ফিচার্ড মত-মতান্তর

মন্ট্রিয়লের মঞ্চে অম্লান দত্ত: ‘কালমৃগয়া’ ও এক সৃজনশীল স্বপ্নদ্রষ্টার গল্প ।।।  পীযূষ কান্তি সাহা

মন্ট্রিয়লের মঞ্চে অম্লান দত্ত: ‘কালমৃগয়া’ ও এক সৃজনশীল স্বপ্নদ্রষ্টার গল্প ।।।  পীযূষ কান্তি সাহা

​প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে নিজের শিকড় আর সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে রাখার কাজটা সহজ নয়। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও শিল্পের মশালটি জ্বালিয়ে রাখেন পরম মমতায়। মন্ট্রিয়লের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তেমনই এক উজ্জ্বল অথচ নিভৃতচারী নাম অম্লান দত্ত। পেশায় যাই হোন না কেন, নেশায় তিনি একজন আপাদমস্তক শিল্পী এবং সুযোগ্য পরিচালক। সম্প্রতি তাঁর নিপুণ নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গীতিনাট্য ‘কালমৃগয়া’, যা মন্ট্রিয়লের বাঙালি কমিউনিটিতে এক অনন্য আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

​‘কালমৃগয়া’: আধুনিকতার ছোঁয়ায় ধ্রুপদী রূপায়ণ

রাজা দশরথ ও অন্ধ মুনি-পুত্রের সেই চিরকালীন ট্র্যাজেডি নিয়ে রচিত ‘কালমৃগয়া’। ১৮৮২ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ এটি রচনা করেছিলেন। অম্লান দত্তের নির্দেশনায় এই ধ্রুপদী নাটকটি যখন মঞ্চস্থ হলো, তখন তা কেবল একটি অভিনয় থাকেনি, হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা।

অনুষ্ঠানের পুরো অ্যালবাম দেখতে হলে

নাটকের মূল আবেগ অক্ষুণ্ণ রেখে তিনি একে কিছুটা সংক্ষেপিত ও আধুনিক রূপ দিয়েছেন, যা দর্শককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। অভিনয়, নৃত্য, আলোকসম্পাত আর শব্দ প্রক্ষেপণের অপূর্ব সমন্বয় উদীচীর এই অনুষ্ঠানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

​শিল্পীদের চোখে পরিচালক অম্লান দত্ত

একটি সফল প্রযোজনার পেছনে থাকে পরিচালকের অসীম ধৈর্য আর সৃজনশীলতা। ‘কালমৃগয়া’র অন্যতম প্রাণভ্রমরা শর্মিলা ধর অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, অম্লান দত্তর নিবিড় দিকনির্দেশনা এবং শিল্পবোধ ছাড়া এই উপস্থাপনা সম্ভব হতো না। তিনি কেবল নাটক পরিচালনা করেননি, বরং সমস্ত শিল্পীকে এক সুতোয় গেঁথে একটি যৌথ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। শর্মিলা ধরের ভাষায়, “তাঁর সৃজনশীল ভাবনা, ধৈর্য আর অক্লান্ত পরিশ্রমই এই নৃত্যনাট্যকে প্রাণবন্ত করেছে।”

​নিভৃতচারী এক সাংস্কৃতিক কর্মী

সাংবাদিক গোপেন দেব দাদার মতে, অম্লান দত্ত বর্তমান সমাজের সেই বিরল মানুষদের একজন যিনি নিজের প্রচারে বিমুখ, কিন্তু কাজে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। মন্ট্রিয়লের মঞ্চে বাংলাদেশের কৃষ্টি ও উন্নতমানের গীতিনাট্য উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ‘রবি-অনুরাগী’র ব্যানারে তাঁর প্রতিটি প্রযোজনা যেন এক একটি সযত্ন লালিত শিল্পকর্ম।

​পরিচালকের বিনয়

এত সাফল্যের মাঝেও অম্লান দত্ত নিজে অত্যন্ত বিনয়ী। শর্মিলা ধরের কৃতজ্ঞতার উত্তরে তিনি জানিয়েছেন যে, এই চলার পথের প্রতিটি মুহূর্ত সবার সম্মিলিত অবদানে সমৃদ্ধ। এই দলগত ঐক্যই তাঁকে বার বার সাহসী সব সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করে।

মন্ট্রিয়লের কনকনে ঠান্ডার দেশে অম্লান দত্তর মতো মানুষেরা নাটকের আগুনের উত্তাপ দিয়ে আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ‘কালমৃগয়া’র সেই বিষাদসিন্ধু থেকে শুরু করে আনন্দের জোয়ার—সবই তাঁর হাতের জাদুতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। আমরা আশা করি, তাঁর হাত ধরে ভবিষ্যতে আরও অনেক কালজয়ী সৃষ্টি মন্ট্রিয়লের মঞ্চে প্রাণ ফিরে পাবে। তাঁর এই সৃজনশীল যাত্রা অব্যাহত থাকুক।

 

এসএস/সিএ
সংবাদটি শেয়ার করুন