ভ্রমণ

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের  | পর্ব ৬

পূর্ব প্রকাশের পর…

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের  | পর্ব ৬

সেখান থেকে আমরা গেলাম সাইগনের নটরডাম ক্যাথেড্রাল দেখতে। ফ্রেঞ্চ কলোনিস্টরা ১৮৬৩ থেকে ১৮৮০ সনের মাঝে তৈরি করেছিল। সামনে খুব সুন্দর ভাবে তৈরি করা বিশাল সাদা মেরির মূর্তি। ভিতরে যাওয়া হয় নি কারন তখন মেরামতের কাজ চচ্ছিল। সামনে ফুলের বাগান। খুব সুন্দন ছোট ছোট ফুলের গাছ,নানা রঙের। রাস্তার ওপারে দেখেলাম নতুন উচ্চ অট্টালিকা, সাথেই আছে একটি পুরানো চার তলা বাড়ি। দেখলে বুঝা যায় আগে এ অঞ্চল কেমন ছিল। নতুন ভবনগুলো আধুনিক ধাচে তৈরি। তার একপাশে হো চি মিন সেন্ট্রাল পোস্ট অফিস। ভিতরটা সুন্দর করে সাজানো। খুব কালারফুল। সুন্দর ভাবে গুছিয়ে রাখা ফ্রেঞ্চ কলোনিয়াল সময়ের স্মৃতি। ১৯ সেঞ্চুরির তৈরি। ১৮৮৬ থেকে ১৮৯১ এর মধ্যে। সোভেনিরের হরেক রকম দোকান। আমি একটা ভিয়েতনামিজ হেট কিনলাম। হলের উপরের রঙ্গিন ডোমের শেষ মাথায় বিশাল হো চি মিনের আকা পোট্রেট। কিন্তু সাদা মাটা। খুব সুন্দর মার্বেল মেঝে। এন্টিক টেলিফোন বক্স দেখে ইমেইল ও মোবাইল ফোনের আগের অবস্থা মনে করিয়ে দেয়। দু ভাগ এই অফিসের। একটি ভ্রমণকারীদের জন্য। অন্য অংশে পোস্ট অফিসের কাজ চলছে। সেই পুরানো গামের পট যা আমরা অনেক আগে ব্যাবহার করতাম সেটা এখনো চালু আছে সেখানে। সামনে দেখতে পেলাম দুটো স্ট্যাচু। একটি ফারাসিদের ও আর একটি বিপ্লবীদের। ফারাসিদের স্ট্যাচু তারা ভেঙ্গে ফেলেনি। একেই বলে ইতিহাস সংরক্ষন। সব দেশ তাই করা উচিৎ। অতীত মুছে ফেললে ভবিষ্যৎ দাঁড়াবে কি ভাবে।
সেখান থেকে বেশ অনেকক্ষণ হেঁটেছিলাম। দেখলাম অপেরা হাউজ এবং হোটেল ডে ভিলে। অপেরা হাউজের সামনে প্রবেশ মুখে দুটো উলঙ্গ খুব সুন্দর নারী মূর্তি। ভিতরে প্রবেশ করিনি। কারন সেখান থেকে যেতে হবে এম্পেরার জেড প্যাগোডায়। সেখান  থেকে প্রধান আধুনিক শপিং এর রাস্তা এবং বেন থা মার্কেট, যেখানে অনেক ছোট ছোট ভিয়েতনামিজ ডিজাইনারদের দোকান।
পরের দেখার জায়গা এম্পেরার জেড প্যাগোডা। অনেকটা কোনফুসিয়াসের মন্দিরের মত। অনেক পুরানো। প্রবেশ মুখের পানির টেঙ্ক এ বড় বড় মাগুর মাছ। ওরা পুজা করে। পথের উপর জালালি কবুতর দল বেধে বসে আছে। ভক্তরা খাবার দেয়। পাশেই বিশাল এক পুরান বট গাছ। আর একটু ভিতরে গেলে পানির বেশ বড় চৌবাচ্চায় কচ্ছপ,মা ছানা মিলিয়ে অনেক। বাচ্চাগুলো পাশে উঠে রোদ পোহাচ্ছে। বেশ মজা লাগে দেখতে। এরা পবিত্র তাদের কাছে। তাই মানত করে স্বাদ পুরনের জন্য।
প্যাগোডাকে টাইয়সস্টা প্যাগোডাও বলা হয়। চীনারা ১৯০৯ এর দিকে এটা নির্মাণ করে। তৈরি করা হয়েছে জেড সম্রাট বা স্বর্গের রাজার সন্মানে। বৌদ্ধ ধর্মের একটা শাখা, ভিয়েতনামে জনপ্রিয়। নরকের রাজা বা পাশে আছে। দেয়ালগুলো অনেক রকম শাস্তির ছবি দিয়ে ভরা। আরেকটি ঘরে অনেক রকম দেবীর মূর্তি, উর্বরতার প্রতীক। অনেক শিশুদের মূর্তি ও আছে সেখানে। লোকেরা এসে, বিশেষ করে মেয়েরা, ফুল দেয়, মোমবাতি জ্বালায় ও আগরবাতি ধরিয়ে দেয়। সন্তান লাভের আশায়।
