জার্নি বাই ক্রুজ / Journey by Cruise ।। পর্বঃ ৫ ।।। সদেরা সুজন
পূর্ব প্রকাশের পর
আজ ক্রুজের চতুর্থ দিন। গত রাতেও অনেক দেরিতে বিছানায় গেলেও ঘুম কতটুকু হয়েছে জানিনা। জানালার পর্দা সরাতেই দেখতে পেলাম দূরে লাইটগুলো জ্বলছে। বুঝতে অসুবিধে হয়নি আমরা দিগন্তের দ্বারপ্রান্তে। বড্ড দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছে দিনগুলো ভাবতে ভাবতেই ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের সেন্ট থমাসে, যা ইউনাইটেড স্টেটসের একটি টেরিটরিতে নোঙর করলো। তখন সবেমাত্র ভোরের সূর্যালোকে আলোাকিত দিগন্ত। রুবী তখনো ঘুমাচ্ছে। আমি একা ব্যালকনিতে বসে পাখিদের খেলা দেখছিলাম, দূরে দ্বীপের বসতি, সুন্দর সুন্দর বিল্ডিং, সবুজ প্রকৃতি এবং পাহাড় আর জনপদের মাঝে মাঝে দৃশ্যপটে ছোট ছোট গাড়ীর দুরন্ত ছুটে চলা আমাকে বেশ আন্দোলিত করছিলো, কিন্তু কাউকে শেয়ার করতে পারছিলাম না। কারণ রুবী ঘুমাচ্ছিল। ওর ঘুমের সমস্যা ফলে তাকে কোনক্রমেই ডাকতে চাইনি। কিন্তু আমার যে আর একা সইছিলোনা। শেষে সেল ফোন এনে একা একাই সেলফি তুলি। ক্রুজ থেকে দ্বীপের যে ভিউ দেখেছি তা ছিলো অপূর্ব। সেন্ট থমাস হচ্ছে US Virgin Islands এর অংশ; এখানে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক আইন প্রযোজ্য হয় । Charlotte Amalie হচ্ছে এই দ্বীপের রাজধানী ও সবচেয়ে বড় শহর, যা সুন্দর হার্বার, পুরাতন ড্যানিশ স্থাপত্য, বিপুল পর্যটক আকর্ষণ (বিশেষত ক্রুজ শিপ ও শপিং) দিয়ে পরিচিত। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ১৪৯৩ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস দ্বীপটি দেখেন এবং পরবর্তীতে এটি বিভিন্ন ইউরোপীয় শক্তি যেমন দ্যানিশদের দ্বারা শাসিত হয়েছিল। ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র এটি কিনে নেয় এবং এরপর থেকে এটি USVI এর অংশ হিসেবে থাকে। এককথায় সেন্ট থমাস হলো যুক্তরাষ্ট্রের অধীন দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান দ্বীপ, যা তার চমৎকার সৈকত, ইতিহাস, শপিং, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
সকালে সবাই ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি করলেও আমি কিন্তু সবার অপেক্ষায় বসে থাকিনি। একা একা গিয়ে প্রাথমিক ব্রেকফাস্ট সেরে নেই। ফুড কোর্ট এলাকা থেকে দু’কাপ কপি নিয়ে রুমে ফিরেই দেখি রুবী ফ্রেস হয়ে আমাকে খুঁজছে। তখনো হয়তো আমাদের টিমের অন্যন্যরা ঘুমাচ্ছে।
