জার্নি বাই ক্রুজ / Journey by Cruise ।। পর্বঃ ৪ ।।। সদেরা সুজন
পূর্ব প্রকাশের পর
গতরাতে থিয়েটার হলে গিয়ে অবাক হয়েছিলাম। এত লোক একসঙ্গে বসে বিনোদন উপভোগ করে আমার জীবনে এই প্রথম দেখলাম। বেশ ভালো লেগেছিলো। জনপ্রিয় কমেডি গেম শো, উপভোগ করার মতো হলেও শোটি একটু স্পাইসি ছিলো বলা যায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। ‘তিনটি দম্পতি আবিষ্কার করেছে তাদের নৃত্য-গান দিয়ে তারা একে অপরকে কতটা ভালো চেনে, কতোটা ভালোবাসে।’ তখন মিউজিকের তালে তালে রুবী কোলে বসে আমার এক বছর বয়সি নাতনির নৃত্যটাও ছিলো দেখার মতো। আমাদের পাশে বসা মানুষগুলোকে খুব আনন্দ দিয়েছে। গতরাতে অনেকটা দেরি করে ঘুমিয়েছি ফলে ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমাদের ক্রুজটি শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই সম্ভবত এই পোর্টে নোঙর করেছে। আজ ক্রুজের তৃতীয় দিন। ক্রজটি ছাড়ার পর এই প্রথম কোন দেশের আইল্যান্ডে নোঙর করছে। ব্যালকনি থেকে যে দৃশ্য দেখলাম যা এক কথায় বলা যায় অপূর্ব, অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য। সমুদ্রের পাশে সবুজ বনানী ঘেরা পাহাড়, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর পাখির উড়াউড়ি। ডোমিনিকান রিপাবলিকের একটি দ্বীপ। সেখানেই সারা দিন থাকবো, বেড়াবো আর নয়ন ভরে দেখবো। ডোমিনিকান রিপাবলিকের কথা বন্ধু-স্বজনদের কাছ থেকে অনেক গল্প শুনেছি। অনেকেই সেখানে পরিবার পরিজন নিয়ে অবকাশ যাপনে যান যদিও আমার ভাগ্যে তা হয়ে উঠেনি। প্রবাসে আমাদের কষ্টকঠিন সময়ে সোনার হরিণ ধরার জন্য দৌঁড়তে হয়েছে, দৌঁড়তে দৌঁড়তে দেখি এখন জীবনের সূর্যাস্তের সময়।
আমাদের প্রতিটি কেবিনরুমে টেলিফোন রয়েছে, রয়েছে ইন্টারনেট সার্ভিসও। তবে ইন্টানেট সার্ভিসটা ব্যায়বহুল, প্যাকেজের সঙ্গে কিনতে হয়। আমাদের ১৮ জনের টিম লিডার হলো আতুল। সে সবাইকে জানিয়ে দিলো সকালের ব্রেকফাস্ট সেরেই আমরা সবাই বেরিয়ে পড়বো দ্বীপটি দেখতে। যাবার সময় কি কি নিতে হবে সব জানিয়ে দিলো। থার্মোস বোতলে পানি ভরে নিয়ে যেতে হবে সঙ্গে টুপি। কারণ সেখানে খুব গরম হবার কথা। ডোমিনিকান রিপাবলিকের উত্তর উপকূলে অবস্থিত একটি সুন্দর সমুদ্রতীরবর্তী শহর ও জনপ্রিয় ক্রুজ পোর্ট বলে খ্যাত Puerto Plata । ব্রেকফাস্ট সেরে পর্যাপ্ত পরিমানের টাওয়াল, বোতলভরা পানি, বাচ্চাদের জন্য কিছু খাবার, কয়েকপ্রস্ত কাপড়, হেট সঙ্গে নিতে হলো।
ক্রুজ থেকে বের হয়েই দেখি ভয়ানক অবস্থা। সূর্য যেনো মাথার উপরে নেমে এসেছে, ৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস ঠিক বাংলাদেশের চৈত্রের দাবদাহের মতো। পোর্ট এলাকায় কিছুটা জায়গা হেঁটে যেতে হয় মেইন আইল্যান্ডে প্রবেশের জন্য। কয়েক মিনিট হাঁটতে গিয়ে সবাই হাঁপিয়ে উঠেছিলো। দ্বীপের প্রবেশদ্বার তাদের ঐতিহ্যবাহি আসবাব গাছ-গাছালি দিয়ে সাজানো। সারি সারি দোকান, রকমারি অ্যালকোহল সমৃদ্ধ বারসহ কত কি! পর্যটকদেরকে ভাগিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন ধরনের অফার দিচ্ছে, কেউ নিচ্ছে কেউবা ইগনোর করে চলে যাচ্ছে। গেট