আমি ভারতবর্ষ থেকে এসেছি। তাই বাজারে যাবার আগে আমাকে নিয়ে যায় একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরে। নাম মরিয়ানাম হিন্দু মন্দির। ১৮০০ শেষের দিকে তৈরি। একজন ভারত থেকে আসা তামিল ব্যবসায়ী বানিয়েছিল। সব ভাগ্যের দেব দেবীরা এখানে শোভা পাচ্ছে। যেমন কালী, পার্বতী, দুর্গা।। প্রবেশ মুখে গপুরাম টাওয়ার, ১২ মিটার উঁচু, দেব দেবীর রঙ্গিন মূর্তি দিয়ে সাজানো। ভিতরে বেশ বড় চার কোনা হল রুম। উপরে সারি করে নটরাজ, শিব, ব্রহ্মা, পার্বতী এবং হিন্দু মিথোলজির নানা দেব ও দেবীর মূর্তি দিয়ে সাজানো। তামিলদের সংখ্যা যুদ্ধের পর কমে গেছে, কিন্তু ভিয়েতনামিজরা  এখানে যায় পূজা দিতে, মনবাসনা পুরন করতে। বর্তমানে ভিয়েতনাম সরকার এই মন্দির দেখা শুনা করে। খুব সুন্দর করে রাখে।
নিজের দেশের দিকে তাকালে দেখি পুরানো ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে। সরকারের দৃষ্টি তেমন নেই এদেরকে দেকভাল করার। লালমাটিয়ার কাছে মোঘল আমলের সাত গম্বুজ মসজিদটি এখন আর নেই। হারিয়ে গেছে নদীর বুকে যা আমি ৭৮-৭৯ এ দেখেছি। মানুষ নামাজ পড়ত ওখানে। পুরান ঢাকার মোঘল আমালের ছোট কাটারা এবং বড় কাটারার বেহাল দশা। এমনি করেই আমাদের প্রাচীন ইতিহাস হারিয়ে যাবে বাংলার বুক থেকে। থাকবে ছবি হয়ে। দেশ হারাবে অমূল্য সম্পদ। ভ্রমণকারীদের দেখার কিছুই থাকবে না। এখন ত আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি এস সি বিল্ডিং এবং কমলাপুর রেল স্টেসান ভেঙ্গে ফেলার পায়তারা চলছে। দুটো সুন্দর স্থাপনা পাকিস্থান আমলের।
এক ফাকে গাইড নিয়ে গেলো দুপরের খাবার খেতে। আরেকটি ভারতীয় খাবার দোকানে। সেখানেও ভারতীয় বাবুরচি পেলাম।কথা হোল। খাবার পর ছবি তুলে নিলাম এক সাথে। বেশ ভালো খাবার। সেখান থেকে যাব বাজার দেখতে।
প্রথমে গাইড দেখাল তাদের আধুনিক কেনা কাটার জায়গা। অনেকটা পশ্চিমা শহরের মত। রাস্তার দু ধারে সারি সারি দামী ব্রেন্ড এর কাপড় ও জিনিষের দোকান। কি নেই সেখানে। কিন্তু সব খুব ছিমছাম। ওদিকে আমার ঝোঁক ছিল না। তাঁকে বললাম তোমাদের সাধারন মানুষেরা যেখানে কেনাকাটা করে সেখানে যাব। নিয়ে গেলো এক জায়গায়। বাংলাদেশের হকারস মার্কেটের মত। কিন্তু ছিমছাম ও পরিষ্কার। বেশ খোলামেলা। সারি বেধে দু ধারে ছোট ছোট দোকান, সব কাপড়ের। দেশী। থাইল্যান্ড এর মত কেলকুল্যাটার ব্যবহার করে দেখায় কত দাম। আমেরিকান দাম ডলারে শোধ করা যায়। দোকান চালাচ্ছে সব মেয়েরা। মায়ানমার, থাইল্যান্ড বা ভুটানের মত। খুব সম্ভব বাজারের নাম “বেন থাহ” মার্কেট। ভাগ ভাগ করা আছে বাজার বিভিন্ন পণ্যের জন্য।কোন ধাক্কা ধাক্কি নেই। অবাল লাগে যে হো চি মিন শহরের লোক সংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ। পুরো মেট্রপলিটান এলাকার জন সংখ্যা প্রায় দুই কুঠি। কিন্তু আশ্চর্য শহরের কোথাও জটলা নেই ভিড় নেই। যেমনটি ভারতবর্ষে দেখি। হয়ত বা বেকারের সংখ্যা খুব কম। এখানেই সরকারের স্বার্থকতা।উন্নতির সাথে সাথে জনগনের দিকে খেয়াল রাখছে। আগেই বলেছি ভিয়েতনামের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সরকারের দায়িত্ব। আর এই পেন্ডেমিকের সময় খুব সুন্দর ভাবে দেশ টিকে রক্ষা করছে। দুই নাত্নির জন্য কিছু ওখানকার ড্রেস কিনলাম। পরের দিন ত ফিরে যাবার পালা বাংলাদেশে।
