ফিচার্ড যাপিত জীবন

গৃহ শ্রমের মূল্য…

গৃহ শ্রমের মূল্য…

গৃহিণীর সুব্যবস্থাপনার জন্যই অনেক পুরুষ জীবনে সফল হতে পেরেছেন। কর্মজীবী নারীরা জানেন সারা দিন খাটাখাটুনির পর ঘর নিয়েও দুশ্চিন্তা করতে হয়। আবার ঘরে এসে গৃহিণীর কাজ সামাল দিতে হয়। শরীর ও মনের ওপর দারুণ চাপ পড়ে। স্বামীরাও কিছু দায়িত্ব ভাগ করে নেন। কিন্তু যেসব স্বামীর স্ত্রীরা গৃহকর্মে ব্যস্ত থাকেন, তারা নিশ্চিন্তে সব দায়িত্ব স্ত্রীর ওপর ছেড়ে দিতে পারেন।

গৃহিণীর প্রধান কাজ ঘর সামলানো। আর এখনো সমাজের অধিকাংশ মানুষের কছে এটি কোনো কাজই না। এর প্রধান কারণ ঘরের কাজের অর্থনৈতিক স্বীকৃতি না থাকা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের মতে, একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২ দশমিক ১টি কাজ করেন। পুরুষের ক্ষেত্রে এ কাজের গড় সংখ্যা ২ দশমিক ৭টি। অর্থাৎ একজন পুরুষের তুলনায় একজন গৃহিণী প্রায় তিন গুণ বেশি সময় কাজ করেন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ৪৩ শতাংশের বেশি নারী পুরোপুরিভাবে গৃহস্থালির কাজে যুক্ত। পুরুষ ১ শতাংশের কম। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান ২০ শতাংশ। তবে গৃহস্থালির কাজকে জাতীয় আয় পরিমাপের পদ্ধতিতে (এসএনএ) যোগ করা গেলে জিডিপিতে নারীর অবদান দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীই পারিবারিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের দুটি জেলায় গবেষণা চালিয়ে ‘অ্যাকশনএইড’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয়, অমূল্যায়িত বা আনপেইড সেবা খাতে পুরুষের তুলনায় নারী অন্তত ৪০ ভাগ সময় বেশি ব্যয় করেন; কিন্তু তাদের এই কাজের কোনো স্বীকৃতি দেয়া হয় না। বাসাবাড়িতে যেসব গৃহকর্মী থাকেন, তাদের সুনির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য বেতন দেয়া হয়। কিন্তু গৃহিণীর সারা দিনের দায়িত্ব ও কাজকর্মের কোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি নেই।

গৃহিণীর এই কাজকে দেখতে হবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে। পরিবার গঠনে মূল ভূমিকা পালন করেন তারাই। তাদের এই কাজকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করলে দূর হবে নারী-পুরুষের সামাজিক বৈষম্য।

১.

গৃহিণীর কাজের তালিকায় রয়েছে রান্না করা, কাপড় কাচা, শিশু প্রতিপালন, গৃহ ব্যবস্থাপনা, ঘর পরিষ্কার, থালা-বাসন পরিষ্কার ইত্যাদি। এ ছাড়া কাঁচাবাজার করা, কেনাকাটা করা, অনুষ্ঠানের আয়োজন, পরিবারের পরামর্শক, ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং, বাচ্চাদের শিক্ষক, হিসাবরক্ষণ- এসব কাজও গৃহিণীদের করতে হয়। অনেকে ড্রাইভিংও করতে পারেন। আমাদের দেশের গৃহিণীরা শ্বশুরবাড়িতে অন্যান্য আত্মীয়স্বজনেরও দেখাশোনা করেন। গ্রামের কৃষক-বধূরা স্বামীকে কৃষিকাজে সহায়তা করেন।

গৃহিণীদের এই কাজগুলো যদি অন্যদের দিয়ে করানো হতো, তবে তার অর্থমূল্য কত হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। উপরন্তু গৃহিণীদের মতো আন্তরিকতা ও যত্ন নিয়ে কেউ এই কাজগুলো করতে পারবে কি না, তাতেও সংশয় আছে।

২.

গৃহিণীর সুব্যবস্থাপনার জন্যই অনেক পুরুষ জীবনে সফল হতে পেরেছেন। কর্মজীবী নারীরা জানেন সারা দিন খাটাখাটুনির পর ঘর নিয়েও দুশ্চিন্তা করতে হয়। আবার ঘরে এসে গৃহিণীর কাজ সামাল দিতে হয়। শরীর ও মনের ওপর দারুণ চাপ পড়ে। স্বামীরাও কিছু দায়িত্ব ভাগ করে নেন। কিন্তু যেসব স্বামীর স্ত্রীরা গৃহকর্মে ব্যস্ত থাকেন, তারা নিশ্চিন্তে সব দায়িত্ব স্ত্রীর ওপর ছেড়ে দিতে পারেন। পুরুষরা তাদের প্রেরণা ও চালিকাশক্তি এই গৃহিণীদের কাছ থেকেই পেয়ে থাকেন।

৩.

গৃহিণীরা পারিবারিক জীবনে শৃঙ্খলা ও মাধুর্য বজায় রাখতে সাহায্য করেন। গৃহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখেন। তাদের সাহায্য না পেলে শিশুদের ডে-কেয়ার বা বেবি কেয়ার সেন্টারে রাখতে হতো। কাজের লোকের সাহচর্যে থেকে অশিক্ষা ও কুশিক্ষার শিকার হতে পারত। পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা বৃদ্ধাশ্রমে যেতে বাধ্য হতেন। সফল গৃহিণীরা পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় রাখেন।

৪.

গৃহিণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সন্তান প্রতিপালন। সন্তানের বিকাশ ও বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে একজন সুশিক্ষিত ও দক্ষ গৃহিণীর নিষ্ঠা একান্ত প্রয়োজন। শিশুদের ১-৫ বছরের মধ্যেই মস্তিষ্কের বেশিভাগ বিকাশ ঘটে। তাই এই সময়টায় শিশুকে দেয়া মায়ের সময় আর শিক্ষাই হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান। শিশুরা যদি একটি জাতির ভবিষ্যৎ হয়, তবে সেই শিশুদের যেসব গৃহিণী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, তারা অবশ্যই মূল্যবান।

৫.

এ কথা সত্য যে নারীরাই হচ্ছেন প্রকৃত হোম মেকার। একটা সময় মায়েরা তাদের বাচ্চাদের জন্য এবং গৃহ ব্যবস্থাপনার জন্য বেশি সময় দিতে পারতেন, তখন সামাজিক পরিবেশও কিন্তু অনেক ভালো ছিল। কারণ হয়তো সেসব বাচ্চার মানসিক বিকাশ খুব ভালোভাবে হতো, মায়েদের শাসনে থাকার কারণে তাদের নৈতিক অবনমন কম হতো। এখনকার মতো এতটা নৈতিক পদস্খলন ও সামাজিক ব্যাধি তখন ছিল না। কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই দেখা যায় যে বাচ্চাদের সঙ্গে অল্প কিছু সময় ভালোভাবে কাটাতে গিয়ে তারা বাচ্চাদের নানা অন্যায় আবদারও মেনে নেন। এর ফলে এসব শিশু গোঁয়ার ও অসংবেদনশীল হয়ে বেড়ে ওঠে।

 

আপনার মন্তব্য লিখুন