ভ্রমণ

আমস্টারডাম থেকে গ্রিস! গ্রিস থেকে প্যারিস হয়ে মন্ট্রিয়ল

আমস্টারডাম-থেকে-এথেন্স

 পূর্ব প্রকাশের পর ঃ পর্ব – দুই


⇒ আমস্টারডাম থেকে গ্রিস! গ্রিস থেকে প্যারিস হয়ে মন্ট্রিয়ল

অনেকটা পথ অতিক্রম করে আমরা দুজন গ্রীসের বন্দর নগরী প্যারেয়াসে পৌঁছলাম, ওখানে এসে সস্তায় YMCA  হোটেল খুঁজতে শুরু করলাম, কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর হোটেল খোঁজেও পেয়ে গেলাম! তখন পেটের ভিতর ক্ষুধায়  ভুঁ ভুঁ করছে। গ্রীকদের খাবার সারা বিশ্বে রাজত্ব করছে। গ্রীক খাবার দাবার অনেক মজাদার এবং স্বাদের, কিছুটা ইন্ডিয়ান খাবারের সঙ্গে মিল রয়েছে,কাজেই খাওয় দাওয়াতে কোন সমস্যা হয়নি। সেখানের মানুষরা অনেক ভাল !

গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল একটাই, গ্রিসে  শীপে চাকুরি নিয়ে আমেরিকা কিংবা অষ্ট্রেলিয়া জাহাজে গেলে সেখানে সুযোগ বুঝে নেমে যাওয়া,  যদিও এটা ছিল আমার জন্য নেহায়েত বোকামী  ছাড়া কিছুই নয়।

কারন ইরান থেকে শীপে আমেরিকা গিয়েও সেসময় থাকা হয়নি ! তারপর শীপ থেকে  দেশে  ফিরে, জার্মানী পাঁচ বছর থাকার পর আবার শীপে চাকরী নেওয়া, এটা ভুল ও poor Decision ছিলো। যাহোক  বিভিন্ন বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলোতে ধরনা দেওয়া হলো চাকুরির জন্য, নরমালি শীপে চাকুরী নিতে গেলে এজেন্সিগুলোকে অনেক অর্থ দিতে হয়।

আমরা দুজন বেশ চেষ্টা করলাম, কোথায়ও কোন আশ্বাস পাওয়া গেলনা ! এমনকি আমার পুরানো কোম্পানি, Mornos shipping co, Athens T, T, তে যাওয়া হলো, hopeful, হয়ে ফিরে আসা হলো,  কি করবো! তিন চার দিন চলে গেল, বসে বসে খাচ্ছি হোটেল ভাড়া দিচ্ছি, কি করা যায়, দুজনে ভাবছি তবে প্রবাসের বাড়িতে  টাকা হলো বড় শক্তি ! আমার কাছে অনেক টাকা ছিল, ইতালি, ফ্রান্স, হল্যান্ড, বেলজিয়ামসহ আরও বেশ কিছু  দেশের ভিসা ছিল আমার পাসপোর্টে !

আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ফ্রান্স চলে যাবো। আমরা one way ticket করে চলে গেলাম ফ্রান্স!  আমাদের জন্য নতুন শহর, নতুন জায়গা। আমাদের জার্মানীর এক বন্ধুর পরিচিত লোক ছিল সেলিম ভাই, ওনাকে ফোন করা হলো।  এয়ার পোর্ট থেকে উনি আমাদের চলে যেতে বললেন তার বাসায়। আমরা এয়ারপোর্ট থেকে টেক্সি করে তার বাসায় চলে যাই ! এই সেলিম সাহেব ছিলেন একজন আদর্শ  প্রবাসী যিনি নবাগত প্রবাসীদেরকে প্রাণখুলে সহযোগিতা করতেন। যাক্ উনার বাসা ছিলো অনেক ছোট, একরাত উনি কষ্ট করে আমদের রাখলেন! পরের দিন শহর থেকে অনেক দূরে, আমাদের জন্য একটা বাসায় নিয়ে যাওয়া হলো, সেখানে আরও ৭/৮ জন বাঙালি ছিলো, সে বাসায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেলো। দুটি বেড ছিল, বেশীর ভাগ লোক ফ্লোরে ঘুমাতো আমরাও তাই করলাম। যাহোক ফ্লোরে ঘুমানো  কোন বড় ব্যপারনা, প্যারিসের  মত শহরে সে সময় থাকার জায়গা পাওয়া বেশ কঠিন ছিলো।  তাছাড়া কাজ কর্মের অভাব, বেশীরভাগ বাংলাদেশি ভাইয়েরা পেপার ও ফুল বিক্রি করতো, সেদেশের কাগজ থাকলে লিগ্যাল কাজ পাওয়া যেত ! অনেকটা ভালো কাজ।

