বিচিত্র কুমার এর একগুচ্ছ বৈশাখের রোমান্টিক কবিতা
(০১)
বৈশাখী
সেই বৈশাখের দুপুর কি মনে আছে?
নক্ষত্রের মতো তপ্ত ছিলো রোদ,
আমরা হেঁটেছিলাম শুকনো ধুলোর পথ ধরে,
তোমার আঙুল জড়িয়ে ছিলো আমার হাতের রেখাগুলো।
গোলাপি শাড়ির আঁচল দুলছিলো হাওয়ায়,
আমি দেখেছিলাম—
তোমার কপালে ছোট্ট বিন্দু ঘাম,
যে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে চাইছিলো আমার বুকে।
তুমি হেসেছিলে,
সে হাসিতে মিশে গিয়েছিলো
কাঁচা আমের টক-মিষ্টি গন্ধ,
তপ্ত বাতাসও তখন একটুখানি নরম হয়েছিলো,
একচিলতে মেঘের মতো।
আমরা বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম একসঙ্গে,
তোমার ভিজে চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়েছিলো,
সে জলে যেন ছিলো ভালোবাসার অমৃত,
আমি চেয়েছিলাম—
তোমার গন্ধ মাখা সেই বৃষ্টি ধরে রাখতে,
যেন আর কখনও শুকিয়ে না যায়।
তুমি ফিসফিস করে বলেছিলে—
“তুমি ছাড়া বৈশাখ মরুভূমি,
তুমি ছাড়া এই হাওয়া কেবল ধুলোর ঝড়,
আমি থাকবো, যত ঝড়ই আসুক,
তুমি শুধু আমায় ধরে রেখো!”
আমি রেখেছিলাম, যতটা পারা যায়…
কিন্তু সময়? সে বড় নির্মম!
এক বৈশাখে তুমি হারিয়ে গেলে—
ঝড়ের ডাকে তোমার কণ্ঠ মিশে গেলো,
তুমি গেলে দূরে, আর বৈশাখ?
সে ফিরে আসে প্রতি বছর,
তবে তার হাওয়ায় আজ আর নেই
তোমার শাড়ির ঘ্রাণ, তোমার মিষ্টি হাসি,
শুধু থাকে বিক্ষত হৃদয়ে নিঃশব্দ ঝড়!
(০২)
বৈশাখের সেই সন্ধ্যা
সন্ধ্যার আলো ছিলো কমলা রঙের,
তপ্ত দিনের ক্লান্তি ছড়িয়ে পড়ছিলো বাতাসে,
তবু তোমার চোখের দীপ্তিতে
বৈশাখ যেন নতুন করে জ্বলে উঠেছিলো।
শিমুল-পলাশের আগুন ঝরছিলো পথে,
আর তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে—
বৈশাখী হাওয়ার দোলায় চঞ্চল,
গোধূলির আকাশে রঙ ছড়ানো এক কবিতা হয়ে।
তোমার কপালের টিপ লাল হয়ে উঠেছিলো সূর্যের মতো,
আমার চোখের আলো মিশে গিয়েছিলো তাতে,
তুমি বলেছিলে—
“এভাবে তাকিয়ে থেকো না,
বৈশাখের আগুনে আরেকটা আগুন যোগ হয়ে যাবে!”
আমি হেসেছিলাম,
তোমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলাম—
“এই আগুন নিভবে না কখনও,
এই বৈশাখ আমাদের সাক্ষী!”
তুমি জানো, বৈশাখ আজও আসে,
গোধূলির আলো আজও ঝরে,
তবু সে সন্ধ্যায় তুমি নেই,
তোমার হাসি নেই, তোমার উষ্ণতা নেই।
আজ বৈশাখের হাওয়া ধুলো উড়িয়ে নিয়ে যায়,
আমার বুকের গভীর থেকে—
একটা অসম্পূর্ণ গল্প,
একটা হারিয়ে যাওয়া প্রতিশ্রুতি,
একটা নাম, যা বাতাসে ভেসে যায়—
তুমি… তুমি… তুমি…
(০৩)
বৈশাখী বৃষ্টি ও তুমি
সেদিন বিকেলটা যেন কবিতা ছিলো,
নীরব অথচ বুনো বাতাসে মোড়া,
আকাশ কালো মেঘের আঁচলে ঢাকা,
আর দূর কোথাও বাজছিলো বাদলের সুর।
তুমি তখন আমার পাশে, একদম নীরব—
চোখে এক পৃথিবী কথা নিয়ে।
তোমার চুল উড়ছিলো বৈশাখী ঝড়ে,
সে কি শুধুই বাতাস ছিলো?
না কি আমার বুকের গভীরে দোলা দেওয়া
একটা উন্মাদ উষ্ণতার নদী?
আমি চেয়েছিলাম তোমাকে ছুঁতে,
ঠিক যেমন তৃষ্ণার্ত মাটি
প্রথম বৃষ্টির ছোঁয়া চায়।
তুমি বলেছিলে—
“বৈশাখ মানে ঝড়, বৃষ্টি আর উড়ন্ত সময়,
কিন্তু আমাদের গল্প কি থাকবে চিরকাল?”
