ফিচার্ড ভ্রমণ লেখালেখি

জার্নি বাই ক্রুজ পর্ব- ১ ।।। সদেরা সুজন

জার্নি বাই ক্রুজ পর্ব- ১ ।।। সদেরা সুজন

আমার নাতনির জন্মের ২/৩ মাস পরই সিদ্ধান্ত হয় তার প্রথম জন্মদিন ভিন্ন আঙ্গিকে পালন করা হবে। আর সেই মোতাবেকই দুই পরিবারের সিদ্ধান্ত হলো ক্রুজে জন্মদিন পালন হবে। বুক দেওয়া হলো এনসিএল-এ।  বুক দেওয়ার পর পরই কিছুটা ভয়-দ্বন্ধ-দ্বিধায় ঘিরে রেখেছিলো। যদিও অনেকটা সময় হাতে ছিলো সিদ্ধান্ত বদল করা যেতো।  ক্রুজ ভ্রমনের কথা মনে হলেই টাইটানিকের কথা মনে পড়ে যেতো, সাগরের উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে ভাসমান জাহাজে চলার চিন্তা করলেই মাথাটা যেনো এলোমেলো করতো। কাজের মধ্যে সারাক্ষণ ডুবে থাকা আমার মতো মানুষের কাছে চোখের পলকেই ক্রুজে যাবার সময় এগিয়ে আসলো। আমার নাতনির অবুঝ ভালোবাসা আমাকে ক্রুজে যাবার ভয় ও দ্বিধাকে সরিয়ে আনন্দে এগিয়ে যাবার উদ্দীপনা বাড়িয়ে দিলো। কাজের জায়গা থেকে ছুটির ব্যবস্থা করলাম। লাগেজ গোছানোর পালায় গিয়ে জানতে পারলাম দশদিনের জন্য যা যা কাপড়চোপড়, সাঁতারের পোশাকসহ পোর্টেবল পানির বোতল নিতে হবে। আমার নিত্যসঙ্গী ক্যামেরার পুরো ব্যাগ, ল্যাপটপ এবং সঙ্গে কিছু বইতো থাকবেই। কিন্তু এতসব কি করে নেই? আমার বড় ছেলেও বৌমা সাউথ আফ্রিকা ভ্রমণের পূর্ব নির্ধারিত থাকায় আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে শুধু ছোট ছেলে সৌভিক। আমরা তিনজনের জন্যে লাগেজ মাত্র দু’টি।

এয়ার কানাডায় ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো সেখানে এক রাত থেকে-ঘুরে পরদিন ক্যানাভের‌্যাল পোর্টে যাবার কথা। চারটায় ক্রুজটি ছাড়বে ক্যানাভের‌্যাল পোর্ট থেকে। মন্ট্রিয়ল–পিয়ের এলিয়ট ট্রুডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুপুর একটায় ফ্লাইট হলেও সকাল দশটায় ঘর থেকে বের হয়েছি। সম্রাট আমাদেরকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেয়, আমরা যখন নামছিলাম সেখানেই দেখা হলো মেয়ের জামাই আতুল-এর বাবা-মা’র সঙ্গে। আমরা সবাই একসঙ্গে যাচ্ছি নাতনি আলিয়া এবং জামাতা আতুলের জন্মদিন ক্রুজে পালন করবো বলে। বাবা-মেয়ের জন্মদিনের বর্ষ ভিন্ন হলেও তারিখ মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে পৃথক দু’দিনে পড়ে গেলো। তাই জন্মদিনে অংশ গ্রহণ করতে টরন্টো-মন্ট্রিয়ল থেকে আরও বেশ ক’জন ফ্যামিলি- ফ্রেন্ডস আনন্দভ্রমণে যোগ দিলো।

