বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ইন্তেকাল করেছেন। গতকাল বিকাল সাড়ে তিনটায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। দীর্ঘ আট মাস ধরে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। গতকাল সন্ধ্যায় ধানমণ্ডির তাকওয়া মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
আজ সকালে হেলিকপ্টারে করে মরদেহ নেয়া হবে ভোলায়। বাদ জোহর সেখানকার জিলা স্কুল মাঠে জানাজা শেষে গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে। স্কয়ার হাসপাতালের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, তোফায়েল আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৪শে সেপ্টেম্বর বিকালে নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদ্রোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রায়হান রাব্বানীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও একমাত্র সন্তান ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীকে রেখে গেছেন।
ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির হাতেখড়ি হওয়া তোফায়েল আহমেদ দেশের রাজনীতিতে এক প্রথিতযশা চরিত্র। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীনতা আন্দোলনসহ পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। দলীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ফোরাম প্রেসিডিয়ামের সদস্য ছিলেন দীর্ঘ সময়। তবে শেষ জীবনে দলীয় রাজনীতিতে তিনি অনেকটা অবহেলিত ছিলেন। প্রেসিডিয়াম থেকে বাদ দিয়ে করা হয়েছিল উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য। স্থান পাননি আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায়ও। দলীয় অবহেলা ও অবমূল্যায়ন থেকে তোফায়েল আহমেদ অনেকটা নিভৃতে চলে যান। শারীরিক অসুস্থতা তাকে অনেকটা ঘরবন্দি করে ফেলে। শেষ সময়ে ছিলেন কোমায়। কলেজ শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় রাজনীতিতে আসা তোফায়েল আহমেদ ৯বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি প্রথম জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।
১৯৪৩ সালের ২২শে অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মৌলভী আজহার আলী ও মা ফাতেমা বেগম। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন।
রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদের হাতেখড়ি ছাত্রলীগের মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৮-৬৯-এ গণজাগরণ ও ছাত্র আন্দোলনে তিনি ডাকসু’র ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। উনসত্তরেই তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের কারণে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামিকে মুক্তি দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সেই বছরেরই ২৩শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান) এক সভার আয়োজন করে। ওই সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন তোফায়েল আহমেদ।
প্রথমবারের মতো ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন। স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৭২ সালের ১৪ই জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন।
১৯৭৩ সালে তিনি ভোলা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পঁচাত্তরের ২৫শে জানুয়ারি দেশে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার ঘোষণার পর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন তোফায়েল আহমেদ। সে বছরই বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল গঠিত হলে এর যুব সংগঠন জাতীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নিজের জেলা ভোলা থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের ২৩শে জুন তিনি শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ২০১৩-১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সাল থেকে টানা ৩৩ মাস-সহ বহুবার কারাভোগ করেন এই নেতা।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই তোফায়েল আহমেদকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং রেডিও অফিসে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। একই বছরের ৬ই সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, রাখা হয় ময়মনসিংহ কারাগারের কনডেম সেলে। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে তাকে স্থানান্তর করা হয়। তখন দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারান্তরালে ছিলেন। কুষ্টিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় ১৯৭৮ সালে তোফায়েল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন তিনি। রাজনীতির নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে তোফায়েল ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন, সে পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ ১৮ বছর। তোফায়েল আহমেদ ২০১০ সালে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হন। আমৃত্যু তিনি এই পদে ছিলেন।
সূত্র: মানবজমিন
এফএইচ/বিডি
CBNA24 রকমারি সংবাদের সমাহার দেখতে হলে
আমাদের ফেসবুক পেজে ভিজিট করতে ক্লিক করুন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করতে পোস্ট করুন।



