জার্নি বাই ক্রুজ / Journey by Cruise ।। পর্বঃ ৬ ।।। সদেরা সুজন
পূর্ব প্রকাশের পর..
সারা রাত ক্রুজটি সাগরে ভেসে খুব সকালে ব্রিটিশ ভার্জিন টরটোলা আইল্যান্ডে পৌঁছে। ব্যালকনি থেকেই বুঝতে অসুবিধা হয়নি—দ্বীপটি অসাধারণ পাহাড়, সমুদ্র আর সবুজে ঘেরা এক নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য। সমুদ্রের পাদদেশে পাহাড়ের মাঝে বড় বড় অট্টালিকা, আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ির চলাচল—সবকিছুই যেন প্রকৃতির কোলে সাজানো এক স্বর্গ। ক্রুজের ১৩ তলা থেকে দেখছিলাম স্পিডবোটে করে দ্বীপ ঘুরতে বেরিয়েছে অনেকেই। মনে হলো ভাড়ায় এসব স্পিডবোটগুলো দলে দলে মানুষকে নিয়ে বেরোচ্ছে। কোনো কোনো স্পিডবোট দ্রুতগতিতে চলার পর একই জায়গায় ঘুরে যাচ্ছে, আর ঠিক তখনই সম্মিলিত চিৎকার করে উঠছে—আনন্দে না-কি ভয়ে বুঝে উঠতে পারিনি। তবে দক্ষ নাবিকদের নৈপুণ্য দেখে মুগ্ধ হওয়ার মতো। আমরা ব্যালকনি থেকে হাত নাড়িয়ে তাদের উৎসাহ জানাতেই ওরা হাত নেড়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল সেখানে যাওয়ার, কিন্তু রুবীর কড়া নির্দেশ—না, সেখানে যাওয়া হবে না।
আজ ক্রুজ ভ্রমণের পঞ্চম দিন। সকালে বের হওয়ার আগেই দেখেছিলাম আবহাওয়া কিছুটা মেঘলা—আকাশ মেঘে ঢেকে আছে। এই প্রথম ক্রুজে ওঠার পর আবহাওয়ায় ছন্দপতন ঘটল। আমার ছেলে সৌভিকের জন্য কিছুটা দেরি হলো—প্রতিদিন জিম করতে গিয়ে প্রোগ্রামের কথা ভুলে যায়। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে সবাইকে বের হতে হলো, কারণ এখানে বেশি সময় থাকবে না ক্রুজটি। মাত্র কয়েক ঘণ্টা থাকব, ফলে স্টারবাকস থেকে একটি বড় কফি নিয়ে সবার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। আতুল আর তার বন্ধুরা বাচ্চাদের নিয়ে সমুদ্রসৈকতে চলে যায়। আমরা কিন্তু তাদের সঙ্গে যাইনি। আমরা পোর্ট এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম।
টরটোলা আইল্যান্ডে বেশ কয়েকটি সৈকত রয়েছে, যা দেখার মতো—সাদা বালু, শান্ত জল এবং বার/রেস্টুরেন্ট রয়েছে; হাঁটা বা সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়, এমনকি কয়েক দিন থাকার মতো ভালো হোটেলও রয়েছে, যাতে সমুদ্র আর পাহাড়কে কাছ থেকে পাওয়া যায়। তবে সমুদ্রসৈকতে যেতে হলে প্রায় ১৪/১৫শ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর দিয়ে যেতে হয়। শহরটি ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য সারি সারি ট্যুরিস্ট গাড়ি রয়েছে। পাশে দালালরা প্যাকেজ বিক্রির অফার দিচ্ছে। ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সময় কম থাকায় তা আর হয়ে ওঠেনি।
আমরা পোর্টের পাশেই কয়েকটি দোকানে ঘুরতে থাকি। ট্যুরিস্ট এলাকা হওয়ায় সব কিছুর দাম কয়েক গুণ বেশি। পর্যটকদের ধরে রাখার জন্য কিছুক্ষণ পরপরই রয়েছে বার, রেস্টুরেন্ট, উচ্চ ভলিউমে ডিজে মিউজিক বাজছে। ডাব, আখ—কত কিছুর পসরা সাজিয়ে বসেছে! ছোট ছোট কেবিনেও বিয়ার-অ্যালকোহল বিক্রি হচ্ছে, যা দেখে মনে হচ্ছিল ওরা বোধহয় ব্রেকফাস্ট থেকেই বিয়ার খাওয়া শুরু করে! টরটোলা পোর্ট এলাকা খুবই সুন্দর। সারি সারি দোকানের পাশাপাশি চারদিকে মুরগিগুলো দৌড়াদৌড়ি করছে—ডাকছে; পর্যটকেরা কৌতূহল নিয়ে দেখছে। প্রচণ্ড গরম থাকায় বেশিক্ষণ সেখানে হাঁটা সম্ভব হয়নি। বেশ কিছু কাপড় এবং স্যুভেনির কিনে নিলাম। সেখানে বিশাল এলাকা জুড়ে সিআইবিসি ব্যাংক রয়েছে। রাস্তাঘাট খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। রোদের দাবদাহ, আবার কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হওয়ায় তাড়াতাড়ি ক্রুজে ফিরে লাঞ্চ সেরে নিলাম।
