সন্তান বড্ড জেদি হয়ে পড়ছে, কথা শুনছে না? মাত্র ২১ মিনিটেই বদলে যেতে পারে খুদের আচরণ
বাবা-মায়েরা হয়তো বলবেন, তাঁদের বেশির ভাগ সময়টাই কাটে সন্তানের পিছনে। তার লেখাপড়া, খাওয়াদাওয়া, টিউশন, আঁকার ক্লাস, গানের ক্লাস— সবটাই সামলান তাঁরা। তবে সন্তানের সঙ্গে কাটানো এই সময়টা কিন্তু ‘কোয়ালিটি টাইম’ নয়। সারা দিন সন্তানের সঙ্গে থাকলেও সময়ের গুণগত মান আলাদা কেন?
অফিসের কাজ, সঙ্গে সাংসারিক দায়দায়িত্ব। দুইয়ের চাপ সামলে অনেকেই সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর অবকাশ পান না। সন্তানের কেন মনখারাপ বা তার দৈনন্দিন জীবনে কী হচ্ছে, তা জানার মধ্যে ফাঁক থেকে যায় তার সঙ্গে গুণগত সময় (কোয়ালিটি টাইম) কাটানোর অভাবে। নানা সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সন্তানের মানসিক উন্নতি, অভিভাবকের সঙ্গে সম্পর্কের দৃঢ়তা নির্ভর করে সুন্দর সময় কাটানোর উপরে। তাই, রোজ সন্তানের সঙ্গে একান্ত সময় কাটানো খুবই জরুরি। অনেক বাবা-মায়েরই অভিযোগ, তাঁদের সন্তান একগুঁয়ে আর জেদি হয়ে পড়ছে, এর নেপথ্যে কিন্তু কারণ হতে পারে বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের দুরত্ব তৈরি হওয়া।
বাবা-মায়েরা হয়তো বলবেন, তাঁদের বেশির ভাগ সময়টাই কাটে সন্তানের পিছনে। তার লেখাপড়া, খাওয়াদাওয়া, টিউশন, আঁকার ক্লাস, গানের ক্লাস— সবটাই সামলান তাঁরা। তবে সন্তানের সঙ্গে কাটানো এই সময়টা কিন্তু ‘কোয়ালিটি টাইম’ নয়। সারা দিন সন্তানের সঙ্গে থাকলেও সময়ের গুণগত মান আলাদা কেন? কোয়ালিটি টাইম হল সেই সময়, যখন মায়ের সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকে সন্তানের উপরে। ওই সময়ে সন্তানের সঙ্গে কথোপকথন, তার প্রেক্ষিত থেকে চিন্তা করা, নতুন বিষয় জানানো, তাকে ভাবতে সাহায্য করার মাধ্যমে দৃঢ় হয় মায়ের সঙ্গে সন্তানের বাঁধন। এই সময়টা হবে নির্বিঘ্ন, অর্থাৎ ওই সময়ে অন্য কাজ করা, মোবাইলে কথা বলা বা কিছু দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। পেরেন্টিং কনস্যালটান্টদের মতে, এ ক্ষেত্রে ৭-৭-৭ নিয়মবিধি মনে চললেই সন্তানদের মধ্যে আচরণগত ফারাক চোখে পড়বে।
সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে ৭-৭-৭ নিয়মবিধি কী?
৭-৭-৭ নিয়মটি হল একটি সহজ পদ্ধতি, যার লক্ষ্য হল নিয়মিত ও সচেতন ভাবে একে অপরের সান্নিধ্যে সময় কাটানোর মাধ্যমে বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁদের কিশোর বয়সি সন্তানদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা।
এই পদ্ধতির মূল বিষয়গুলি হল:
১) কিশোর বয়স্ক সন্তানের সঙ্গে সাত মিনিট কথা বলা।
২) সাত মিনিট ধরে খেলাধুলা, কোনও কাজ করা বা
যৌথভাবে কোনও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া।
৩) কোনও বাধা না দিয়ে, বিচার-বিবেচনা না করে কিংবা তাৎক্ষণিক ভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা না করে সাত মিনিট ধরে সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা।
শাসনের উপর জোর না দিয়ে, এই নিয়মটি বাবা-মাকে এমন একটি পরিবেশ বা পরিসর তৈরি করতে উৎসাহিত করে, যেখানে কিশোর-কিশোরীরা আবেগগত ভাবে নিরাপদ বোধ করে।
এই নিয়মটি কী ভাবে কাজ করে?
মনস্তাত্ত্বিক ভাবে স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা করলেও কিশোর-কিশোরীদের তাদের বাবা-মায়ের সান্নিধ্যের প্রয়োজন হয়। মনোযোগের এই সংক্ষিপ্ত মুহূর্তগুলি মানসিক চাপের সময়— যেমন সকালে ঘুম থেকে ওঠা, স্কুলশেষে ক্লান্তি দূর করা এবং রাতে ঘুমোনোর আগে তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। নিয়মিত ভাবে কাটানো এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলি এক ধরনের ‘সম্পর্কের পুঁজি’ গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে সন্তান সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্কের ভিত আরও মজবুত হয়।
সকালবেলা (৭ মিনিট): ঘরের এক প্রান্ত থেকে চিৎকার করে কোনও কথা মনে করিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে, সকালের জলখাবারের সময় সন্তানের পাশে বসুন। তাদের কাছে জানতে চান যে, সেই দিনটি তাঁরা কী ভাবে কাটানোর পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া হালকা মেজাজের গল্প করুন। উষ্ণ আলিঙ্গন কিংবা সন্তানকে কোনও বিষয় উৎসাহ দিয়ে ইতিবাচক আবহে দিনটা শুরু করুন।
স্কুল-পরবর্তী সময় (৭ মিনিট): এটি সন্তানের কাছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বা কঠিন সময়। স্কুল থেকে ফেরার সময় তারা ক্লান্ত, খিটখিটে মেজাজে বা ক্ষুধার কারণে বিরক্ত থাকতে পারে। এ সময় বাড়ির কাজ বা পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবেন না। তার চেয়ে বরং তাদের পছন্দের কোনও খাবার দিন এবং তাদের দিনটা কেমন কাটল, সেই বিষয় খোঁজ-খবর নিন।
ঘুমোনোর আগে (৭ মিনিট): এই সময়েই কিশোর-কিশোরীরা সাধারণত নিজেদের মনের কথা সবচেয়ে বেশি খুলে বলে। তাদের বিছানার পাশে বসুন, কোনও রকম বাঁকা মন্তব্য ছাড়াই তাদের কথা শুনুন অথবা কেবল নীরবে কিছুটা সময় কাটান। রাতের বেলার কথোপকথনে প্রায়শই বন্ধুত্ব, মানসিক চাপ বা স্বপ্ন নিয়ে তাদের গভীর অনুভূতির কথা বেরিয়ে আসে— যা হয়তো দিনের ব্যস্ততায় তারা প্রকাশ করতে পারে না।
সূত্রঃ আনন্দবাজার



