ভিয়েতনাম
ভ্রমণ

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের  | প্রথম পর্ব

জুন ২০১৯ । গতবছর ভুটান গিয়েছিলাম। শান্তির দেশ। এবার ভিয়েতনাম যাচ্ছি। মনট্রিয়লে বসেই সব ঠিক করেছি। আই টি সি, ঢাকার সোহেলি রহমান তৈরি করে দিয়েছে আমার প্রাইভেট টুঁর প্যাকেজ। ৭ দিন ছয় রাতের প্রোগ্রাম। সাথে কম্বোডিয়া যাবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ওটা করা সম্ভব হয় নি। কানেক্টিং ফ্লাইট টিকেটের  সমস্যা হচ্ছিল। একদিকে ভালই হয়েছে। শরীরে বোধহয় কুলাত না।

১৫ জুনের মধ্যরাতে মালায়েশিয়ান এয়ার লাইনস এ ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া, সেখান থেকে একই এয়ার লাইনস এ হেনয়। ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া প্রায় ৪ ঘণ্টা, সেখান থেকে হেনয় প্রায় ৩ ঘন্টা। মাঝ খানে ২ ঘণ্টার  ট্রানজিট। অনেক আগে ২০০৪ যখন এসেছিলাম তখন এই নতুন বিমান বন্দরে। বিশাল বন্দর। টার্মিনালগুলো ট্রেনে কানেক্ট করে। খুব একটা এনাউঞ্ছমেন্ট বা ঘোষণা নাই। ডিসপ্লে বোর্ড দেখে জেনে নিতে হবে। ট্রানজিট কাউন্টার আছে। সেখান থেকেও জানা যায়। এয়ারপোর্ট পুলিশকে জিজ্ঞেস করাতে বলে দিলো “সি” টার্মিনাল। সামনের ট্রেনে চেপে পরের টার্মিনাল। সেখানে এসে চিন্তা করছিলাম কোন দিক থেকে উঠবো। ঠিক সেই সময় দেখলাম আমার সামনে সেই মেয়ে পুলিশ। দেখিয়ে দিলো কোন দিকে উঠতে হবে। অবাক লাগলো কেমন করে সে আমাকে মনে রাখলো । ট্রেনে চেপে নামলাম পরের টার্মিনালে। খুব সুন্দর বন্দরটা । পশ্চিমা দেশ থেকেও অনেক সুন্দর। বেশ খোলামেলা। ভীষণ ভাবে এশিয়ান গন্ধ মিশানো। হাত বাড়ালেই ফেসিলিটি। মালয়েশিয়া তৈরি করেছিল সিঙ্গাপুর বা দুবাই হাবকে মাথায় রেখে। একটা খাবার দোকান দেখে পছন্দ হোল। হাল্কা নাস্তা খেয়ে নিলাম।  বিমান বন্দর থেকে সোজা সড়ক চলে গেছে শহরে। প্রায় দু ঘন্টার ড্রাইভ। মনোরম রাস্তা।

