতে হবে এখান থেকে।

সেখান থেকে “ওয়ান পীলার” প্যাগোডা। বৌদ্ধ উপাসনালয়।  ১০৪৫ তে তৈরি। লি ডাইনেস্টির সময়।  ১১০৫ সালে এটাকে আবার রেনোভেট করা হয়। ১৯৫৪ তে ফারাসিরা এটাকে ধ্বংস করে ফেলে। কিন্তু ১৯৫৫ তে এটাকে আবার আগের আদলে তৈরি করা হয়। সম্রাটের স্ত্রীর সন্মানে তার প্রথম পুত্র সন্তানের জন্মের পর। গৌতম বুদ্ধের জন্মদিন ও এখানে পালন করা হয়। বেশ কয়েকবার এটাকে মেরামত করা হয়েছিল ১৮৪০ ০ ১৯২২ এ। অবাক লাগে।ভারতের গৌতম বুদ্ধ এখন থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মায়ানমার ও জাপানে সুন্দর ভাবে বেচে আছে। তাই বোধহয় মানুষগুলো এত ভালো।

পরে যাওয়া হোল “টেম্পল অফ লিটারেচার”। কনফুচিয়াস এর স্মরণে। সবচেয়ে পুরানো ভার্সিটি এবং প্রথম। ১০৭০ এ তৈরি। ১৪০০ দিকে এটার কলেবর বাড়ানো হয় । অনেক ঝড় ঝাপ্টা পার করে এটি টিকে আছে এখনো। ফারাসিরা যুদ্ধের সময় হাসপাতালের জন্য কিছু অংশ নষ্ট করেছিল। সার্বিক পুনরুদ্ধার করা হয় ১৯২০,১৯৫৪ এবং ২০০০ সনে।  খুব সুন্দর জায়গাটা। এখনো সার্টিফিকেট দেবার অনুষ্ঠান এখানে হয়। যদিও নতুন ভার্সিটি অন্য জায়গায় চলে গেছে।  একটা প্রোগ্রাম হচ্ছে দেখলাম। ভিতরে কফুচিয়াস এর মন্দির। এখানে ঢুকার রাস্তায় দুইটা করে দরজা আছে। একটি দরজা দিয়ে সন্মানিত ব্যক্তিরা ঢুকবে। অন্যটা দিয়ে যাবে সাধারণ মানুষ। মানুষে মানুষে বিভাজন আদিকাল থেকে চলে আসছে। ভারতে যেমনটি ছিল ব্রাহ্মণদের নিয়ে। ওরা ছিল সমাজপতি। ওদের কথায় সমাজ চলত। ধর্মকে ওরা চালিত করত। শোষণ করত সাধারণ মানুষদের। হিন্দুরা অনেক কষ্টে এর থেকে বেরিয়ে এসেছে এখান  থেকে ভারতবর্ষে। একসময় পশ্চিমা দেশেও তাই ছিল। ধর্মযাজকদের কথাই শেষ কথা। তারা বেরিয়ে এসেছে ওখান থেকে কয়েকশ বছর আগে। ধর্ম আর আধুনিক রাজনীতি একসাথে বেমানান।

দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশে অনেক প্রাচীন সম্পদ কি ভাবে আমরা হারিয়ে ফেলছি। পুরানো ঢাকার মোঘল আমলের কীর্তি। বুড়িগঙ্গার পার ঘেঁষে গড়ে উঠা সভ্যতা। কুমিল্লা এবং বগুড়ার বৌদ্ধ ভার্সিটি। পাল বংশের আরও অনেক পুরানো কীর্তি, মন্দির, প্যাগোডা। পুরানো মসজিদ। টি এস সির ভিতরের ছোট্ট প্রাচীন মন্দিরটি নাকি এখন নেই। ঢাকার লালবাগের বড় কাটারা ও ছোট কাটারা দেখে মনে হয় আর দু শ বছর পরে কেউ দেখতে পাবে না। ছোট ইট দিয়ে তৈরি কি সুন্দর গাথুনি। যে ঢাকার লালমাটিয়ার সাত গুমবুজ মসজিদ আমি ১৯৭৫ এ দেখেছি এখন তা আর নাই। নদীতে তলিয়ে গেছে। গড়ে উঠছে নতুন অট্টালিকা। এ রকম হাজার উদাহরন আছে।  এইগুলো ধরে রাখতে আমরা পারিনি। মেতে আছি নতুন জৌলুস নিয়ে। ভাবছি না আমাদের অতীতকে ধরে রাখতে। ওটাইত একটা জাতির আভিজাত্য। আমাদের পুরানো ঢাকা ভিয়েতনামের আদলে “অল্ড কোয়াটারের” মত হতে পারে টুরিস্ট হট স্পট। পুরানো ঢাকার অনেক ঐতিহ্যবাহী খাবার আছে। কানাডার কুইবেকর পুরানো শহরের মত হতে পারে। এখনো সময় আছে এগুলোকে পুরানো আদলে আবার গড়ে তোলার। নতুন ইতিহাসে পারাপাশি প্রাচীন ইতিহাস একটি জাতির গর্ভ। যার অতীত নেই তার কোন ভবিষ্যৎ ত নেই।

