অধ্যাপক ইউনূসের সাথে বৈঠকে মোদীর বক্তব্য কী ছিল
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
শুক্রবার দুপুরে ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুই দেশের শীর্ষ দুই নেতার এই বৈঠকে নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশের সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংবাদটি বিবিসি বাংলা থেকে নেওয়া।
বৈঠকে নরেন্দ্র মোদী ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক খারাপ হয় বা পরিবেশ নষ্ট হয়, এমন বক্তব্য পরিহার করার আহ্বানও জানিয়েছেন।
তিনি নিজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স(সাবেক টুইটার) এ অধ্যাপক ইউনূসের সাথে তার বৈঠক সম্পর্কে লিখেছেন।
নরেন্দ্র মোদী এক্স এ লিখেছেন, “বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। ভারত বাংলাদেশের সাথে একটি গঠনমূলক ও জনগণ কেন্দ্রিক সম্পর্কের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রী এ-ও লিখেছেন, “আমি বাংলাদেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও গণতন্ত্রের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছি। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করা রোধের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছি এবং হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছি।”
গত বছরের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনার শাসনের পতন বা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আট মাসের মাথায় সেই সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাথে এই প্রথম বৈঠক করলেন মি. মোদী।
এই বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সাবেক কূটনীতিকেরা। তারা বলছেন, বৈঠকে দুই নেতা নিজ নিজ দেশের অবস্থানই তুলে ধরেছেন। তবে শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা শুরুর বিষয়কে দুই দেশই গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
ছবির উৎস,CHIEF ADVISER’S PRESS WING
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাথে এই বৈঠকের ব্যাপারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজে যেমন সামাজিক মাধ্যম এক্স এ লিখেছেন। একই সাথে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পিটিআই জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মি.মোদী আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশ সরকার সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং তাদের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনাগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করবে।
ব্যাংককে দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের পর সেখানে প্রেসব্রিফিং করেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। তিনি জানান, নরেন্দ্র মোদি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ পুনরায় ব্যক্ত করেন এবং বাংলাদেশ সরকারকে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখার আহ্বান জানান।
বিক্রম মিশ্রি বলেন, গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগিতিশীল এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক বাংলাদেশ দেখতে চায় ভারত। বৈঠকে সে কথা তুলে ধরেছেন নরেন্দ্র মোদী।
ছবির উৎস,CHIEF ADVISER’S PRESS WING । ছবির ক্যাপশান,ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠকে বসেন দুই প্রতিবেশি দেশের সরকারপ্রধান
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের প্রশ্নে নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি জনগণের কল্যাণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং বাংলাদেশ-ভারত দীর্ঘদিনের সহযোগিতার মাধ্যমে পারস্পরিক সুসম্পর্ক নিশ্চিত করেছে।
তিনি আরো বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবতানির্ভর, ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে দুই নেতার বৈঠকে। সীমান্তে সাধারণ বাংলাদেশিদের হত্যা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
আর ভারত এবার সীমান্তে অবৈধ যাতায়াত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
দেশটির পররাষ্ট্র সচিব জানান, সীমান্তের ক্ষেত্রে সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে ভারতের পক্ষ থেকে। একই সাথে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপরও নরেন্দ্র মোদী গুরুত্বারোপ করেছেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রসঙ্গ তুলেছেন।
এ বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কাছে। তিনি এই প্রশ্নে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেছেন, এটি আলোচনার বিষয়বস্তু নয় এবং এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগেই বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
বিমসটেকের পরবর্তী সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের নেতৃত্বে জোটের আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গত বছরের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনার শাসনের পতন হয়। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সেদিনই শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। এর তিন দিন পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
তখন থেকেই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অস্বস্তি চলে আসছে। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ভারতে উপস্থিতিকেই সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
এমন প্রেক্ষাপটে এর আগে দুই দফায় নরেন্দ্র মোদীর সাথে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসের দেখা হওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও তা হয়নি। এছাড়াও বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছিল।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিমসটেকের সম্মেলনের ফাঁকে তাদের বৈঠক হবে কি না, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। শেষপর্যন্ত বৈঠকটি হলো।