তারপর কি করবো যেখানে ছিলাম সেখানে গোসলখানা ছিলোনা, টয়লেট ছিল সম্ভবত বাইরে মনে হয়, আজ আর  ঠিক মনে নেই, অনেক বছর হয়ে গেছে। আর সেই দেশ সেই শহর আজকের মতো এতো উন্নত ছিলোনা।  তবে এটা মনে আছে এক সপ্তাহ পর পর প্যারিস শহরে গিয়ে পয়সা দিয়ে গোসল করে ছিলাম। Paris ছিল অনেক expensive city ! কি করবো কাজ খুঁজতে লাগলাম, ইংরেজি বুঝেইনা শুধুই ফরাসি ভাষা!

আরও একটা ঘটনা না বললেই নয়,  আমার সাথে যে সাথী সিরাজ ছিলো, ওর কাছে  টিকিট কেনার টাকা ছাড়া আর কোন অতিরিক্ত টাকা  ছিল না!  তখন বাংলাদেশ সরকারের একটি আইন ছিলো যারা দেশের বাইরে যাবে $ ৬০০ us ডলারের বেশী passport এ endures  করতে পারবেনা ! বাকি টা লুকিয়ে  নিয়ে যেতে হতো যাত্রিরা। আমরা ও তাই করতাম দেশের  বাইরে আসার সময় ! যেটা বলতে ছিলাম, আমি সিরাজকে বললাম তোমার কাছেতো টাকা নেই, $৬০০ ডলার তোমার কাছে রাখো, তোমার পাসপোর্টে  endures. করো, আর হয়তো ওর কাছে ২/৩ শত ডলার কেশ ছিল !

হঠাৎকরে একদিন প্যারিসের সেলিম ভাই  বললো, আপনারা এখানে অনেক কষ্ট করবেন, কাজকর্ম পাবেন কিনা সন্দেহ, অনেকেই বেকার মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারচেয়ে মনে হয় ভালো হবে কানাডা চলে যান!  ওনার  কাগজ ছিল ফ্রান্সের, বললো আমি গিয়েছিলাম চলে এসেছি দেখে!  কানাডা এয়ারপোর্ট এন্ট্রি ভিসায় ভিতরে যাওয়া  যায় ! তিনি বললেন ওনার পরিচিত লোক আছে কানাডায় বাংলদেশি রেষ্টুরেন্টের মালিক সিলেটি  হাজী মফিজ ভাই। তার কথামত কানাডা আসার জন্য আগ্রহ হলো। কিন্তু সিরাজ রাজি হলোনা। ও এক দালাল বাটপারের ক্ষপ্পরে পরে যায়। ওকে আমেরিকা পাঠাবে বলে দালাল চুক্তি করেছে গোপনে। সেসময় প্যারিসে  বাটপারের দল খুব বেশী ছিলো, আর এ বাটপার গুলো ছিল বাংলাদেশের একটা জেলার লোক। যখনই কোন নতুন  লোক যেতো ফ্রান্সে সুযোগ পেলেই  দাদাগিরী  করতো আর বিভিন্ন কায়দায় তাদের কে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করতো মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে। প্যারিসে গিয়ে অনেকেই ভাষাগত সমস্যার কারণে অসহায় হয়ে থাকতে হতো তদোপরি চাকরি-বাকরি নেই, থাকার ব্যবস্থা নেই ফলে এসব দালাররা সহজেই অসহায় মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে পারতো। মিষ্টি মিষ্টি কথা দিয়ে  আমেরিকা, ইংল্যান্ড পাঠাবে বলে টাকাগুলো নিয়ে নিত ! আমার সাথী তার মধ্যে একজন! আমি আমার ছয়শত ডলার ফেরত চাইলাম। সে তখন অস্বিকার করে যে তাকে আমি কোন ডলার দেইনি!  ফরিদপুরের মানুষতো? ওকে রুমের লোকেরা টাকা ফেরত দিতে বলাতে পরের দিন সে প্যারিসে বসবাসরত বাটপারের বাসায় চলে যায়, টাকাটা আজো ফেরৎ পাইনি, জীবনে এ সরল বিশ্বাসী লোকরাই  সারা জীবন এভাবেই ঠকে থাকে, আর মানুষ তাদেরকে এভাবে ঠকিয়ে থাকে!

