পত্রিকার পাতা থেকে ফিচার্ড

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার: তিস্তা চুক্তির জট কি তবে খুলবে?

teesta-flood

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নদী কেবল ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়—এটি কূটনীতি, অর্থনীতি এবং মানবিক অস্তিত্বেরও প্রশ্ন। সেই বাস্তবতায় তিস্তা নদী বহুদিন ধরেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এক সংবেদনশীল ও অসমাপ্ত অধ্যায়ের নাম। বহু প্রতিশ্রুতি, একাধিক আলোচনার পরও তিস্তা চুক্তি আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

তিস্তা নদীকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দীর্ঘদিনের যে অমীমাংসিত প্রশ্ন, তা এখন নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে। কারণ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। আর ভারতে নরেন্দ্র মোদি-র নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকারও এখন বিজেপির নিয়ন্ত্রণে।

এই নতুন বাস্তবতা তিস্তা চুক্তিকে ঘিরে বহুদিনের স্থবিরতার মধ্যে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

বাংলাদেশ সরকারকে এখন শুরু থেকেই তিস্তা চুক্তির বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। পাশাপাশি মোদি সরকারকে বারবার স্মরণ করাতে হবে যে, এখন আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথা মমতার বাধা নেই।

কারণ, ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন সরকার বহুবার বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে যে তিস্তা চুক্তি হবে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই এই চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁর প্রধান যুক্তি ছিল—তিস্তার পানির ভাগ দিলে উত্তরবঙ্গের কৃষি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ইতিবাচক থাকলেও রাজ্য সরকারের অনাগ্রহের কারণে চুক্তিটি বারবার থমকে গেছে।

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী আন্তঃরাষ্ট্রীয় নদী চুক্তিতে রাজ্যের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়। তাই রাজনৈতিকভাবে একই দলের নিয়ন্ত্রণ তিস্তা চুক্তির পথে একটি বড় বাধা দূর করতে পারে—এমনটি মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

তিস্তা নদী, যা হিমালয় থেকে নেমে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুষ্ক মৌসুমে এই নদীর পানির প্রবাহ কমে গেলে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সেচ সংকট দেখা দেয়। ফলে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য কেবল কূটনৈতিক ইস্যু নয়—এটি খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে তিস্তা চুক্তি একটি অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি। ২০১১ সালে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময় এই চুক্তি স্বাক্ষরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে তা ভেস্তে যায়। সেই থেকে এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও চুক্তিটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

এদিকে ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেও তিস্তা চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী—বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে। তাই দিল্লি বরাবরই ঢাকার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। তিস্তা চুক্তি সেই সম্পর্ককে আরও মজবুত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো—কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনই সব সমস্যার সমাধান নয়। তিস্তা নদীর পানির পরিমাণ নিজেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনে হিমবাহ গলছে, উজানে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে—সব মিলিয়ে নদীর প্রবাহ আগের মতো নেই। ফলে পানির বণ্টন নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত ও বৈজ্ঞানিক সমাধান প্রয়োজন, যা দুই দেশের স্বার্থকে সমন্বয় করবে।

এই জায়গায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়টিও। যদি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন উদ্যোগ নেয়, তাহলে দিল্লিও হয়তো আরও ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে। অতীতে বিএনপি-ভারত সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না, তবে বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতায় উভয় পক্ষই সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার পেছনে তাই কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভারতের কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার একই দলের হাওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক সহযোগিতা—বিশেষ করে পানি ও পরিবেশ ইস্যুতে—দুই দেশই এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এখন করণীয় হচ্ছে কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি সক্রিয় রাখা। দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে পানির ন্যায্য বণ্টনের যুক্তি তুলে ধরা। তৃতীয়ত, বিকল্প পানি ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানো। কারণ একমাত্র তিস্তার উপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়—পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তিস্তা চুক্তির জট খোলার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি একটি সুযোগ—যাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কৌশলগত দক্ষতা এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ।

কারণ ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক তিস্তা নদীর মতই—কখনো শান্ত, কখনো অস্থির। কিন্তু দুই দেশ যদি সত্যিকার অর্থে পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে তিস্তা চুক্তি হয়ে উঠতে পারে দুই দেশের শান্তি, সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বের প্রতীক।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]

সূত্র: মানবজমিন

এফএইচ/বিডি


CBNA24  রকমারি সংবাদের সমাহার দেখতে হলে
আমাদের ফেসবুক পেজে ভিজিট করতে ক্লিক করুন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করতে পোস্ট করুন।

সংবাদটি শেয়ার করুন