ঠিক সময়ে মালায়েশিয়ান এয়ারলাইন ছাড়ল। বিমানটি ভালো। ইকোনমি ক্লাসেও আরামের লেগ স্পেচ । আথিতিয়তা  মন্দ নয়। খাবার ভালো। মাঝে মাঝে কিছু ঝাকুনি ছাড়া যাত্রা ভালই ছিল। ঠিক সময়ে হেনয় “নয় বাই” আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে  এসে নামলাম। নতুন বন্দর। বিশাল। খুব সুন্দর। ২০১৪ তে তৈরি করেছে। আগের বার অফিসের কাজে যখন এসেছিলাম তখন এই  বন্দর ছিল না। গিয়েছিলাম বাংলাদেশী ভিসায়। এবার কানাডিয়ান “ই” ভিসায়।  হেনয় থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে বন্দরটি। হেঁটে ইমিগ্রেসানে আসতে বেশ সময় লাগলো। এখানে বেশ ভুল করেছিলাম আমি। আমি মনে করেছিলাম “ই” ভিসা তো আছে। কিছু লাগবে না। ইমিগ্রাসান কাউন্টারে গেলে বুঝিয়ে দিলো কি করতে হবে। তাই সময় কিছু নষ্ট হয়েছে। বুঝতে পারি নি পাসপোর্ট এ স্ট্যাম্প লাগবে। কাজটা সহজ। আবেদন করে ছবি দিয়ে দিলেই কাজ শেষ। আবেদন করার কাগজ ওরা দিয়ে দেবে। ভাগ্য ভালো ট্রাভেল এজেন্ট আগে থেকেই ছবি নিয়ে যেতে বলেছিল। সেটা নিয়ে বেরুতে বেশ খানিকক্ষণ লাগে। বেরিয়ে দেখি লাগেজ কেউ নীচে নামিয়ে রেখেছে সুন্দর করে।ঢাকা বিমান বন্দরে এটা আশা করাই বিরাট ভুল। বের হয়ে এক্সিট পয়েন্ট এ কিছুক্ষন অপেক্ষা করে যখন আমার গাইডকে পেলাম না, তখন কল করলাম। সাথে গ্রামীন ফোন এর রোমিং সেট থাকায় অসুবিধা হয় নি। বলে রাখা ভালো আমার এই ফোন নাম্বারটির বয়স প্রায় প্রায় ৩০ বছরের উপর। ভালো দামে ইন্টারনেট ও ছিল। গাইড বিমান বন্দরের ঠিক বাইরে অপেক্ষা করছিল। বাইরে বেশ গরম। দেখলাম দেরী হওয়াতে বেচারা ঘেমে চুপসে একাকার। একটু বয়স্ক। নাম কয়াং ট্রং লি। আমি মনে রাখার জন্য বললাম আমি তোমাকে “লি” বলে ডাকব। আমাকে আবুল বলে ডাকবে। ওর সাথে এখন আমার ফেইস বুকে যোগাযোগ। লাক্সারি ট্র্যাভেল থেকে এসেছে। নতুন টয়োটা সুভ নিয়ে এসেছে। হেনয়তে এটাই আমার ভ্রমনের সাথী।

রওনা হলাম শহরের দিকে। প্রথমে হোটেলে যাব। ইডেন্স হোটেল। শহরের মাঝে। তিন তারা হোটেল। তবে নতুন ও পরিষ্কার। তারপর ফ্রেস হয়ে বেরবো। ৪ টার দিকে বেরোলাম। যাবো ভিয়েতনাম মিজিয়াম অফ এন্থনলজী বা আদিবাসীদের জাদুঘর। ৫৪ টি এথনিক গ্রুপ ৫ টি ভাষায় কথা বলে। তারা আমাদের আদিবাসীদের মত পাহাড়ি ও ডেলটা এলাকায় বাস করে। তাদের জীবন যাত্রা নিয়ে এই বিশাল জাদুঘর। তাদের পোশাক, কি ভাবে জীবন চালায়, জীবন যাত্রা কেমন, কেমন করে তাতে কাপড় বুনে, রান্না করে, পরিবারের রীতি নীতি বা বিয়ে, কৃষি কাজ করে। ঠিক আমাদের আদিবাসীদের মত। ভীষণ সুন্দর করে ডিসপ্লে করা। অনেক ছবি তুলেছি।  বাংলাদেশে ঠিক এমনটি থাকা দরকার জানার জন্য। চট্টগ্রামে  সাদামাটা গোছের একটি আছে। দেখেছিলাম কিন্তু পছন্দ হয় নি। মনে হোল দায় সারা কাজ করা হয়েছে। যেমনটি বাংলাদেশে হয়। এটাকে আরও বড় জায়গা নিয়ে ঢেলে সাজানো উচিত। ভালো লোক দেয়া দরকার যে এই কাজ জানে। বিশ্ববিদ্যালয়য়ের নামকরা শিক্ষক। গবেষনা করতে ভালবাসে।  রাজনৈতিক পোস্ট নয়।   আমাদের লোকজন  খুব একটা জানে না মারমা, চাকমা,সাঁওতাল, ত্রিপুরা, জন্তিয়া, মনিপুরি ও গারোদের বিষয়ে। বর্তমানে সংখ্যায় তারা প্রায় বিশ লাখ। তাদের জায়গাই ত আমরা দখল করে আছি। তাদের দেখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। একান্ত প্রয়োজন।  ভ্রমণকারীরা আসলেও জানতে পারবে। একটি টুরিস্ট স্পট হবে। স্বনির্ভর প্রজেক্ট।

