ফিচার্ড রকমারি

ফ্রিজেও মাংস পচে যায় যেসব কারণে

নিয়ম-মেনে-মাংস-খান

ঈদুল আজহা মানেই ঘরে ঘরে কোরবানির ব্যস্ততা। উঠানে কসাইয়ের হাঁকডাক, রান্নাঘরে মসলার গন্ধ, ঘরভর্তি স্বজনের আনাগোনা আর ফ্রিজ ভর্তি টাটকা মাংস—সব মিলিয়ে অন্যরকম এক উৎসবের আবহ।

তবে এই আনন্দের মধ্যেই অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যান—সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে কোরবানির মাংস খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। শুধু স্বাদ নষ্ট হয় তা নয় বরং কিছু অসতর্কতায় দেখা দিতে পারে খাদ্যে বিষক্রিয়াসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরবানির সময় অতিরিক্ত মাংস একসঙ্গে ফ্রিজে ভরে রাখা, গরম অবস্থায় সংরক্ষণ করা কিংবা সঠিক তাপমাত্রা বজায় না রাখা—এসব ভুলের কারণেই প্রতিবছর বহু পরিবারের মাংস নষ্ট হয়। তাই উৎসবের আনন্দ ধরে রাখতে চাইলে মাংস সংরক্ষণেও চাই একটু বাড়তি সচেতনতা।

ক্যারিনভোর সোসাইটি গরুর মাংস কিভাবে সংরক্ষণ করলে টাটকা রাখা যায় তা নিয়ে এই প্রতিবেদন করেছে।

 

কোরবানির পরই ফ্রিজে রাখলে যে ক্ষতি

অনেকেই কোরবানির পরপরই গরম মাংস পলিথিনে ভরে ফ্রিজে রেখে দেন। অথচ এটি সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি।

তাজা মাংস কিছু সময় বাতাসে রেখে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ঠান্ডা হতে দিতে হবে।

তবে সেটি যেন দুই ঘণ্টার বেশি বাইরে না থাকে। অতিরিক্ত গরম অবস্থায় ফ্রিজে রাখলে ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, ফলে অন্য খাবারও ঝুঁকিতে পড়ে।

 

ফ্রিজের তাপমাত্রা কত হওয়া উচিত?

খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাংস সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজের আদর্শ তাপমাত্রা ০ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ফ্রিজার হওয়া উচিত মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে।

লোডশেডিংয়ের এই সময়ে বিদ্যুৎ চলে গেলে বারবার ফ্রিজ খোলা থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এতে ভেতরের ঠান্ডা কিছুটা হলেও ধরে রাখা সম্ভব হয়।
ফ্রিজে কত দিন ভালো থাকে কোরবানির মাংস?

সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করলে কাঁচা গরুর মাংস সাধারণত ফ্রিজে ৩ থেকে ৫ দিন ভালো থাকে। তবে কিমা বা কলিজার মতো অঙ্গজাত অংশ ১ থেকে ২ দিনের মধ্যেই রান্না করা উচিত।

দীর্ঘদিন রাখতে চাইলে ফ্রিজারে সংরক্ষণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ। ভ্যাকুয়াম-সিল বা বায়ুরোধী প্যাকেটে রাখলে কয়েক মাস পর্যন্ত মাংস ভালো থাকতে পারে।

 

গরুর স্টেক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকায় স্টেক খাওয়ার প্রচলন শুরু হলেও আমরাও এখন এই খাবারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই গরমে ঝলসানো মাংসের পার্টি বাড়ির উঠানে কিংবা ছাদে চলতেই থাকে। ঝলসানো মাংসের মধ্যে একটা বিশেষ ধরন হলো স্টেক।আপনার প্রিয় স্টেক কতদিন ফ্রিজে ভালো থাকে? কাঁচা গরুর স্টেক ০–৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে।

ভ্যাকুয়াম-সিল করা প্যাকেট বা বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে মাংসের সতেজতা বজায় থাকে এবং বাতাসের সংস্পর্শ কমে যায়। সুপারশপের সাধারণ মোড়কে রাখলে মাংস দ্রুত আর্দ্রতা হারায় ও নষ্ট হয়।

সবচেয়ে ভালো ফল পেতে ফ্রিজের সবচেয়ে ঠান্ডা অংশে মাংস রাখুন এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রান্না করুন।

 

কিমা মাংস
কিমা পুরো মাংসের টুকরার তুলনায় দ্রুত নষ্ট হয়। কারণ, কিমা করার ফলে মাংসের অনেক বেশি অংশ বাতাসের সংস্পর্শে আসে, যা ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়।

০–৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফ্রিজে রাখলেও কিমা ১ থেকে ২ দিনের মধ্যে রান্না করে ফেলা উচিত।