প্রথমে বলেছিলাম চু চি টানেল এর কথা। আগের বার যা আমি দেখেছি। এর উপরে কিছু না বললে লিখাটা অপূর্ণ থেকে যাবে। কারন ওখান থেকেই গেরিলারা যুদ্ধ পরিচালনা করত। অনেকগুলো সংযুক্ত টানেলর সমাহার এটি। সাইগনের কাছে চু চ্চি শহরে এর অবস্থান যেখান থেকে ভিয়েতকং গেরিলারা যুদ্ধ করত। দিনের বেলায় তারা এর ভিতরে থাকতো, রাতে বেরিয়ে আসত অভিযানে। আমেরিকান বোমার হামলার সময় তাদের ভীতরেই থাকতে হত বেশ কয়েক দিন। ১৯৬৮ ভিইয়েতকংদের এটাই ছিল প্রধান সামরিক আস্তানা। এর ভিতরেই ছিল সব। হাসপাতাল, খাদ্য ভাণ্ডার, গোঁলা বারুদের গুদাম ও থাকার যায়গা এর ভিতরেই। ঢুকার মুখগুলো ছিল সরু, টানেলগুলো ও ছিল সরু। এমন ও শিশু ওখানে বড় হয়েছে যারা দশ বছর সূর্যের আলো দেখেনি। ওই সময়ে ভিতরে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে লোকজন। পোকা মাকড়, সাপ, বিচ্ছু, ইদুর এরা ত আছেই তাদের নিত্যকার সঙ্গি। সমস্ত এলাকা বুবি ট্রেপ ও পুঞ্জি স্টিক পিট দিয়ে ভরা ছিল। ১৯৬৬ এর ৭ ই জানুয়ারী আমেরিকানরা ৩০ টন বোমা ফেলে এক সময়ের গভীর সবুজ জঙ্গলকে চাঁদের উপরের মাটির মত বানিয়ে ফেলেছিল। সমস্থ এলাকা চষে বেড়িয়েছে ওদের কাবু করতে ।কিন্তু পারেনি। একদল অস্ট্রলিয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং সামরিক বাহিনী, এর ভিতর অভিযান চালায়, খুজে পায় সামরিক সরমজান, খাদ্য, রেডিও যন্ত্রপাতি এবং গেরিলারা যে ছিল তার নিদর্শন। তাদের একজন ভিতরে আটকা পড়ে মারা যায়। ১৯৬৭ শেষ চেষ্টা চালায় ৩০০০০ বাহিনী নিয়ে ও প্রশিক্ষন প্রাপ্ত সৈনিক দিয়ে যাদের টানেল রেট বলা হত। কিছু করতে না পেরে ১৯৬৯ তে বি ৫২ বোমারু বিমান দিয়ে সমস্ত জায়গাটা ধ্বংস করে ফেলে, খুছে পায় অনেক নথিপত্র যুদ্ধের প্লেনিং এর উপর। কিন্তু কোন লাভ হয় নি। ততক্ষনে গেরিলারা অন্য পথে তাদের কাবু করে ফেলে। হতাশ হয়ে আমেরিকা ১৯৭২ এ যুদ্ধ থেকে সরে আসে।
এই ৭৫ মাইল লম্বা সংযুক্ত টানেল এখন টুরিস্ট স্পট। সরকার এটাকে নতুন করে যেমনটি ছিল তেমনটি করে রেখেছে। কিছু টানেল একটু বড় করেছে যাতে টুরিস্টরা ঢুকতে পারে দেখার জন্য। আমি একটু ঢুকেছিলাম কিন্তু বেশী দূর যাই নি। মাটির উপরে তৈরি করেছে চিড়িয়াখানা, দোকান ও খাবারের যায়গা। কিছু সামরিক যন্ত্রপাতি রেখেছে যা পর্যটকরা চালিয়ে দেখতে পারে। কিন্তু কোন ভাস্কর্য বা কারোর মূর্তি নেই। বাংলাদেশে মুজিব নগরে যেমনটি আছে। একটু ভাবার বিষয়।
রাতের খাবার শেষ করে ফিরে আসি হোটেলে। পরদিন সকালে ফিরে যেতে হবে দেশে একরাশ মিষ্টি অনুভূতি নিয়ে।

শেষ

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের  | পর্ব ৬  লেখকঃ  পাস্ট ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল,  বাংলাদেশ।  মন্ট্রিয়ল, কানাডা।
লেখকের অন্যান্য ভ্রমণ কাহিনী….
আমার দেখা ভিয়েতনাম ১  |আমার দেখা ভিয়েতনাম ২  |আমার দেখা ভিয়েতনাম ৩ আমার দেখা ভিয়েতনাম ৪ আমার দেখা ভিয়েতনাম ৫
আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ১     আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ২     আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ৩

এস এস/সিএ

আপনার মন্তব্য লিখুন