La Belle Province

কানাডা, ৩০ অক্টোবর ২০২০, শুক্রবার

ভারতের মুসলিম তরুণরা কেন মজেছেন তুরস্কের টেলি-সিরিয়াল এরতুগ্রুলে

সিবিএনএ অনলাইন ডেস্ক | ০৭ অক্টোবর ২০২০, বুধবার, ৫:৪৯

ভারতের মুসলিম তরুণরা কেন মজেছেন তুরস্কের টেলি-সিরিয়াল এরতুগ্রুলে!

কাশ্মীরের সোপোর, পুলওয়ামা বা বারামুলা-তে এর আগে কস্মিনকালেও ‘এরতুগ্রুল’ নামে কেউ ছিল না। অথচ গত দু-তিন বছরে ভ্যালিতে যে শিশুরা জন্মেছে, সেই নবজাতকদের অনেকেরই নাম রাখা হয়েছে এরতুগ্রুল।

শীতের মরশুমে তো কাশ্মীরে দেখা যাচ্ছে এরতুগ্রুল স্টাইলে’র টুপিও। গাঢ় ওয়াইন-রঙা এই ধরনের মাথা ও কান-ঢাকা ফার বা পশমী টুপি তুরস্কে খুব জনপ্রিয় হলেও কাশ্মীরে তা কিন্তু কখনওই পরার কোন চল ছিল না।

আর এই সব পরিবর্তনের পেছনেই আছে একটি অসম্ভব জনপ্রিয় তুর্কী টেলি-ড্রামা, যার নাম ‘ডিরিলিস: এরতুগ্রুল’।

তুর্কি নাটক এরতুগ্রুল নিয়ে পাকিস্তানে উৎসাহ আর বিতর্ক

ডিরিলিস শব্দের অর্থ রেজারেকশন বা পুনর্জন্ম, আর তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার আগের ইতিহাস নিয়ে তৈরি এই টানটান নাটকে কাশ্মীর এখন একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ – বিশেষ করে সেখানকার তরুণ প্রজন্ম।

ত্রয়োদশ শতকে ওঘুজ তুর্কীদের নেতা এবং সে দেশের কিংবদন্তী নায়ক এরতুগ্রুলের জীবন নিয়েই বাঁধা হয়েছে এর গল্প। এই এরতুগ্রুল ছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওসমানের পিতা।

মুসলিম বিশ্বের নানা দেশে দারুণ জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর এই এপিক তুর্কী ড্রামাটি এখন কাশ্মীর-সহ ভারতের মুসলমানদের মধ্যেও ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

পাঁচটি সিজনে পরিব্যাপ্ত ৪৪৮টি এপিসোড বা পর্বের এই বিশাল উপাখ্যান অনেকে মাত্র এক-দেড় মাসের মধ্যেও পুরোটা দেখে ফেলেছেন।

 

ভারতে এরতুগ্রুলের প্রভাব নিয়ে গবেষণা

এরতুগ্রুল কীভাবে ভারতে এতটা জনপ্রিয়তা পেল, তা নিয়ে বিশদে সমীক্ষা করেছেন হায়দ্রাবাদের মৌলানা আজাদ জাতীয় উর্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন অধ্যাপক – সমাজতত্ত্ব বিভাগের শাহীদ মিও এবং ইতিহাস বিভাগের ইকরামুল হক।

অধ্যাপক শাহীদ মিও জানিয়েছেন, “কাশ্মীরে ইন্টারনেটের কী হাল সবাই জানেন। আমি যখন কাশ্মীরি ছাত্রদের আজকাল অনলাইনে ক্লাস নিই, ব্যান্ডউইথের সমস্যায় তারা আমাকে ঠিকমতো শুনতেই পান না।”

“অথচ সেই একই ছাত্ররা আমাকে বলেন, এরতুগ্রুলের একটা এপিসোডও ছাড়া যাবে না। দুর্বল নেট নিয়েই, বাফারিং সহ্য করেই তারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন মোবাইল ফোনে এই তুর্কী নাটক দেখার জন্য!”

বস্তুত ২০১৭ সালের অক্টোবরে নেটফ্লিক্স তুরস্কের এই ঐতিহাসিক ড্রামাটি অনলাইনে ‘স্ট্রিম’ করতে শুরু করার পরই ভারতে তা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তুমুল সাড়া ফেলে।

অধ্যাপক ইকরামুল হকের কথায়, “আজকের ভারতবর্ষে মুসলিমরা যে আত্মপরিচয়ের সঙ্কট বা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগছেন, সেই শূন্যতার জায়গা থেকেই হয়তো তারা ভিনদেশি এই ঐতিহাসিক উপাখ্যানের সঙ্গে নিজেদের অনেকটা ‘রিলেট’ করতে পারছেন – আর সে কারণেই এরতুগ্রুল এদেশেও এতটা জনপ্রিয় হয়েছে।”

কিন্তু ভারত ও তুরস্কের কূটনৈতিক সম্পর্ক যখন অত্যন্ত খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তখন তুরস্কেরই একটি টেলি-ড্রামা ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে এতটা সাড়া ফেলার আর কি কোন রহস্য রয়েছে?