বায়ুরোধী পাত্র বা ভ্যাকুয়াম-সিল করা ব্যাগে রাখলে মাংস বেশি সময় টাটকা থাকে এবং নষ্ট হওয়ার গতি কমে। দ্রুত রান্না করার পরিকল্পনা না থাকলে ফ্রিজারে রাখুন—তাহলে এটি কয়েক মাস পর্যন্ত নিরাপদ থাকবে।

ব্যবহারের আগে দুর্গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা অস্বাভাবিক রঙ আছে কি না পরীক্ষা করুন। আর মনে রাখবেন, কাঁচা কিমা কখনোই ২ ঘণ্টার বেশি ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা উচিত নয়।

 

গরুর কলিজা, কিডনি ও হৃৎপিণ্ড
অঙ্গজাত মাংস পুষ্টিকর হলেও খুব দ্রুত নষ্ট হয়। সাধারণ মাংসের তুলনায় গরুর কলিজা, কিডনি ও হৃৎপিণ্ড ০–৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফ্রিজে মাত্র ১ থেকে ২ দিন ভালো থাকে।

এগুলোতে আর্দ্রতা ও রক্তের পরিমাণ বেশি থাকায় সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে দ্রুত ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। তাই শক্তভাবে মোড়ানো বা ভ্যাকুয়াম-সিল করা অবস্থায় ফ্রিজের সবচেয়ে ঠান্ডা অংশে রাখা উচিত।

তাৎক্ষণিক রান্নার পরিকল্পনা না থাকলে ফ্রিজারে রাখুন। রান্নার আগে রং পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক গন্ধ আছে কি না পরীক্ষা করুন। টাটকা অঙ্গজাত মাংস সাধারণত শক্ত টেক্সচার ও হালকা গন্ধযুক্ত হয়।

 

ম্যারিনেট করা গরুর মাংস
ম্যারিনেট করলে কি মাংস বেশি দিন ভালো থাকে? সামান্য কিছুটা সাহায্য করে, তবে খুব বেশি নয়। ভিনেগার, লেবু বা সয়া সসযুক্ত অ্যাসিডিক মেরিনেড ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কিছুটা কমাতে পারে। তারপরও মেরিনেট করা গরুর মাংস ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে রান্না করা উচিত।

সব সময় কাচ বা খাবার সংরক্ষণের উপযোগী প্লাস্টিকের বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন, যাতে তরল বের না হয় বা অন্য খাবারে দূষণ না ছড়ায়।

তেলভিত্তিক মেরিনেড ব্যবহার করলে মাংস সম্পূর্ণ ডুবিয়ে রাখুন, এতে স্বাদ ভালোভাবে মিশবে এবং সংরক্ষণও ভালো হবে।

ম্যারিনেট করা মাংস ফ্রিজারেও রাখা যায়। তবে রান্নার আগে ফ্রিজে রেখে গলিয়ে নিতে হবে। ম্যারিন্যাট টক গন্ধ বা অস্বাভাবিক ঘনত্ব দেখা দিলে মাংস ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।

গন্ধ, রং আর পিচ্ছিল ভাব—এই তিন সংকেত ভুলবেন না

ফ্রিজে রাখা মাংস বের করার পর যদি টক বা দুর্গন্ধ আসে, রঙ ধূসর বা সবুজাভ হয়ে যায় কিংবা গায়ে পিচ্ছিল ভাব দেখা দেয়—তাহলে সেটি আর খাওয়ার উপযোগী নয়।

অনেকেই মসলা দিয়ে রান্না করে গন্ধ ঢাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নষ্ট মাংস কোনোভাবেই নিরাপদ নয়।

 

পচে গেছে কি না বুঝবেন কখন?

আপনার মাংস নষ্ট হয়েছে কি না নিশ্চিত নন ? পচা মাংস খেলে খাদ্যে বিষক্রিয়া হতে পারে।

তাই নিচের লক্ষণগুলো খেয়াল করুন—

দুর্গন্ধ: টাটকা মাংসে হালকা গন্ধ থাকে। টক, অ্যামোনিয়ার মতো বা পচা গন্ধ এলে বুঝতে হবে মাংস নষ্ট হয়েছে।

রঙ পরিবর্তন: কিছুটা কালচে হওয়া স্বাভাবিক হলেও ধূসর, সবুজ বা হলদে রঙ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নির্দেশ করে।

পিচ্ছিল বা আঠালো ভাব: মাংসের গায়ে পিচ্ছিল বা আঠালো স্তর তৈরি হলে তা খাওয়ার অনুপযোগী।

অতিরিক্ত তরল বা রক্ত জমা হওয়া: সামান্য আর্দ্রতা স্বাভাবিক, তবে অতিরিক্ত দুর্গন্ধযুক্ত তরল পচনের লক্ষণ।

ছত্রাক বা দাগ: সাদা, সবুজ বা কালো তুলার মতো ছত্রাক দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিন।

অতিরিক্ত সময় সংরক্ষণ: কাঁচা গরুর মাংস ৫ দিনের বেশি বা রান্না করা মাংস ৪ দিনের বেশি ফ্রিজে থাকলে না খাওয়াই ভালো।