পেরিয়ে ভিতরে যেতেই অন্য দৃশ্য! ঈশ্বর যেনো তার নিজ হাতে গড়েছেন শহরটি, সারি সারি নারিকেল, পাম, রঙ্গিন লতার বাহার, দূরে পাহাড় যেনো হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সুইমিং পুলের পাশেই বিশাল বড় বড় গাজিবো’র ভিতরে বড় বড় বার সেখানে গরম থেকে বাঁচার জন্য কারোও হাতে ডাব, কারো হাতে বিয়ার আবার কারেো হাতে আইসমিশ্রিত ড্রিংকস তবে সবচে‘য়ে বেশি চলতে দেখেছি ফ্রেশ নারকেল পানি বা ডোমিনিকান রাম । হাই ভলিয়মে মিউজিক চলছে। পাহাড়টা ডিঙ্গালেই রয়েছে খুবই সুন্দর সৈকত, সেখানে শত শত নারী-পুরুষ, শিশু কিশোররা মন ভরে রুদ্রস্নান করছে আবার সাগর সঙ্গমে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সাঁতার কাটছে। পর্যাপ্ত সময় থাকলে কেবল কারে পাহাড়ে ওঠা যায়, দেখা যায় স্প্যানিশ আমলের ঐতিহাসিক দুর্গ, সবুজের মাঝে মাঝে রঙিন পুরনো ঘরবাড়ি, এরপর সৈকতের নীল পানি, পাহাড়ের পাদদেশে মানুষের যাপিত জীবন। কেবল কারে উঠলে পুরো Puerto Plata শহর আর সমুদ্র দেখা যায়। উপরে আছে বাগান ও Christ the Redeemer ভাস্কর্য । সময় থাকলে পাহাড়ি ঝর্ণায় লাফ, স্লাইড, ট্রেকিং এর সুযোগ ছিলো যা একদম অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য সেখানে যাওয়া।
আমাদের হাতে সময় কম থাকাতে অনেক কিছু অপূরণ রেখেই ফিরার সময় হয়ে গেলো। সাড়ে তিনটায় সবাই ফিরতে হলো। ক্রুজে প্রবেশের পূর্বমুহূর্তে ক্রুজের ক্রুরা ঠান্ডা পানিয় দিচ্ছিল, কেউবা ঠান্ডা ভেজা তোয়ালি দিচ্ছিল গরম থেকে হাত-মুখ মুছে নেওয়ার জন্য। হাসিমুখে তাদের পরিসেবা ছিলো মনে রাখার মতো। কেভিনে ফিরেই চলে গেলাম ৫ নম্বর ডেকে সেখানে ডোমিনিকান রিপাবলিকের নিজস্ব নাচ Bachata-র তালে তালে শরীর দোলাতে, কিন্তু নিজের শরীরের দিকে চেয়ে নিজেই হাসছিলাম কারণ ক্রুজের স্টাফরা খুব সুন্দর করে নৃত্যটি দেখাচ্ছিলেন। খুবই প্রাণবন্ত ছন্দে সবাই চেষ্টা করছিলো স্টেপগুলো দেওয়ার জন্য আমার কাছে নিজেকে বেমানান মনে হওয়াতে সেখান থেকে ফিরেই দেখি সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছিল রাতের পার্টিতে যোগ দেওয়ার জন্য। আমার মেয়ের জামাই আতুল কাপুর-এর জন্মদিন উপলক্ষে জাপানী রেস্টুরেন্ট Teppanyaki তে পার্টি। জাপানি স্টাইলের হিবাচি রেস্তোরাঁয় খাবার টেবিল-সাইডে তৈরি করে দিচ্ছিল, এবং শেফরা স্প্যাটুলা, মিক্সিং বোল, লবণ–গোলমরিচের বোতল, গ্রিলে রান্নার জিনিস দিয়েই বানানো মজার বাজনা বাজিয়ে তালে তালে ম্যাজিক দেখাচ্ছিল। এসব দেখে মিলান-ডিলানসহ সব বাচ্চারা খুব মজা পাচ্ছিল এবং যা দিচ্ছিল তা-ই খাচ্ছিল। জন্মদিনের পার্টিতে বেশ জমেছিলো। ক্যাপ্টেন হেট পেয়েছিলাম আমরা জন্মদিনের শুভেচ্ছা হিসেবে।
রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে আমরা কেভিনে ফিরে গেলেও বার্থডে বয় আতুল আমার ছেলে সৌভিকসহ অন্যান্য বন্ধুরা চলে যায় তাদের অন্যান্য অনুষ্ঠানে। ক্রুজ সারা দিন রাত জেগে থাকে মানুষের প্রাণচঞ্চলতায়।
চলবে…
জার্নি বাই ক্রুজ পর্ব- ১ ।।। সদেরা সুজন
জার্নি বাই ক্রুজ পর্ব- ২ ।।। সদেরা সুজন
জার্নি বাই ক্রুজ পর্ব- ৩ ।।। সদেরা সুজন




