জার্নি বাই ক্রুজ / Journey by Cruise ।। পর্বঃ ২ ।।। সদেরা সুজন
পর্বঃ দুই
পোর্ট ক্যানাভেরালে ক্রুজে যাবার গেইটের পাশে বেশ কয়েকটি বুথ রয়েছে সেখানেই লাগেজগুলো ড্রপ করতে হয়েছে আমাদের। সেখানে যাবার পূর্বেই ইমেইলে সব ইনফরমেশন দেওয়া হয়েছিলো কিভাবে লাগেজগুলো দিতে হবে এবং সেখান থেকেই ক্রুজে আমাদের নির্ধারিত রুমে চলে যাবে। লাগেজ নামিয়ে রেন্ট করা গাড়ীগুলো জমা দিয়ে ক্রুজের জন্য ইমিগ্রেশন-বোর্ডিং-চেকইন শেষ করে নরওয়েজিয়ান ক্রুজের কাউন্টারে গিয়ে তাদের নিজস্ব ৭ দিনের জন্য আইডি নিতে হয়েছে যা ক্রুজে থাকাকালীন এই কার্ড দিয়েই সব কিছু করতে হবে। এমন কি কেনাকাটা ড্রিংস, নিরাপত্তা, Activities সব কিছুতেই ব্যবহারযোগ্য। ক্রুজের ভিতরে ঢুকতেই ভিন্ন এক অনুভূতির সৃষ্টি হলো। দীর্ঘদিনের ইচ্ছে, স্বপ্ন, ভয়- দ্বন্দ্ব রোমাঞ্চ সব কিছু মিলিয়েই আলাদা একটা প্রাণচঞ্চলতা দেখা দিলো। আমাদের রুমটি রাখা হয়েছিলো ব্যালকনিসহ যাতে সেখান থেকে সাগরের উত্তাল তরঙ্গ দেখতে পাই।
রুমে ঢুকে আমরা দু’জন বসে থাকলাম কিছুক্ষণ ব্যালকনিতে, (দু’টি চেয়ারের মাঝে টিটেবিল বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছি এই চেয়ারে বসেই একান্তে নগ্ন সূর্যস্নান করা যায়! যা কাছ থেকে কেউ দেখার সুযোগ নেই) তখনো ক্রুজটি ছাড়েনি। রুমটি একটু ছোট হলেও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন খুব সুন্দর সাজানো-গোছানো ঠিক হোটেল রুমের মতো। বড় বিছানা, একটি সোফা কাম বেড, ড্রেসিং টেবিল, চেয়ার, লকার, ফ্রিজ, টিভি, কাপড় রাখার জন্য বড় বড় ক্লোজেট, ওয়ালে হেট রাখার হুগস, টেলিফোন, ছোট্ট বাথরুম হলেও খুবই রুচিশীল, সুন্দর ও শিল্পসম্মতভাবে সাজানো। সবকিছু একেবারে নিখুঁত ভাবে খাপেখোপে সুন্দর করে পরিপাটি করে ফিট করে রেখেছে। পরিবার নিয়ে থাকার জন্য সব কিছুই রয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রেস হয়ে সবাই মিলে বের হই রাতের খাবারের জন্য। ক্রুজের ১৬তম ডেকেই মূল খাবারের সামগ্রিক কাফে-স্টাইল বুফে/ডাইনিং এলাকা। সেখানে গিয়েতো চক্ষু চড়কগাছ! এত খাবার? সারি সারি বুফে রেস্টুরেন্ট। সব ধরনের খাবার সারি সারি ভাবে সাঁজানো। সম্পূর্ণ ফ্রি। পিৎজা, ইটালিয়ান, গ্রীক, ইন্ডিয়ান, ভেজিটেরিয়ান কত কি! সঙ্গে রকমারি ফলের বাহার, রয়েছে নানা রকমের ড্রিংস। কোনো কোনো রেস্টুরেন্টে চাহিদানুযায়ী বানিয়ে দিচ্ছে। এত্ত এত্ত খাবার দেখে পেটের ক্ষুধা হারিয়ে যায়। যাক্ এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখবো পড়ে। বিকাল ৫টায় সবাই খাবার খেয়ে ক্রুজটি ঘুরে দেখতে বের হই তখন ক্রুজটি ছেড়ে দেয় নতুন দিগন্তের উদ্দেশে। দৈত্য আকারের জাহাজটি ছাড়তেই চারপাশে কৌতূহলের ঢল নামল। ইঞ্জিনের গভীর শব্দের তালে তালে নীল সমুদ্রের পাশের বন্দরের ঢেউ ডিঙিয়ে ক্রুজ এগিয়ে চলেছে—চারপাশে শুধু বিশালতা আর রোমাঞ্চ পানিতে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। ডেকে দাঁড়িয়ে যাত্রীরা উচ্ছ্বসিত-কারও চোখে আনন্দ, কারও চোখে হালকা নস্টালজিয়া। বহুতল ভবনের মতো উঁচু সেই জাহাজ সমুদ্রে ভেসে থাকা এক চলমান শহরের মতো মনে হচ্ছিল। বন্দরের ধারে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আত্মীয়-স্বজনরা হাত নাড়ে, কেউ ছবি তুলছে । সূর্যের হাসিমাখা শেষ বিকাল আর শহরের আলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়, সামনে শুধু খোলা সমুদ্র আর নতুন দিগন্তে অভিযানের ডাক।
