জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন শুধু অর্থনীতি বা শিল্পে সীমাবদ্ধ নেই, ছুঁয়ে গেছে শিক্ষাব্যবস্থাকেও। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে সেই পরিচিত দৃশ্য- স্ক্রিনের সামনে বসে ক্লাস করছে শিশুরা। করোনাকালে যে অভিজ্ঞতা একসময় ছিল জরুরি বিকল্প, এখন তা আবার হয়ে উঠছে বাস্তবতা।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন এক দুশ্চিন্তাও সামনে এসেছে শিশু-কিশোরদের হাতে স্মার্টফোন। পড়াশোনার প্রয়োজনে ডিভাইস দেওয়া হলেও, এর ব্যবহার যে সব সময় শুধুই শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে না, সেটিই ভাবাচ্ছে অভিভাবকদের। অনলাইন ক্লাসের জন্য সন্তানের হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার আগে তাই কিছু বিষয়ে সচেতন থাকা খুবই জরুরি। সামান্য অসতর্কতা শিশুদের পড়াশোনা, মানসিক স্বাস্থ্য এমনকি নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
শেখার সুযোগ, সঙ্গে নতুন ঝুঁকি
অনলাইন ক্লাস শিশুদের জন্য নতুন শেখার দুয়ার খুলে দেয় ভিডিও লেকচার, ইন্টার্যাকটিভ কনটেন্ট, সহজ যোগাযোগ সবই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু একই ডিভাইসে যখন গেম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবেশাধিকার থাকে, তখন পড়াশোনা আর বিনোদনের সীমারেখা দ্রুত ঝাপসা হয়ে যায়।
ফলে শিশুর মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, সময় নষ্ট করা, এমনকি অনলাইন নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সময়ের নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
অনলাইন ক্লাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময় ব্যবস্থাপনা। অনেক সময় ক্লাস শেষ হলেও শিশুরা মোবাইল ছাড়তে চায় না। ভিডিও দেখা বা গেম খেলার প্রবণতা বাড়ে, যা ধীরে ধীরে ঘুম, খেলাধুলা এবং স্বাভাবিক রুটিনকে বিঘ্নিত করে।
তাই নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দেওয়া এবং তার বাইরে ডিভাইস ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আনা জরুরি।
কোন অ্যাপ ব্যবহার করছে খেয়াল রাখুন
শিশু কোন অ্যাপ ব্যবহার করছে, সেটি জানা অভিভাবকদের দায়িত্বের অংশ। অনলাইন ক্লাসের অজুহাতে অনেক সময় তারা অন্য অ্যাপ ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারে। নিয়মিত ফোন চেক করা বা অ্যাপ ব্যবহারের তালিকা দেখা এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সতর্কতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, অনুপযুক্ত কনটেন্টে এক্সপোজার কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার মতো ঘটনা ঘটতে পারে খুব সহজেই।
তাই প্রয়োজন না হলে এসব অ্যাপ ইনস্টল না করাই ভালো, আর ব্যবহার করলেও কঠোর নজরদারি জরুরি।
ডিজিটাল নিরাপত্তা শেখানো এখন অপরিহার্য
শিশুকে শুধু ডিভাইস ধরিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। তাকে শেখাতে হবে—
অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা না বলা
ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি শেয়ার না করা
সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করা
এই ছোট ছোট সচেতনতাই বড় বিপদ এড়াতে সাহায্য করে।
প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করা যেতে পারে
বর্তমানে বেশিরভাগ স্মার্টফোনেই প্যারেন্টাল কন্ট্রোল বা স্ক্রিন টাইম ম্যানেজমেন্টের সুবিধা রয়েছে। এসব ফিচার ব্যবহার করে নির্দিষ্ট অ্যাপের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া যায়, এমনকি কিছু অ্যাপ পুরোপুরি ব্লকও করা সম্ভব। এতে শিশুর অনলাইন কার্যক্রম সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
পড়াশোনার জন্য আলাদা পরিবেশ দরকার
অনলাইন ক্লাসের সময় শিশুকে এমন জায়গায় বসানো উচিত, যেখানে অভিভাবকের নজর থাকে। এতে মনোযোগ বাড়ে এবং অন্য কাজে ফোন ব্যবহারের সুযোগ কমে যায়। ব্যক্তিগত ঘরে একা বসে ক্লাস করলে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
অফলাইনের গুরুত্ব ভুলে গেলে চলবে না
প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে অফলাইন কার্যক্রমে উৎসাহ দেওয়া জরুরি। বই পড়া, খেলাধুলা, আঁকাআঁকি বা সৃজনশীল কাজ শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অনলাইন ক্লাস থাকলেও জীবন যেন পুরোপুরি স্ক্রিনে বন্দি না হয়ে যায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন ক্লাস এখন সময়ের দাবি। তবে এর সুবিধা নিতে হলে ঝুঁকিগুলো বুঝে চলা জরুরি। অভিভাবকদের সচেতনতা, সময়মতো নজরদারি এবং সঠিক দিকনির্দেশনাই পারে প্রযুক্তিকে শিশুর জন্য আশীর্বাদে পরিণত করতে, অভিশাপে নয়।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক
এফএইচ/বিডি
CBNA24 রকমারি সংবাদের সমাহার দেখতে হলে
আমাদের ফেসবুক পেজে ভিজিট করতে ক্লিক করুন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করতে পোস্ট করুন।