আমরা সবাই একসঙ্গে বোর্ডিং চেকইন করে বিমানে উঠার ঠিক পূর্বে প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হলো। নাতি আর নাতনির সঙ্গে কথা বলতে বলতেই বিমান নামার ঘোষনা পেলাম। অরল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেমে লাগিজ কাউন্টারে গিয়ে সুটকেসগুলো নিয়ে কার রেন্টাল থেকে প্রতিটি পরিবার একটি করে বড় গাড়ী রেন্ট করা হলো দু’দিনের জন্য অবশ্য আগেই অনলাইনে বুকিং দেওয়া ছিলো।  এয়ারপোর্টের পাশেই লেকসাইডে বড় রিসোর্ট স্টাইলের মেরিয়ট হোটেল, বিশাল এলাকাজুড়ে ছোট বড় পুকুরের মধ্যে পানির ফোয়ারায় দ্যুতিময় রঙিন আলোর লুকোচুরি খেলা বেশ নান্দনিক লাগছিলো। আমরা যখন হোটেলে পৌঁছি তখন সানসাইন শহর বলে খ্যাত ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো শহরে কালো অন্ধকার নেমেছে। তবে সবেমাত্র মাইনাস ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়ারে শৈত প্রবাহ আর তুষারপাতের তান্ডব থেকে মাত্র তিন ঘন্টার আকাশ পথ পেরিয়ে সেই শহরে এসে দেখি প্রচন্ড দাবদাহ। এটাই বুঝি প্রকৃতির খেলা বলে কথা। হোটেলে সবার জন্য পৃথক পৃথক সুইট বুক করা ছিলো। হোটেলে গিয়ে আমরা যখন ফ্রেস হবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং লাগেজ খুলতেই দেখি পুরো লাগেজ পানিতে ভিজে গেছে। মানে মন্ট্রিয়লে যে বৃষ্টি হচ্ছিল সেই বৃষ্টিতেই আমাদের সুটকেসে পানি ডুকেছে। ভিতরের সব কাপড়, বই-পত্র ১০ দিনের জন্য যা যা ছিলো সবই পানিতে ছন্দপতন ঘটিয়ে দিয়েছে। না, শুধু আমাদের নয়- সবাই এক এক করে বলছে তাদেরও একই অবস্থা। আবার কারো দু’একটা সুটকেস প্লাস্টিকের থাকায় পানি থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছে। কিন্ত অবাক না হয়ে পারলাম কই? এয়ার কানাডার মতো আন্তর্জাতিক মানের একটি দায়িত্বশীল এভিয়েশন কোম্পানি এমন দায়িত্বহীন, অবহেলামূলক কাজটি করলো! আমাদের কাপড় বদলানোর কিছুই ছিলোনা সব পানিতে ভিজে যাওয়াতে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা ছবি তুলে এয়ার কানাডাকে অভিযোগ করলেও ভেকেশন থেকে ফিরে এলেও আজ পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনোও উত্তর পাইনি যা বলতে হবে কানাডা জীবনের এই প্রথম দেখলাম কাস্টামারের প্রতি অবহেলা! যাক হোটেলের লন্ডিরুম সম্ভবত ছিলো এগারতলায়। সেখানে গিয়ে দেখা হলো আরও অনেকের সঙ্গে, অবস্থা একই। ফলে লন্ডির ড্রায়ার পেতে সময় লেগেছিলো কয়েক ঘন্টা। কাপড়গুলো শুকিয়ে ফ্রেস হয়ে বেডে যাবো তখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে কখন বুঝতে পারিনি। জানালার পর্দা সরাতেই কী অপূর্ব দৃশ্য অবলোকন করতে পারলাম, লেকসাইডের পানির থৈ থৈ মৃদু ঢেউয়ের আলোর খেলা, চারদিকে সারি সারি রকমারি পাম, ম্যাপল, পাইন, ওক, ওরেঞ্জ কত কি সবুজ গাছের ফাকে ফাকে আলো আর বাতাসের খেলা্, দূরে বহুদূরে ছুটছে গাড়ী জ্বলছে লাইট পোষ্টের আলো।

বেডে যেতে না যেতেই পাখির ডাকে বুঝতে অসুবিধে হয়নি প্রভাতের আলো দ্বারপ্রান্তে। রুবী তখনো নাতনিকে নিয়ে ঘুমুচ্ছে। আমি বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিতেই নাতনিটি চোখ খুলে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে আর কথা বলতে না পারলে বড় বড় করে শব্দ করছে তাকে কোলে নেওয়ার জন্য।  সকালের কফি নিয়ে বের হতেই দেখা পেলাম বেয়াই-বিয়াইনের। সবাই প্রাতঃ ভ্রমণের উদ্দেশে। বের হতেই অবাক, রাতের সৌন্দর্যের চেয়ে অনেকগুন বেশি হোটেলের চার দিক। বিশাল লেইকের পাড়ে আর হোটেলের পাশ ঘেরে সারি সারি বৃক্ষ আর বাঁশবাগান। ঠিক যেনো বাংলাদেশ আমাদের গ্রামের বাগান বাড়ি। হোটেলের পাশেই রয়েছে বিশাল বড় দীঘি সেখানে নানা প্রজাতির পাখি। সেই পাখিগুলোকে ক্যামেরাবন্দি করার জন্য আমরা বাপ-বেটি দুজনই ক্লিক দেওয়া শুরু করি। যদিও মেয়ের হাতের ছবিতে যাদু রয়েছে।  দীঘির চারপাশ ঘুরে প্রাতঃভ্রমণের কাজটা সেরে হোটেলের পিছনে গিয়ে দেখি সুইমংপুলের পাশেই ছোট ছোট বাঁশঝাড় কি সুন্দর দাঁড়িয়ে আছে। কত রকমারি পাকির মধ্যে আমাদের কাছে মূল আকর্ষণ ছিলো ঘুঘু পাখি। চিরচেনা পাখিটি আর আর বাঁশ বাগান আমাদেরকে চোখের পলকে নিয়ে যায় ফেলে আসা দিনগুলোর মাঝে। নষ্টালজিয়ায় আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলে, আমরা আমাদের মেয়েকে বলতে থাকি প্রিয় জননী জন্মভূমি আমার তীর্থস্থান যে কাদামাখা মাটি শরীরে মেখে বড় হয়েছি শৈশব থেকে যৌবনের স্বর্ণালী সময় কাটিয়েছি সেই কথাগুলো বলতে বলতেই ফোন আসলো হোটেলে ফিরতে হবে। ব্রাঞ্চ করেই গাড়ীতে উঠতে হবে। অরল্যান্ডো থেকে পোর্ট ক্যানাভেরাল (Port Canaveral) যেতে দেড় থেকে দুঘন্টা সময় লাগতে পারে। ক্রুজে আমাদের বোর্ডিং চেকইন ২টা থেকে। রাস্তায় যেতে যেতে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা দেখতে হলো ফলে ট্রাফিক হওয়াতে নির্ধারিত সময়ের কিছুটা দেরিতেই সেখানে পোঁছতে হলো। রাস্তার দুপাশে প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করতে করতেই সাগরের পাদদেশে বিশাল বড় বড় রকমারি ক্রুজ দাঁড়িয়ে থাকা দেখেই বুঝতে অসুবিধে হলো না আমরা পোর্ট ক্যানাভেরাল এসে গেছি।  অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই জীবনের নতুন অভিজ্ঞতা, আমার জন্য নতুন অ্যাডভেন্চার মনে হলো। চলবে…

এসএস/সিএ
সংবাদটি শেয়ার করুন