গবেষণা রিপোর্টটির অন্যতম লেখক ড. হক বলেন, “একটা ফ্যাক্টর তো এটার টানটান গল্প, নাটকীয়তায় ভরা প্লট, দারুণ অভিনয় আর দুর্ধর্ষ স্পেশাল এফেক্টস। এরতুগ্রুল একবার দেখতে বসলে সেটা ছেড়ে ওঠাই মুশকিল।”

“ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণে ভারতীয় মুসলিমরাও হয়তো এই তুর্কী গল্পটা ভালবেসে ফেলছেন, একাত্ম বোধ করছেন।”

“কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুর্কী প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রতি এর মাধ্যমে তাদের কোনও মুগ্ধতা তৈরি হচ্ছে। আসলে এটা শেষ পর্যন্ত ড্রামা-ই, কোনও বিশেষ ব্যক্তি বা কূটনীতির সঙ্গে এর তেমন সম্পর্ক আছে বলে মনে করি না।”

 

ইসলামী দুনিয়া এরতুগ্রুলকে কী চোখে দেখছে?

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই মনে করে, এই টেলি-নাটকের মধ্যে দিয়ে তুরস্ক কিন্তু কূটনীতিতে তাদের ‘সফট পাওয়ার’ প্রয়োগ করতে চাইছে।

এরতুগ্রুল ঠিক কী ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা দিচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্কের জেরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিশরে এই সিরিজগুলো এরই মধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আজারবাইজান-আর্মেনিয়ার সংঘাত কি বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে?

এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মিশরের সর্বোচ্চ ফতোয়া কাউন্সিল এক বিবৃতিতে এমনও বলেছে যে এই টেলি-ড্রামার মাধ্যমে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নিজস্ব ‘প্রভাব বলয়’ তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

তবে পাশাপাশি তুরস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ পাকিস্তানে কিন্তু এরতুগ্রুল অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রায়ত্ত পিটিভি এই সিরিয়ালটির প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে মিলে এরতুগ্রুলের জন্য আলাদা একটি ইউটিউব চ্যানেলও চালু করেছে, যেখানে উর্দু ডাবিংয়ে এই নাটকটির সব এপিসোড দেখা যায়।

ওই ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৮৮ লক্ষেরও বেশি। গত জুন মাসে তুর্কী সংবাদ সংস্থা টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছিল, পাকিস্তানের লাহোর শহরে এরতুগ্রুল গাজীর দুটি মূর্তিও বসানো হয়েছে।

তবে এরতুগ্রুল সিরিজ নিয়ে খোদ তুরস্কের ভেতরেও কিন্তু বিতর্ক থেমে নেই।

সে দেশে ‘ডিরিলিস: এরতুগ্রুল’-এর সমালোচকরা মনে করেন যে এই সিরিজের মাধ্যমে সুকৌশলে যে মুসলিম জাতীয়তাবাদের বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে তার ক্ষমতা সংহত করতে সাহায্য করছে।

এমন কি, এই সিরিজের লেখক ও প্রযোজক মেহমেত বোজডাগ-ও প্রেসিডেন্টের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

মি. এরদোয়ান নিজেও বহুবার প্রকাশ্যে এই সিরিজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

 

ভারতে যেভাবে সিরিজটি জনপ্রিয়তা পেল

গত মে মাসের মাঝামাঝি এরতুগ্রুলের প্রযোজক সংস্থা টিআরটি-র একজন সিনিয়র কর্মকর্তা, রিয়াদ মিন্টি একটি খুব ইন্টারেস্টিং টুইট করেন।

গুগল ট্রেন্ডস থেকে নেওয়া একটি গ্রাফ শেয়ার করে তিনি লেখেন, “ভারতীয়রা এখন ইউটিউবে শাহরুখ খানের চেয়েও অনেক বেশি সার্চ করছে এরতুগ্রুলের ভিডিও!”

ড. শাহীদ মিও কিন্তু এই পরিসংখ্যানে এতটুকুও বিস্মিত নন।

তিনি জানিয়েছেন, “এই সিরিজের বহু দর্শকের সঙ্গে কথা বলে আমরা যে ধারণাটা পেয়েছি, তাহলো এই মুহুর্তে মুসলিমরা ভারতে যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও অসহায়তায় ভুগছেন, সেই সঙ্কট থেকে তাদের একটা উত্তরণের স্বপ্ন দেখাচ্ছে এই সিরিজ।”

“তা ছাড়া ভারতীয় সিনেমায় বর্বর শাসক বা নৃশংস খুনী হিসেবে মুসলিম চরিত্রগুলোকে যেভাবে স্টিরিওটাইপিং করা হয়, তা সে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিই হোক বা মাফিয়া করিম লালা – সেখান থেকেও এটা একটা ‘রিফ্রেশিং’ পরিবর্তন।”

“মুসলিম চরিত্রগুলোকে যে পক্ষপাতশূন্য দৃষ্টিতে এভাবেও তুলে ধরা যায়, অবচেতনে সেটা আবিষ্কার করেও তারা বোধহয় এরতুগ্রুলে আরও বেশি হুকড হয়ে পড়েছেন,” বলছিলেন শাহীদ মিও।