নির্ধারিত সময়ের একটু দেরিতেই ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে ব্রেকফাস্ট করে বাইরে চলে যাবার সিন্ধান্ত হলো তখন ক্রুজ প্রায় খালি। সবাই চলে গেছে নতুন দ্বীপটি দেখার জন্য। পাহাড় আর সাগরের পাদদেশে দ্বীপটি। দ্বীপটিতে নামতেই মনে হলো বাংলাদেশে এসেছি, সেখানে গেলেই যে দেশের মাটি ও মানুষের আলাদা গন্ধ একটা অনুভুতির সুষ্টি হতো তেমনটি পেয়েছি সেখানে। এই দ্বীপে আমাদের মূল আকর্ষণ হলো সমুদ্রসৈকতে বাচ্চাদেরকে নিয়ে সময় কাটানো। সেন্ট থমাসে সমুদ্র সৈকত বিশ্বে অনেক পরিচিত। সেখানে যাওয়া কিছুটা কঠিন আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রায় ১৫৫৫ ফুট উচ্চতার পাহাড় ডিঙানো সহজ কথা নয়। কিন্তু ক্রুজ থেকে বের হবার পরই জানতে পারলাম সেখান থেকে সমুদ্রে সৈকতে যেতে হলে গাড়ী ভাড়া করতে হয়। সেখানে সারি সারি বড় বড় গাড়ী রয়েছে পর্যটকদেরকে নিয়ে ঘোরানোর জন্য। আমরা সেখানে যাওয়ামাত্র একজন এসে অনুনয় করলো আমি ফিলিস্তিনির নাগরিক। আমাকে সহযোগিতা করো! আতুল তাই করলো। অন্যান্য পর্যটক বহন করার জন্য সুন্দর সুন্দর গাড়ী ( যা সীটে বসেই দু’দিকের ভিউ দেখা যায়) থাকলেও তাকেই নিলো। গাড়ীটি ছিলো অনেক পুরানো মডেলের এবং এমন রাস্তায় চলাচলের অযোগ্য! আমি প্রচন্ড ভয় পেলেও কাউকে সেটা বলিনি। আমি সেল ফোন দিয়ে ভিডিও করতে শুরু করি। এমন প্রাকৃতিক দৃশ্য বাংলাদেশ ছেড়ে আসার পর আর কখনো দেখা হয়নি। প্রায় ১৫৫৫ ফুট উঁচু পাহাড়ের আঁকা-বাঁকা পথে চলছে দুরন্ত গতিতে। রাস্তাও কিন্তু ছোট। এক লেইনের। পাহাড় অতিক্রম করার সময় বাড়িগুলোতে নারিকেল, কলা, আম, ক্যাকটাস পেঁপে, কাঁঠাল, মাহোগানি, বাঁশঝাড় দেখে বিচলিত হয়ে চিৎকার করে বলতে শুরু করলো যা মনে হলো এসব দেখে রুবী চলে গেছে বাংলাদেশে। অন্যান্য অসংখ্য গাছ ছিলো সেখানে, কিন্তু সেই গাছগুলো তাকে প্রাণবন্ত করতে পারেনি। পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচে নামার সময় ভিউ পয়েন্ট আছে সেখান থেকেই অসাধারণ দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করার চেষ্টা করলাম। এই আঁকা বাঁকা উঁচু পাহাড়ি রাস্তা পার হয়ে ম্যাজেন্স বে বিচে গিয়ে সবাই মিলে সমুদ্র স্নান করি, সাঁতার কাটি, পাশে বোটানিক্যাল গার্ডেন আমি আর রুবী নাতনিকে নিয়ে হাঁটতে থাকি। সারি সারি রকমারি বৃক্ষরাশির মাঝ দিয়ে গাছপালা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করি। পাশে ছিলো চিরচেনা আমাদের প্রিয় ঘুঘু পাখিদের সম্ভাষণ নৃত্য।
আজ রাতে আমার নাতনির জন্মদিন পালন করার কথা ছিলো যে রেস্টুরেন্টে সেখানে কোন এক কারণে ক্যানসেল করে আগামীকাল সন্ধ্যা ৭টা নির্ধারণ করাতে আমরা রাতের খাবার বুফেতে সেরে নেই। তার পর মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্ন ডেকে ঘুরতে ঘুরতে একটি স্টোরে গিয়ে নরওয়েজিয়ান-এর লোগো লাগানো একটি ওয়াটার বোতল এবং একটি টিশার্ট কিনি। সকালে আমার প্লাস্টিকের বোতলটি সৈকতে ভুলে রেখে এসেছি ফলে আগামীকালের জন্য সেটা কিনতে্ই হতো।
চলবে….
জার্নি বাই ক্রুজ পর্ব- ১ ।।। সদেরা সুজন
জার্নি বাই ক্রুজ পর্ব- ২ ।।। সদেরা সুজন
জার্নি বাই ক্রুজ পর্ব- ৩ ।।। সদেরা সুজন
জার্নি বাই ক্রুজ পর্ব- ৪ ।।। সদেরা সুজন