সেখান থেকে বেরিয়ে “ওল্ড কোয়াটার” ও “হুয়াম কিএম লেক” দর্শন। খুব সুন্দর লেকটি। সূর্য অস্ত যাচ্ছিল তখন। লেকের মাঝে একটি পুরানো বুদ্ধ মন্দির। ১৮০০ এর দিকে করা। আরও আছে ছোট্ট একটি “টারটেল টাওয়ার”। এটি মিথোলজির সাথে জড়িত।  পানি খুব পরিষ্কার। লোকেরা খুব উপভোগ করছে। অনেক পুরানো গাছের সমাহার। কিছু গাছ মিতালি করছে পানির সাথে। বাংলাদেশে ত পুরানো গাছ কেটে সব সাবাড়। ঢাকা মেডিকেলের সামনের বিশাল গাছগুলো আমরা দেখেছি। স্বাধীনতার সময় শাহাবাগ এভেনিয়র কৃষ্ণচূড়া গাছ এখন শুধুই অতীত। এখনকার প্রজন্ম দেখে নাই। বেশ উপভোগ্য এ লেকের পাড়। লোকদের সময় কাটাবার জন্য ভালো জায়গা। হাটার জন্য খুব মনোরম জায়গা। অনেকে হাটছে দেখলাম। কিন্তু কাউকে খাবার বিক্রি করতে দেখিনি।

গরমে “ওল্ড কোয়াটার” দেখতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। বেশ খানিকটা হাটতে হয়। এই শহর গড়ে উঠে  ১০০৯ থেকে ১২২৫ পর্যন্ত  “লি” ডাইনেস্টির সময়। এরপর “ট্রান” ডাইনেস্টি রাজত্ব করে ১৪০০ পর্যন্ত। অল্ড কোয়াটার গড়ে উঠতে থাকে সেই সময় থেকে। ফারাসিরা এসে ঢুকে ১৮৮৭ এর শেষ দিকে। তাঁই ফারাসিদের নির্মাণ ছাপ দেখা যায়। অনেক পুরানো শহর।পুরানো গির্জা। প্রায় ৪০ টি রাস্তা। মানুষ গিজ গিজ করছে।  রাস্তার উপর সারি সারি করে ছোট ছোট দোকান ও খাবারের জায়গা। সন্ধ্যার দিকে বেশ জমে উঠে। অনেকটা ব্যাংকক এর মত। তবে কোনও ম্যাসেজ পার্লার বা নাইট ক্লাব নেই। গাড়ি চলাচল খুব কম। গাইড ভেবেছিল ওখানে খাব। সেটা আর পারি নি ক্লান্তিতে। এ ছাড়াও ভিয়েতনামিজরা খাবারে শূকরের মাংস দেয়।আগের বারের অভিজ্ঞতা আছে।  তাই ভালো খাবারের জায়গা খুজছিলাম। হাটতে হাটতে লেকের অপর পারে পেয়ে গেলাম একটা। বেশ ভালো ও বড় রেস্টুরেন্ট। ভেতর থেকে লেক দেখা যায়। জায়গা পেতে কষ্ট হল। একবার তো মনে করলাম পাবো না। ভাগ্যগুনে পেয়ে গেলাম বেরোবার আগে। ভিয়েতনামি রেস্টুরেন্ট। বুঝিয়ে বললাম কি খাব। আমার আবার মাংসে অরুচি। শেষ পর্যন্ত আমার সামনেই আমাকে দেখিয়ে মাছ রান্না করলো। সবজি রান্না করলো। সমস্যা হচ্ছিল কথা বলাতে। ইংরাজি একদম বুঝে না। ফারাসি ভাষাও কেউ জানে না। আমার যাবার কথা ছিল ভারতীয় রেস্টুরেন্ট এ। গাইডের পছন্দ না হওয়াতে সে রিজারভেসান বাতিল করে দেয়। তাতেই গোল বাধে। বেশ মজা করেই খেলাম। খাবার বেশ সুস্বাদু।

চলবে…

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের  লেখকঃ  পাস্ট ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল,  বাংলাদেশ।  মন্ট্রিয়ল, কানাডা।
লেখকের অন্যান্য ভ্রমণ কাহিনী….
আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ১     আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ২     আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ৩
আপনার মন্তব্য লিখুন