আজ রাতেই আমার নাতনির জন্মদিন উপলক্ষে ‘ওসেন ব্লু’ রেস্টুরেন্টে পার্টি হবে। হাতে অনেক সময় থাকায় ক্রুজটি ঘুরে দেখার জন্য বের হলাম, যদিও সব ডেক (ফ্লোর) দেখা হয়ে গেছে। অনেক ক্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। হাই-হ্যালোর পাশাপাশি অনেক কথাই জানতে পারি—তাঁদের সাগরে ভাসমান যাপিত জীবনের কথা। পুরো ক্রুজে প্রায় ১৭শ ক্রু রয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই ফিলিপিনো এবং ভারতীয়; অন্যান্য দেশের খুবই কম। বছরে ৮ থেকে ৯ মাস কাজ করতে হয়—সপ্তাহে সাত দিনই ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা করে। দিনে দু’বার বিরতি। নিজস্ব সেলফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা যায় না। ক্রুজের নিজস্ব ছোট ফোন রয়েছে সবার জন্য; এটিই দিয়ে ক্রুজের ভেতরে সব যোগাযোগ করে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়, শুধু হোয়াটসঅ্যাপে দেশে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার জন্য। বছরে দুই/তিন মাস ছুটি পায় দেশে যাওয়ার জন্য; প্রতি মাসে বেতন থেকে ভ্যাকেশন পে কেটে রাখা হয়। বিমানভাড়া কোম্পানি দেয়। এ কয় দিনে যা দেখলাম, কথা বললাম—ওরা সবাই খুশি, আনন্দে থাকে; থাকতে হয় বলেই হয়তো। ওরা নিজেরা আনন্দে থাকে, আর প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন হাজার হাজার যাত্রী ওঠে—তাঁদেরও আনন্দ দেয় ভীষণ ভালো ব্যবহার করে।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় একসঙ্গে সবাই ‘ওসেন ব্লু’ রেস্টুরেন্টে যাই। কয়েক শ আসনবিশিষ্ট রেস্টুরেন্টে চলছে লাইভ মিউজিক, সঙ্গে কয়েকজন নাচও করছে। সমুদ্রঘেঁষা নীল থিমের রেস্টুরেন্ট, যেখানে অধিকাংশই সি-ফুড। চিংড়ি, কাঁকড়া, অক্টোপাস, শামুক, ক্যালামারি, গ্রিলড চিকেন এবং সামুদ্রিক মাছের অর্ডার দেওয়া হলো। সঙ্গে রকমারি সালাদ, ডেজার্ট এবং অন্যান্য খাবার। রেড ওয়াইনের পাশাপাশি ব্ল্যাক লেবেল। বেশ জমেছিল—সবাই আনন্দ করে খাচ্ছিল; শুধু আমি আর রুবী তেমনভাবে মানিয়ে নিতে পারিনি, কারণ সি-ফুড আমার পছন্দের তালিকায় নেই। মাছে-ভাতে বাঙালি বলে কথা! এসব খাবারের বাহার থেকে আমাকে ক্রুজের বাহারি বুফে ডাকছিল। তাঁদের সঙ্গে না পেরে সালাদ আর কিছু চিংড়ি মুখে নিলাম। মনে মনে ভাবলাম, এখান থেকে বের হয়ে ১৬ তলায় ডাইনিংয়ে চলে যাব—সেখানে পেট ভরে নিজের পছন্দমতো খাব।
খাওয়া শেষ হলে নাতনির জন্মদিনের কেক নিয়ে এলো রেস্টুরেন্টে কর্মরত কয়েকজন ক্রু, জন্মদিনের গান গেয়ে। সঙ্গে রকমারি ট্রপিক্যাল ডেজার্ট। ডায়াবেটিস যাদের আছে, তাদের সামনে চমকপ্রদ মিষ্টিজাতীয় কিছু এলে যা হয়—আমারও সেরকমই হয়েছিল। কিন্তু রাতের খাবার পরে ভালো করে খাব বলে সবাইকে বললাম, ডায়াবেটিস বেড়েছে, তাই খাব না। যাক, সুন্দর করেই আলিয়ার জন্মদিন পালন হলো। বাচ্চারা খুব আনন্দ করল, বাবা-মা খুশি—তার চেয়েও বেশি খুশি রুবী আর আমি। কারণ এই জন্মদিনের উদ্দেশ্যেই আমাদের এই মনভরা সমুদ্র দর্শন, ভ্রমণ এবং ক্লান্তিহীন কিছু সময় যাপন। চলবে….




