জার্নি বাই ক্রুজ / Journey by Cruise ।। পর্বঃ ৩ ।।। সদেরা সুজন
ভেকেশন হলে কি হবে? ঘুম ঠিক নিয়মমাফিকই ভোর ৪টায় ভেঙ্গে গেলো। না আমি একা নই, রুবীরও একই অবস্থা। রুম থেকে পর্দা সরিয়ে দেখলাম তখনো গাঢ় অন্ধকার ফলে ব্যালকনিতেও বসা যাবেনা। ক্রুজের অনেক মানুষ আমাদের মতো জেগে আছে কিন্তু বসে নেই- জিম করছে, কেউবা ক্রুজের ওয়াটার সাইটে হাঁটছে, কেউ ক্যাসিন্যুতে খেলছে, কেউ রাত জেগে মুভি দেখছে কারণ ব্রেকফাস্ট শুরু হবে ৬টা থেকে। ১৭ তলায় প্লাস ফিটনেস সেন্টার জিমে গিয়ে দেখি ফুল, একটা কিছুই খালি নেই। ফলে ফের রুমে ফিরে দেখি রুবী ঘুমুচ্ছে।
বেশ বড় সাইজের দু’খানা বই নিয়েছিলাম অবসর সময়ে পড়বো বলে, আমার মেসোর লেখা ‘উপলব্ধি’ এবং মেহের আফরোজ পান্না ভাবীর ‘সিদ্বেশ্বরী গল্প’। দুখানা বই-ই এয়ার কানাডার অসথর্কতার কারণে বৃষ্টির পানিতে ভিজে সব পাতাগুলো জট বেঁধে যাওয়াতে আর পড়া সম্ভব হয়ে উঠেনি ফলে নিরুপায় হয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কিছুটা গল্প কিছুটা তন্দ্রায় আচ্ছন্ন অবস্থায় থেকে একসময় বাইরের আলোকচ্ছটা আমাদেরকে জানিয়ে দিলো আর নয় বিছানায় দেখো বাইরে সমুদ্র ডাকছে, সমুদ্রের অজানা পাখিগুলো ভোরের স্নিগ্ধ ম্রিয়মান সূর্যের আলোয় খেলা করছে সেই প্রতিচ্ছবি সমুদ্রের ঢেউ-এর মধ্যে প্রতিফলন হচ্ছে। আমরা দু’জন মানে রুবী আর আমি দু’জনে-দু’জনের হাত ধরে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ ব্যালকনিতে মুখোমুখি। জীবনের শেষ সাহাহ্নে ফেলে আসা আনন্দ আর কষ্টের স্মৃতিময় দিনগুলোর অব্যক্ত কথাগুলো বড্ড আপন হয়ে ডানা মেলেছিলো সাগরের তরঙ্গের শব্দে হৃদয়ের মাঝে! আহা, সে কি অদ্ভুত অনুভূতি! অবাককরা ভালোবাসা বুঝি নিজের অজান্তেই জেগে উঠে শুধু সময় স্থান আর পরিবেশের কারনে!
রুমের দরোজায় হালকা নক করার শব্দে খুলতেই মেয়ে আর নাতনি। নাতনিই নক করছিলো তার ছোট্ট হাতে। মেয়ে বললো চলো ব্রেকফাস্ট করতে যাই। নাতনি আমাদেরকে দেখেই আনন্দে মেয়ের কোল থেকে জাম্প দিয়ে আমার কোলে চলে আসলো। এর চেয়ে জীবনের ভালোবাসা, সোনালী সময় কি আর হতে পারে আমাদের জন্য!
ক্রুজের ভিতরে প্রথম সকাল, দ্বিতীয় দিন। ব্রেকফাস্ট যাবার সময় সুইমিং পুল এলাকা অতিক্রম করতে গিয়ে দেখে অবাক হলাম, সকাল হতে না হতেই মানুষের ঢল, সুইমিং পুলগুলোও তাদের দখলে চলে গেছে। ১৬ তলায় ডাইনিং ফ্লোর। সবাই ছুটছে সেইদিকে। ডাইনিং এলাকায় পৌঁছতেই স্বাস্থ্যবিধি রীতিকে সামনে রেখে জীবাণু সংক্রমণ রোধে একজন ক্রু মৃদু ডেন্স করে করে একধরনের বাজনা বাজিয়ে “Washy washy, happy happy!’ বলে গান গাইছেন এবং হাত ধোয়ার জন্য পাশেই ল্যাভাটরি (সিঙ্ক) দেখিয়ে দিচ্ছে। এসব দেখে সবাই আনন্দ পাচ্ছে এবং হাত ধোয়ার কাজটা সেরে নিচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাচ্ছে শিশুরা। ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে দেখে নিলাম ক্রুজের ভিতরের কর্মসূচি, কি কি করা যাবে আজ। তারপর একটার পর একটাতে দৌঁড় দেই দেখার জন্য। ‘ক্যানভাস বাই ইউ’ নামে পেইন্টিং এর ক্লাস রয়েছে সকাল থেকে। সেখানে প্রাথমিক পেইন্টিং শিখাবে শিল্পী হবার জন্য! বলা যায় প্রফেশনাল শিল্পীর সঙ্গে রংতুলির কিছুটা সময় কাটানো আর কী! যা ভাবছিলাম তা নয়। সত্যি সত্যি কয়েকজন ক্রু (আর্ট শিক্ষক) কি করে আর্ট করতে হয় তা শিক্ষা দিচ্ছেন। তবে তা বাচ্চাদের জন্য প্রযোজ্য ছিলো কারন পাম ট্রি ও সানফ্লাওয়ার আঁকা শিখাচ্ছেন। সেখানে কিছু সময় থেকে ক্রুজের ফুড অ্যান্ড বেভারেজ টিমের সঙ্গে যোগ দিলাম সুশি তৈরির কিছু গোপন কৌশল জানার জন্য কিন্তু আমি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই শেষ হয়ে গেলো প্রোগ্রামটি। ফলে সুশি তৈরির গোপন কৌশলটা গোপনেই রয়ে গেলো। সেখান থেকে বের হতেই একটি কার্ড পেলাম! সেটা কি? জিজ্ঞেস করতেই বললো বিঙ্গো দল নিয়ে যোগ দাও- মুকুট জিতলে দুই হাজার ডলার জ্যাকপট!