আজ রাত থেকে পুরো দু’দিন সমদ্রে থাকতে হবে। আটলান্ট্রিক সাগরে ভাসমান অবস্থায় উত্তাল তরঙ্গ ছাড়া বাইরে আর কিছুই দেখা যাবেনা। ফলে অফুরন্ত সময়। ক্রুজের ভিতরেই রয়েছে রকমারি কার্যক্রম। প্রথম রাত! কোনটা করবো, কোনটা দেখবো, কোন ডেকে গিয়ে জানবো কি কি আছে তাই নিয়েই সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠলো। যদিও রুমের ভিতরে কাগজ রয়েছে রাতের কর্মসূচি এবং কোন ডেকে কি কি রয়েছে।
আমি আর রুবী নাতনি আলিয়াকে নিয়ে ঘুরতে শুরু করি। বিশ তলা বিশিষ্ট ক্রুজ। কয়েক হাজার গেষ্ট এবং ক্রু। আমাদের দলের এক এক করে সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। যে যার পথে দেখতে শুরু করল। ক্রুজ থেকে যে আইডি কার্ডটা দিয়েছে মুলত সেখানে সেটাই সব কিছু। সেই কার্ডেই রয়েছে সব তথ্য। ক্রুজের ভিতরে নগদ ডলার কিংবা ক্রেডিট কার্ডের কোন চল নেই। একমাত্র টিপস্ নগদে দেওয়া যায়। ক্রুজের কার্ডে সব কিছু থাকলেও রুম নম্বর লেখা থাকেনা। কারন কার্ডটি হারিয়ে গেলে যাতে অন্য কেউ ব্যবহার করতে না পারে সে সতর্ক থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রথম দিন আট ডিজিটের রুম নাম্বার মনে রাখাটা ছিলো কঠিন এবং কয়েকবার রুম খুঁজতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে। ক্রুজের সামনে এবং পিছনের দিকে আটটি করে মোট ১৬টি এলিভেটর রয়েছে যা দিয়ে প্রতিটি ফ্লোরে উঠানামা করা যায়। এত এলিভেটর থাকা সত্ত্বেও মানুষের ভিড়। প্রথমদিন মাত্র দু’টি ফ্লোর ঘুরেই রুবী টায়ার্ড এবং আলিয়াও কান্না শুরু করাতে ফের ১৬ তলাতে গিয়ে আবারও রাতের খাবার (কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে দ্বিতীয়বার, প্রথমবার দেখে দেখে অবাক হয়েছিলাম ফলে বেশি খেতে পারিনি) সেরে ১৩ তলাতে আমাদের রুমে ফেরার সময় দেখতে পাই আমার নাতি মিলানসহ তার বন্ধুরা সুইমিং করছে,ওয়াটারস্লাইডে খেলছে । আর অন্যরা বসে বসে দেখছে, কেউ কেউ বারের পাশে দাঁড়িয়ে ড্রিংকস করছে। বিশাল পর্দায় চলছে মুভি। রাত যত গভীর হবে সেখানে না-কি মানুষের সমাগম সেখানে বাড়বে চলবে ভোর পর্যন্ত নৃত্য। নামি শিল্পীরা গান গাইবেন আর বাজনার তালে তালে ১৬তম ডেকের ডেন্স ফ্লোরে শত শত মানুষ আনন্দে ভেসে যাবে। বা্ইরে চেয়ে দেখি অন্ধকার শুধু সাগরের শব্দ ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। চলবে…..
জার্নি বাই ক্রুজ পর্ব- ১ ।।। সদেরা সুজন

CBNA24 রকমারি সংবাদের সমাহার দেখতে হলে
আমাদের ফেসবুক পেজে ভিজিট করতে ক্লিক করুন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করতে পোস্ট করুন।