একটা জিনিস আমাকে অবাক করেছে। অনেক পুরানো বট গাছ দেখে। এতো পুরানো বট গাছ আমি আগে দেখিনি। ১৫-২০ জন লাগবে হাতে হাত ধরে গাছটিকে ঘিরে ধরতে। খুব সুন্দর ভাবে রক্ষা করছে তাদের সরকার। চমৎকার বাগান করেছে গাছটিকে ঘিরে। ভিয়েতনাম সরকার সংরক্ষন করতে জানে। এত যুদ্ধ হয়েছে, কিছু প্রাচীন হারিয়ে যায় নি। যেতে দেয় নি হো চি মিন।  বাংলাদেশে বট গাছ দেখতে হলে খুজতে হবে। শহরগুলোকে ঢেলে সাঁজাতে গাছ কাটে নি। তাই অনেক ছোট ছোট বাগান শহরের মাঝে। পার্কগুলোতে ছেলে মেয়ের এক্সেরসাইজের ব্যবস্থা। দেখলাম স্কুলের ছেলেরা সে গুলো ব্যবহার করতে। একেই বলে জনগনের সরকার।

অনেকক্ষণ কাটালাম সেখানে। বেশ ভালো লাগছিল। বাগান থেকে বেরিয়ে ছবি তুলছিলাম। অসংখ্য সাদা লিলি ফুটে আছে। হটাথ চোখে পড়ে দেয়ালের উপর বসে থাকা এক বয়স্ক মানুষকে। ছেড়া কাপড় পড়া। ছবি তুলতে যেয়ে বাধা পেলাম। লোকটি রেগে গেছে। গাইড নিষেদ করলো। তবু লোভ সামলাতে পারিনি।অনেকদুরে এসে ছবিটি নিলাম। এই কয়দিনে এই প্রথম দেখলাম এই রকম একজন মানুষ। আমার মনে হল পাগল নয়।পাগলের ছদ্মবেশে কেঊ। কারন ফকির হলে ছবি তুলতে দিত। পয়সা চাইত।

সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা বিমান বন্দর। হো চিঁ মিন শহরে যাবো আজ। মাঝে নেমে কিছু পদ্ম ফুলের ছবি তুলে নিলাম। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা। এখানে এসে পেয়ে গেলাম। বিশাল পদ্মের বাগান। কপোত কপোতীরা ছবি তুলছে পদ্মকে ধরে। তার জন্য পানির ভিতর সুন্দর করে বাঁশের মাচা করা আছে। একদম নাগালের মধ্যে। গাইড বন্দরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। নিয়ম মত তার হাতে গুজে দিলাম কিছু। এই “লী” ত আমার ভ্রমনকে আনন্দময় করে তুলেছে। মৃদু হেসে সে বলল আবার আসবে। মাথা নেড়ে জানালাম আসব।

আর একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে। স্বনির্ভর পরিবার গড়ার সুন্দর নীতি দেখে ভিয়েতনাম সরকারের। পরিবার ভিত্তিক ব্যবসা। গাইড নিয়ে গিয়েছিল একটি দোকানে। কাপড়ের দোকান। দেশী কাপড়। দু জনই বয়স্ক। স্বামী স্ত্রী। ছোট্ট দোকান । কি অমায়িক ব্যবহার। নাতনির জন্য কিছু ড্রেস নিলাম ওখান থেকে। ভিয়েতনামেও ফেরিওয়ালা আছে। আমার হোটেলের সামনে সকালে বেরোবার আগে দেখতাম এক বৃদ্ধ মহিলা ( ভালো স্বাস্থ্য) ফল নিয়ে বসে আছে। গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম এখানে ফল কে কিনবে? মৃদু হেসে জানালো, হোটেলে যা ফল লাগে তারা এই ফেরিওয়ালা থেকে নেয়। অবাক লাগলো তাদের দেশ প্রেম দেখে। বাংলাদেশের পরিবেশ এখনো এর অনুকুল নয়। চাঁদাবাজদের জন্য। বর্তমান অবস্থা আরও খারাপ। তাইত বাংলাদেশের জিডিপি বাড়ছে আর তার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে দরিদ্র পরিবারের সংখ্যা ও বাড়ছে। মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ছে।        চলবে…

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের  | পর্ব ৩  লেখকঃ  পাস্ট ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল,  বাংলাদেশ।  মন্ট্রিয়ল, কানাডা।

লেখকের অন্যান্য ভ্রমণ কাহিনী….
আমার দেখা ভিয়েতনাম ১  |আমার দেখা ভিয়েতনাম ১  |
আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ১     আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ২     আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ৩

 

 

আপনার মন্তব্য লিখুন