ফিচার্ড বিশ্ব

ট্রাম্পের পর পুতিন আসছেন চীনে, খেলা চলছে অন্য লেভেলে!

বিশ্বের নেতৃত্ব যাবে কার হাতে?

ডনাল্ড ট্রাম্প ফিরে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বেইজিংয়ের বড় ঘোষণা। ভ্লাদিমির পুতিন ১৯ মে দুদিনের সফরে চীন আসছেন। ট্রাম্পও ছিলেন দুদিন। সাথে ১৭ বিশ্বখ্যাত কোম্পানির সিইও। চারদিন পর সে শহরে পুতিন। বহুপাক্ষিক কোনো ইভেন্টের বাইরে চীন এই প্রথম জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্যকে একই মাসে আতিথেয়তা দিচ্ছে।

নিরাপত্তা পরিষদের অন্য দুই সদস্য দেশের নেতারাও সম্প্রতি চীন সফর করেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন গত ডিসেম্বরে বেইজিং ঘুরে গেছেন। আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এসেছিলেন জানুয়ারিতে। চীনের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার রাশিয়া। পুরো ব্যবসায়ীক লেনদেন হয় চায়নার ইয়ান আর রাশিয়ার রুবলে। রাশিয়ার ফসিল ফুয়েলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এখন চীন। আর রাশিয়ার ড্রোন তৈরির কাজে পুরোপুরি যুক্ত চীন।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর আমন্ত্রণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ১৯ থেকে ২০ মে পর্যন্ত চীন সফর করবেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এ খবর জানিয়েছে।

ক্রেমলিন জানিয়েছে, এই সফরকালে পুতিন ও শি মস্কো এবং বেইজিংয়ের মধ্যে “ব্যাপক অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার করার” উপায় নিয়ে আলোচনা করবেন। এতে আরও বলা হয়, দুই নেতা “গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময়” করবেন এবং আলোচনা শেষে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

এই সফরের অংশ হিসেবে পুতিনের চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা নিয়ে পৃথক আলোচনা করার কথা রয়েছে। পুতিন ২০ বারের বেশি চীন সফর করেছেন এবং শি-র সঙ্গে ৪০ বারের বেশি সাক্ষাৎ করেছেন। ক্রেমলিন শুক্রবার জানিয়েছে, পুতিনের এই বছরের প্রথম বিদেশ সফরের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এই সফরটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং চলমান উত্তেজনার মধ্যে ওয়াশিংটন ও মস্কো উভয়ের সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করছে বেইজিং।

সাউথ চায়না মনিং পোস্টের সঙ্গে আলোচনায় সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ঝাও লং পুতিনের সফরকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০২৬ সাল চীন-রাশিয়া কৌশলগত অংশীদারিত্বের ৩০তম বার্ষিকী। এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তির ২৫তম বার্ষিকী। তিনি বলেন, আশা করা হচ্ছে, পুতিনের এই সফরে চুক্তিটির নবায়ন নিয়ে আলোচনা হবে এবং এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে, বাহ্যিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের মোকাবিলায় উচ্চতর কৌশলগত পর্যায়ে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় এবং বাস্তবসম্মত সহযোগিতাকে আরও গভীর করা যায়, তা খতিয়ে দেখা হবে। ঝাও অবশ্য ট্রাম্পের সফরের সঙ্গে এই সফরকে মেলাতে চান না।

ঝাও বলেন, কয়েক দিনের ব্যবধানে উভয় নেতাকে আতিথেয়তা দেয়া বেইজিংকে কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে, একই সাথে প্রতিদ্বন্দ্বী বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও বজায় রেখেছে।

তিনি বলেন, “এটা স্পষ্ট যে চীনের জন্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করা এবং রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা গভীর করা পরস্পরবিরোধী কোনো বিষয় নয়। উভয়ই প্রধান শক্তিগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অংশ।”

এই দুটি সফর বেশ ভিন্ন ধরনের হবে বলেও আশা করা হচ্ছে। যেখানে ট্রাম্পের সফরটি ছিল আনুষ্ঠানিক জাঁকজমকে ভরপুর, সেখানে পুতিনের সফরের মূল লক্ষ্য হবে ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাবলিতে দুই দেশের অবস্থানকে এক সারিতে রাখা। তবে, তিনটি দেশেরই অন্তত একটি অভিন্ন স্বার্থের ক্ষেত্র রয়েছে। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প নিশ্চিত করেন যে, রাশিয়া আলোচ্যসূচির একটি অংশ ছিল এবং তিনি একটি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন।

ট্রাম্প বলেন, “আমি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে একটি সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় পারমাণবিক চুক্তির বিষয়টি উত্থাপন করেছি। আমি খুব ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। এটা কেবল শুরু।”
তিনি মস্কোর পারমাণবিক অস্ত্রাগারকে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের জন্য একটি যৌথ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেন।

ট্রাম্প আরও নিশ্চিত করেন যে, বেইজিংয়ের আলোচনায় রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধও একটি অংশ ছিল এবং তিনি এটিকে পারমাণবিক স্থিতিশীলতা ও বৃহত্তর বৈশ্বিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেন।

ইউক্রেন যুদ্ধে চীন ধারাবাহিকভাবে নিজেকে নিরপেক্ষ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে রাশিয়ার ২০২২ সালের আগ্রাসনের নিন্দা করা থেকে বিরত থেকেছে। বেইজিং পশ্চিমা দেশগুলোর এই অভিযোগও অস্বীকার করেছে যে, তারা মস্কোকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। এর পরিবর্তে, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অস্ত্র সরবরাহ সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছে বলে সমালোচনা করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, বিশ্লেষকরা বলেছেন, পুতিনের এই সফর মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যকার কৌশলগত জোটকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