তারপর কানাডায় আসার সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু যেতে হলে টিকিট দরকার কিন্তু সেই পরিমান টাকা তখন আমার সঙ্গে ছিলোনা। কারন সহযাত্রিকে সহযোতিা করতে গিয়ে নিজেই আটকা পড়লাম। ভাই ছিল জার্মানীতে। তাকে ফোন করলাম। ১১০০ বা ১৪০০ শ’ মার্ক হবে যা ভাই সেলিম ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিল। সেলিম ভাই আমার কানাডা আসার ব্যবস্থা করলো। প্লেনের টিকিটের  জন্য বুকিং করলো। এয়ারপোর্টে নেমে কি কি করতে হবে, বলতে হবে, সব শিখিয়ে দিয়েছিলো!  Air France এর রিটার্ন টিকিট করা হলো 17th July 1982 Paris to Montreal Mirabel  air port ।  সবচেয়ে মনে রাখার ঘটনা হলো, যে দিন আমার ফ্লাইট ছিল বিকেলে। আমি যেখানে থাকতাম শহর থেকে একশত কিলোমিটার দুর হবে আর Paris Airport হবে ৫০/৬০ কিলোমিটার দূরে, আমি শহরে গিয়ে ছিলাম ticket টা পিকআপ করতে !

প্যারিসের মেট্রোটা হিজিবিজি অনেক ক্রসিংয়ের লিংস। এক-দুদিনে নয় কয়েক সপ্তাহেও আয়ত্বে আনা অনেক কঠিন।  এ বিশাল বিভিন্ন  Direction underground train।  নতুন মানুষ তাছাড়া টেনশন কি হবে, না হবে, বাটপার টাকা মেরে দিল, আমি মেট্রোতে হারিয়ে যাই, অন্য Direction  এ চলে যাই।  একঘন্টার বেশী সময় আমি underground এ ঘুরি  সময় নষ্ট করি দিকভ্রান্ত দিশেহারা হয়ে।  তারপর হঠাৎ আমার মাথায় আসলো  সামনের স্টপে নেমে Taxi কেন নেই না ! তারপর এ taxi করে বাসায় এসে তাড়াহুরা করে ঐ Taxi করেই এয়ারপোর্টে আসি। বোর্ডিং পাসের সময় এলো Air port authority চেক করলো বাংলাদেশিদের জন্য কানাডার কোন ভিসা লাগে কি না?  সেসময় ভিসা লাগতোনা ! প্লেনে বসলাম, চলে এলামকয়েক ঘন্টার মধ্যেই কানাডায়। এয়ারপোর্টে ভিসা দিল তিন মাসের। প্রশ্ন করলো কেন এসেছো বললাম তোমার সুন্দর দেশটি দেখতে, ভ্রমণ করতে।  কোন ঠিকানা আছে কিনা জানতে চাইলো?  বলেছিলাম  হোটেলে থাকবো। Taxi করে চলে আসি সে Bishop street, এর Concordia university সামনে প্রথম বাঙালি রেষ্টুরেন্ট, ‘বাংলাদেশ রেষ্টুরেন্ট’ এ। ওনাকে পরিচয় দিলাম,  বললো সেলিম ভাই কেমন আছে ! ওনার রেষ্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে আমাকে তার সাউথসুরের বাড়িতে নিয়ে যান ! …..

চলবে…

রশিদ খান, ব্যবসায়ি ও কমিউনিটি নেতা

 

সিএ/এসএস


সর্বশেষ সংবাদ

দেশ-বিদেশের টাটকা খবর আর অন্যান্য সংবাদপত্র পড়তে হলে CBNA24.com

সুন্দর সুন্দর ভিডিও দেখতে হলে প্লিজ আমাদের চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

সংবাদটি শেয়ার করুন