আমি শব্দ খুঁজছিলাম,
তার আগেই বৃষ্টি এলো—
তুমিও ভিজলে, আমিও।
তোমার কপালে জমে থাকা জলের বিন্দু,
তোমার ঠোঁটে চেপে রাখা আধভেজা কথা,
আর তোমার হাতের কাঁপুনিতে
আমি বুঝেছিলাম—
বৈশাখ শুধু ঝড় নয়,
সে কখনো কখনো ভালোবাসার বর্ষণও হয়।
তুমি কাঁপছিলে, আমি তোমায় জড়িয়ে নিয়েছিলাম,
বৃষ্টি পড়ছিলো, আমাদের মাঝের দূরত্ব মুছে দিয়ে,
তুমি তখন ধরা দিয়েছিলে আমার অস্তিত্বে,
তুমি তখন ছিলে আমার বৃষ্টিভেজা কবিতা।
আজও বৈশাখ আসে,
বৃষ্টি ঝরে, বাতাস বইতে থাকে,
শুধু তুমি নেই, তোমার সেই কাঁপুনি নেই,
শুধু রয়ে গেছে এক বুক অপেক্ষা,
একটা অন্ধকার সন্ধ্যা,
যেখানে প্রতিটি ফোঁটায় তুমি আছো,
আমার হৃদয়ের গভীরে,
আমার প্রতিটি বৈশাখে…
(০৪)
তোমার চোখে বৈশাখ
সেদিন বৈশাখ এসে দাঁড়িয়েছিলো আমাদের মাঝখানে,
বাতাসে ছিলো ধুলো, রোদ ছিলো তপ্ত—
তবু তোমার চোখের গভীরে
আমি দেখেছিলাম বৃষ্টি নামার অপেক্ষা।
তুমি হেঁটেছিলে ধুলো উড়িয়ে,
গরম বাতাস তোমার শাড়ির আঁচলকে ছুঁয়ে বলেছিলো—
“থেমো না, থেকো না, উড়েই যাও!”
কিন্তু তুমি থেমেছিলে,
আমার দিকে তাকিয়ে,
এক মুহূর্তের জন্য,
যেন সেই চাহনিতেই লুকিয়ে ছিলো—
একটা অমর প্রেমের শপথ।
আমি তোমার চোখে দেখেছিলাম বৈশাখী ঝড়,
তুমি কি জানো?
তুমি যখন হাসো,
শিমুল-পলাশের মতো আগুন ফুটে ওঠে আমার ভেতরে,
আর যখন চুপ করে থাকো,
বৈশাখী সন্ধ্যার মতো
কিছু অব্যক্ত কথা ঝুলে থাকে বাতাসে।
সেদিন তুমি ফিসফিস করে বলেছিলে—
“তুমি কি বৈশাখের মতো?
ঝড়ের মতো এসে একদিন মিলিয়ে যাবে?”
আমি তোমার হাত ধরে বলেছিলাম—
“আমি বৃষ্টি হবো, তোমার আকাশে থেকে যাবো চিরকাল।”
বৃষ্টি পড়েছিলো ঠিক তখনই,
আমাদের চুপ করে থাকা মুখের ফাঁকে,
তোমার কপালে ঠেকে থাকা নরম ফোঁটাগুলোয়,
আমার বুকে জমে থাকা ভালোবাসার নদীতে।
আজও বৈশাখ আসে,
ঝড় ওঠে, ধুলো উড়ে যায়,
তুমি নেই—
কিন্তু তোমার চোখের সেই গভীর বৈশাখী সন্ধ্যা
আজও আমার বুকের ভেতর ঝড় তোলে,
আজও আমার আকাশে বৃষ্টি হয়ে ঝরে…
(০৫)
বৈশাখী প্রথম প্রেম
সেদিন বৈশাখ নেমেছিলো আমার হৃদয়ের উঠোনে,
ঝড়ের দোলায় দুলছিলো কৃষ্ণচূড়া,
আর তার নিচে দাঁড়িয়ে তুমি—
রক্তিম বিকেলের আলোয় ঠিক আগুনের মতো!
বাতাসে উড়ছিলো তোমার কেশরাজি,
আমি বিভোর হয়ে তাকিয়ে ছিলাম,
তুমি কি জানো?
সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিলো—
আমার সমস্ত কবিতার জন্ম তোমার সিঁথির রেখা থেকে!
আমি বলেছিলাম—
“তুমি বৈশাখী ঝড়ের মতো,
অবাধ, উন্মাদ, অথচ সুন্দর!”
তুমি হেসেছিলে—
তোমার সেই হাসির শব্দে
গোধূলির আকাশ আরও লাল হয়ে উঠেছিলো।
আমি তোমার হাত ছুঁয়ে বলেছিলাম—
“ঝড় এলেই সবাই আশ্রয় খোঁজে,
কিন্তু আমি চাই এই ঝড়ে হারিয়ে যেতে,
যদি গন্তব্য তুমি হও।”
তুমি কিছু বলোনি,
শুধু হাতের তালুতে এঁকে দিয়েছিলে
একটা নীরব প্রতিশ্রুতি,
যার ভাষা শুধু আমি বুঝতে পারতাম।
তারপর নামলো প্রথম বৈশাখী বৃষ্টি,
তুমি ভিজছিলে, তোমার শাড়ির কোণা জলমগ্ন,
তোমার ঠোঁটে বৃষ্টির ফোঁটা,
আর তোমার চোখে—
ভালোবাসার এক গভীর সমুদ্র!
আমি কি করবো?
আমি তোমাকে আরও কাছে টেনে নিলাম,
তুমি আমার বুকে মাথা রেখেছিলে,
আর সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিলো—
বৈশাখ এসেছে শুধু আমাদের দুজনের জন্য।
আজও বৈশাখ আসে, ঝড় ওঠে,
বৃষ্টি ভেজায় পুরনো পথগুলো,
শুধু তুমি নেই—
তবু বাতাসে আজও ভাসে তোমার ঘ্রাণ,
বৃষ্টি ফোঁটায় খেলে যায় তোমার চুম্বনের উষ্ণতা,
আমার হৃদয়ের কৃষ্ণচূড়া আজও লাল,
কারণ তুমি আজও আছো—
আমার সমস্ত বৈশাখে, আমার প্রতিটি প্রেমে…