আগেই বলেছি আজ সারাদিন, সারা রাত আটলান্ট্রিক সাগরে থাকবো। ফলে সারা দিন রাত অফুরন্ত সমুদ্র যাত্রার সময়। সকালে ব্রেকফাস্টের পর দৌঁড়ে গিয়েও আর্ট করা কিংবা রান্না শিখা যখন হলো না তখন আর কি করা যায় ফের রুবী আর আমি সকালের নৈসর্গ উপভোগ করতে স্বাস্থ্য রক্ষার নামে পাঁচ তলার ডেকে গিয়ে হাঁটতে শুরু করি। বাহ্, কী অবাক করা সুন্দর্য। ঢেউ কেটে ক্রুজটি ছুটছে সামনের দিকে আর পিছনে সামুদ্রিক পাখিরা উড়ছে। সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে সাগরের ঢেউ। এরপর উপরে গিয়ে কিছুক্ষণ স্কাই‑লাউঞ্জে সাগরের দূর-দূরান্ত দেখার চেষ্টা করলাম কিন্তু প্রচন্ড রোদের তাপে বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব হয়নি। লাইব্রেরীতে গিয়ে দেখলাম, কি নেই? বড় বড় নামি লেখকদের বই রয়েছে সেখানে। শুধু সমুদ্রের গর্জন আর স্রোত অবলোকন করে করে অনেকেই শরীরটা চেয়ারে হেলিয়ে দিয়ে পড়ছেন বই, কেউবা খেলছেন তাস আবার অন্যরা দাবা। পাশেই কফির ধোঁয়া উড়ছে। কারো হাতে বিয়ারের ক্যান।
এভাবেই ক্রুজের প্রথম সকাল পেরিয়ে দুপুরে ক্যাফেতে লাঞ্চ সেরে কর্মরত ভারতীয় এবং ফিলিপিনদের কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় পর্বে সাক্ষাৎকার নিলাম। জানলাম ক্রুজের অনেক অজানা গল্প! এরপর মজা করে কিছুটা সময় সুইমিংপুলে কাটালাম। শত শত নারীরা সুইমিং এলাকায় বিচচেয়ারে বিকিনি পড়ে শুয়ে আছে আবার প্রেমিক-প্রেমিকেরা বুকে বুক রেখে হাতে হাত ধরে রুদ্রস্নান করছে, ভালোবাসা বিলিয়ে দিচ্ছে এক অপরের কাছে। ভালোবাসার অজস্র চুমুতে যেনো সমুদ্রের গর্জনও ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যায় ছয় নম্বর ডেক-এ গিয়ে দেখলাম আর্ট গ্যালারি। বিশ্বের নামিদামি চিত্রশিল্পীদের ছবি দিয়ে সাজানো বিশাল গ্যালারী। এক-একটা ছবির দাম অনেক। তারচেয়ে অবাক হয়েছি বিশাল হলে হাজার হাজার ছবি সমৃদ্ধ গ্যালারী দেখে, সেখানে সেমিনার হচ্ছে বিভিন্ন দেশের চিত্রশিল্পী, ক্রেতা-বিক্রেতা এবং দর্শকদের সমন্বয়ে। সেখানে ছবি কিংবা ভিডিও করা নিষিদ্ধ থাকায় তা করা সম্ভব হয়নি। এরপর চলে যাই ক্রুজের জয় ক্যাসুনিতে। সেখানে গিয়ে দেখি ওয়ালেট নিতে ভুলে গেছি ফলে নগদ কোন ডলার সঙ্গে নেই। তাতে কি? ক্রুজের কার্ডই মেসিনের কাজ দিলো। বিশ ডলার নিয়ে মেশিনে ভাগ্য পরীক্ষা করতে লাগলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সব শেষ হওয়াতে সেখান থেকেই রুমে ফিরেই দেখি রুবী রাতের খাবারের জন্য যাচ্ছে। কারন রাত সাড়ে আটটায় আমাদের সবাই মিলে থিয়েটারে লাইভ জনপ্রিয় কমেডি গেম শো দেখার কথা। সেখান থেকে চলে যাবো ৭০-এর দশকের ডিস্কো গ্রুভ ড্যান্স পার্টিতে। ডেক ১৬তে ফাঙ্কি চুল, পলিয়েস্টার পোশাক আর বিদ্যুৎঝলমলে ডিস্কো বিটে সবাই নাচবে মিউজিকের তালে তালে। চলবে….