 

কীভাবে সংরক্ষণ করলে মাংস ভালো থাকে

গরুর মাংসের স্বাদ, গুণগত মান ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সঠিক সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • ফ্রিজের সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখুন
  • ০–৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গরুর মাংস সবচেয়ে ভালো থাকে। ৪ ডিগ্রির বেশি হলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বাড়তে থাকে। তাই ফ্রিজ থার্মোমিটার ব্যবহার করা ভালো।
  • বায়ুরোধী প্যাকেজ ব্যবহার করুন
  • সুপারশপের পাতলা মোড়কে মাংস দীর্ঘদিন ভালো থাকে না। ভ্যাকুয়াম-সিল ব্যাগ, বায়ুরোধী পাত্র বা কসাইখানার কাগজ ব্যবহার করুন।
  • ভ্যাকুয়াম-সিল করলে সতেজতা বেশি থাকে
  • ভ্যাকুয়াম-সিল করলে বাতাস বের হয়ে যায়, ফলে অক্সিডেশন ও ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ধীর হয়। এতে মাংস ফ্রিজে ৫ দিন পর্যন্ত এবং ফ্রিজারে কয়েক মাস ভালো থাকে।
  • ফ্রিজের সবচেয়ে ঠান্ডা অংশে রাখুন
  • সবসময় নিচের তাক বা আলাদা মাংস রাখার ড্রয়ারে সংরক্ষণ করুন, যাতে রান্না করা খাবারের সঙ্গে দূষণ না ঘটে।
  • ফ্রিজারে রাখার আগে ভাগ করে নিন
  • কয়েক দিনের মধ্যে রান্না না করলে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে ফ্রিজারে রাখুন। তারিখ লিখে রাখুন, যাতে পুরোনো মাংস আগে ব্যবহার করা যায়।
  • মেরিনেট করা মাংস কাচের পাত্রে রাখুন। মেরিনেট করা মাংস কাচ বা BPA-মুক্ত প্লাস্টিকের পাত্রে রাখলে স্বাদ ও গঠন ভালো থাকে।

 

যেসব ভুলে গরুর মাংস দ্রুত নষ্ট হয়

সামান্য কিছু ভুলেই স্বাদের মাংস নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই ভালোভাবে খেয়াল রাখতে হবে নিচের বার্তাগুলো।

  • কাঁচা মাংস ২ ঘণ্টার বেশি ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা
  • সুপারশপের মোড়কেই দীর্ঘসময় সংরক্ষণ করা
  • ফ্রিজ ০–৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে না রাখা
  • অতিরিক্ত ভরা ফ্রিজে মাংস রাখা, যাতে বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়
  • সঠিকভাবে মোড়ানো ছাড়া ফ্রিজারে রাখা
  • গলানো মাংস অনেকদিন ফ্রিজে রেখে দেওয়া
  • সংরক্ষণের তারিখ না লেখা
  • একসঙ্গে পুরো মাংস ভরে ফেলবেন না
  • রান্না করা গরুর মাংস কতদিন ভালো থাকে?

ঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে রান্না করা গরুর মাংস ০–৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফ্রিজে ৩ থেকে ৪ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে।

শুকিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হওয়া ঠেকাতে বায়ুরোধী পাত্র বা ভ্যাকুয়াম-সিল করা ব্যাগে সংরক্ষণ করুন।

আরও দীর্ঘ সময় রাখতে চাইলে ফ্রিজারে রাখুন। ভালোভাবে মোড়ানো অবস্থায় রান্না করা গরুর মাংস ফ্রিজারে ৩ মাস পর্যন্ত ভালো থাকে।

পুনরায় গরম করার সময় অন্তত ৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত গরম করুন, যাতে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়। একই খাবার বারবার গরম করা উচিত নয়, এতে স্বাদ ও গঠন নষ্ট হয়।

যদি টক গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা ছত্রাক দেখা যায়, সঙ্গে সঙ্গে মাংস ফেলে দিন।

নিরাপদ থাকুক মাংস

কোরবানির ঈদ শুধু ত্যাগের উৎসব নয়, এটি ভাগাভাগি আর একসঙ্গে খাওয়ারও আনন্দ। সেই আনন্দ যেন অসতর্কতায় ম্লান না হয়, সেজন্য মাংস সংরক্ষণে সচেতন হওয়া জরুরি।

সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে কোরবানির মাংস দীর্ঘদিন ভালো থাকবে, স্বাদও অটুট থাকবে। আর পরিবারের সবাইও থাকবে নিরাপদ।

সূত্র: কালের কন্ঠ

এফএইচ/বিডি


CBNA24  রকমারি সংবাদের সমাহার দেখতে হলে
আমাদের ফেসবুক পেজে ভিজিট করতে ক্লিক করুন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করতে পোস্ট করুন।

সংবাদটি শেয়ার করুন