মার্কিন আধিপত্য নিয়ে উভয়ের মধ্যে থাকা একই রকম সতর্কতার কারণে, চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বৃহত্তম ক্রেতা হিসেবে, যা বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কাটাতে সাহায্য করছে।
সাউথ চায়না মনিং পোস্টকে ঝাও আরো বলেন, “ট্রাম্পের সফরের মাধ্যমে চীন-মার্কিন সম্পর্ক এখন কেবল স্থিতিশীলতার একটি নতুন কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।”
জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং ওয়াশিংটনের উইলসন সেন্টারের গ্লোবাল ফেলো মার্ক কাটজ, বেইজিংয়ের কাছে রাশিয়ার গুরুত্বকে অতিরঞ্জিত করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।

তবে, কাটজ উল্লেখ করেন, চীনা কর্মকর্তারা এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাশিয়ার পরাজয় চীনের স্বার্থের অনুকূল নয়। ট্রাম্প বলেছেন, চীন হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে চাওয়ায় শি ইরানের বিষয়ে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছেন। ঝাওয়ের মতে, উভয় পক্ষ জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবহন নিরাপত্তা এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতার মতো ক্ষেত্রে একাধিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে এবং তাদের অভিন্ন আঞ্চলিক পরিবেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যৌথ ভাবে কাজ করবে। অন্যান্য সম্ভাব্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে স্থগিত হয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা এবং হরমুজ প্রণালীর কার্যকর বন্ধ হয়ে যাওয়া, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে বিপর্যস্ত করেছে এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের মজুদের অধিকারী রাশিয়া এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট, সেইসাথে তেলের দামের উল্লম্ফন, অন্তত স্বল্প মেয়াদে মস্কোর অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে বলে মনে হচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীন-রাশিয়ার বাণিজ্য ফুলেফেঁপে উঠেছে। বেইজিং রাশিয়া থেকে তেল, কয়লা ও গ্যাস কেনা বাড়িয়েছে এবং তার উত্তরের প্রতিবেশী দেশে গাড়ি ও ইলেকট্রনিক্সের মতো প্রধান পণ্য রপ্তানি করছে।

চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২২৮.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং রাশিয়া ২১.৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৫৫ শতাংশ বেশি।
মস্কো ‘পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া ২’ গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের একটি চুক্তির জন্যও চাপ দিচ্ছে, যা রাশিয়ার ইয়ামাল উপদ্বীপ থেকে মঙ্গোলিয়ার মধ্য দিয়ে উত্তর চীনে বছরে ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার পর্যন্ত গ্যাস পরিবহন করবে।

গত সেপ্টেম্বরে পুতিনের বেইজিং সফরের সময় গ্যাজপ্রমের সিইও অ্যালেক্সেই মিলার বলেছিলেন যে, পাইপলাইনটি নিয়ে চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। পুতিনের সফর শেষ হওয়ার পরপর, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ২৩ মে চীন যাবেন। ট্রাম্প- শি শীর্ষ সম্মেলনের পর চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিষদ প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি একে অপরের শুল্ক হ্রাসের সমপরিমাণ শুল্ক ছাড় দেওয়ার নীতিগত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

চীনা বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্বের এই দুটি বৃহত্তম অর্থনীতি কৃষি বাণিজ্য এবং বিমান খাতেও অগ্রগতি করেছে। উভয় পক্ষ চীনের সামুদ্রিক খাবার, দুগ্ধজাত পণ্য এবং আমেরিকার গরুর মাংস ও মুরগির মাংসের মতো নির্দিষ্ট কিছু কৃষি পণ্যের ওপর শুল্ক-বহির্ভূত বাধা কমাতে এবং একটি নির্দিষ্ট পরিসরের পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক কৃষি বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে সম্মত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, বেইজিংয়ে রাষ্ট্রীয় সফরের পর চীন বোয়িংয়ের কাছ থেকে কমপক্ষে ২০০টি বাণিজ্যিক বিমান এবং কিছু শর্ত পূরণ হলে ৭৫০টি পর্যন্ত বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় এক দশক ধরে চলা অর্ডারের খরা শেষ করবে। ওই সফরে ট্রাম্প আরও বলেন, জেনারেল ইলেকট্রিকের কাছ থেকে ৪৫০টি পর্যন্ত বিমানের ইঞ্জিন কেনার বিষয়েও একটি চুক্তি হয়েছে।

প্রায় নয় বছরের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চীন সফরটি অনুষ্ঠিত হলো গত বছরের নজিরবিহীন শুল্ক যুদ্ধের পর। সেই যুদ্ধে এক পর্যায়ে উভয় দেশ একে অপরের পণ্যের ওপর তিন অঙ্কের শুল্ক আরোপ করেছিল। তীব্র প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর উপাদানের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণও আরোপ করা হয়েছিল।

ট্রাম্পের এই সফরে দুই দেশ একটি “গঠনমূলক ও কৌশলগতভাবে স্থিতিশীল” দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপনে সম্মত হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার তথ্যমতে, মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, এটি আগামী বছরগুলোতে কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেবে। ট্রাম্প ও বলেছেন দুই দেশ “কিছু চমৎকার বাণিজ্য চুক্তি করেছে, যা উভয় দেশের জন্যই দারুণ।”

সূত্র: মানবজমিন

এফএইচ/বিডি


CBNA24  রকমারি সংবাদের সমাহার দেখতে হলে
আমাদের ফেসবুক পেজে ভিজিট করতে ক্লিক করুন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করতে পোস্ট করুন।

সংবাদটি শেয়ার করুন