তার সহ-গবেষক অধ্যাপক ইকরামুল হক যোগ করেন, “ভারতের গ্রামেগঞ্জে বেশির ভাগ মুসলিম কিন্তু জানেন, তারা মুসলিম সমাজের উচ্চবর্ণের অংশ নন। তারা সৈয়দ বা শেখ বংশোদ্ভূত নন – বরং তারা নিজেদের ‘পাসমান্দাজ’ বলেই মনে করেন, উর্দুতে যার অর্থ হল পশ্চাৎপদ বা পিছিয়ে থাকা শ্রেণী।”

“সেই সঙ্গে তারা এটাও জানেন তাদের পূর্বপুরুষরা আফগানিস্তান, আরব বা তুরস্ক থেকে আসেননি। তারা ভারতেরই ভূমিপুত্র, যারা কয়েকশো বছর আগে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন।”

“কিন্তু আজকের এই সময়ে ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়টা সোজাসুজিভাবে ঘোষণা করার ঝোঁক বাড়ছে। রানা আইয়ুব, রানা সাফভী-র মতো অ্যাক্টিভিস্ট, যারা কোনও মতেই ফ্যানাটিক বা উগ্রবাদী নন – তারাও কিন্তু ঠিক একই জিনিস করছেন।”

“একটা তুর্কী সিরিজ গোগ্রাসে গেলার মধ্যেও আমি সেই প্রবণতারই প্রতিফলন দেখছি”, বলছিলেন ইকরামুল হক।

 

ভারতের হিন্দুরা কীভাবে দেখছে এরতুগ্রুলকে?

হায়দ্রাবাদের দু’জন গবেষকই জানাচ্ছেন যে ভারতে হিন্দুদের মধ্যেও কিন্তু এই তুর্কী সিরিজটি কম জনপ্রিয় নয়।

শাহীদ মিও আর ইকরামুল হক দু’জনের অভিজ্ঞতাই বলছে, তাদের হিন্দু বন্ধুবান্ধব-সহকর্মী বা পরিচিতজনদের মধ্যেও অনেকেই ‘ডিরিলিস: এরতুগ্রুল’ এর মধ্যেই আদ্যোপান্ত দেখে ফেলেছেন।

তারা প্রায় প্রত্যেকেই বলেছেন, তুর্কী ইতিহাসের গল্পটা এখানে খুব বড় কথা নয় – এরতুগ্রুলের নাটকীয়তা, প্লট বা মেকিংয়ের জন্যই তারা এই সিরিজ মাঝপথে ছাড়তে পারেননি।

তবে এরতুগ্রুলকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়াতে ভারতীয় ও পাকিস্তানিদের ধর্মীয় লড়াই-ও কিন্তু থেমে নেই।

বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার সাম্প্রতিক উষ্ণ সম্পর্ক যে বার্তা দিচ্ছে

ভারতের প্রথম সারির দৈনিক ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’ কিছুদিন আগেই রিপোর্ট করেছিল, এরতুগ্রুলকে কেন্দ্র করে প্রধানত ভারতের হিন্দুরা কীভাবে পাকিস্তানি মুসলিমদের সঙ্গে ধর্মীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে।

‘অপইন্ডিয়া’ নামে ভারতের একটি হিন্দুত্ববাদী পোর্টাল সম্প্রতি লিখেছে, “পাকিস্তানিদের মতো এরতুগ্রুল দেখতে শুরু করে ভারতীয় মুসলমানেরা আসলে দেশের সঙ্গে বেইমানি করছেন!”

অপইন্ডিয়ার বক্তব্য ছিল, “এর মাধ্যমে ভারতীয় মুসলমানেরা আসলে তাদের হিন্দু ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে চাইছেন এবং তুর্কী বা আরব দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে নিজেদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস ঘোচাতে চেষ্টা করছেন।”

এই ধরনের ঢালাও অভিযোগ সত্ত্বেও ভারতে কিন্তু এরতুগ্রুলের আকর্ষণ ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।

মুসলিমদের মধ্যে তো বটেই, এমন কী অল্প অল্প করে হিন্দুদের মধ্যেও।

আর পাকিস্তানিরা সোশ্যাল মিডিয়াতে যা-ই দাবি করুন না কেন, ভারত সরকারও কিন্তু – তা সে যে কোনও কারণেই না কেন হোক -এই তুর্কী সিরিজটিকে এ দেশে নিষিদ্ধ করেনি।

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

সিএ/এসএস


সর্বশেষ সংবাদ

দেশ-বিদেশের টাটকা খবর আর অন্যান্য সংবাদপত্র পড়তে হলে CBNA24.com

সুন্দর সুন্দর ভিডিও দেখতে হলে প্লিজ আমাদের চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Facebook Comments

চতুর্থ বর্ষপূর্তি

cbna 4rth anniversary book

Voyage

voyege fly on travel

cbna24 youtube

cbna24 youtube subscription sidebar

Restaurant Job

labelle ads

Moushumi Chatterji

moushumi chatterji appoinment
bangla font converter

Sidebar Google Ads

error: Content is protected !!