বাকৃবি গবেষণা, বেগুনে ক্যান্সার আর সাংবাদিকতা
জনকণ্ঠের প্রতিবেদন “নিয়মিত বেগুন খেলে ক্যান্সার হতে পারে!”( ১৮ই অক্টোবর, ২০২২)। স্বাস্থ্য, খাদ্য আর কৃষি খাতের জন্যে ভয়াবহ একটি শিরোনাম। যিনি এই রিপোর্ট তৈরি করেছেন বুঝা যাচ্ছে উনি সাংবাদিকতায় বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বের জন্যেই চিৎকার করছেন। প্রতিবেদন দেখে বিস্মিত হবার পাশাপাশি আশা করেছিলাম এই “হেভিওয়েট” শিরোনামের পেছনে নিশ্চয় অনেক তথ্য উপাত্তের সমাহার। এমনকি ইংরেজি পত্রিকাও লিখছে “Cancer substances detected in eggplants”
জনকণ্ঠের নিউজটি পড়তে গিয়ে প্রথম প্যারাতেই হোঁচট খেলাম। প্রতিবেদন বলছে “বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিয়মিত এই সবজি খেলে এসব উপাদান থেকে ক্যান্সার হতে পারে। তবে রান্নার পর বেগুনে ক্যান্সারের উপাদান থাকবে কিনা কিংবা মানবদেহের জন্য সহনীয় কত মাত্রার উপাদান পাওয়া গেছে বেগুনে সেটি গবেষণায় আসেনি।“
এখন প্রশ্ন এরকম একটি অসম্পূর্ণ গবেষণার ফলাফলে কেমন করে বেগুনের মত নিত্য ব্যবহৃত প্রাণ রাসায়নিকভাবে নিরাপদ একটি সবজিকে ক্যান্সারের সাথে জড়িয়ে দেওয়া হল? অতি উৎসাহ, উদ্দেশ্য প্রণোদিত না নির্বুদ্ধিতা ?
প্রতিবেদন নিজেই বলছে এন্ড ইউজারের পাতে বেগুন পৌছা পর্যন্ত হেভিমেটালের পরিমান জানা নেই। আরও জানা নেই কত দিন ধরে এই বেগুন সেবনে কি কি স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে। অনেক কিছুই জানা নেই কিন্তু যেটি জানা হল অর্থনীতির কঠিন সময়ে বেগুন চাষিদের বারোটা বাজিয়ে দেওয়া।
খাদ্য-দ্রব্যে হেভিমেটালের (যেমন লেড, ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের) উপস্থিতি (যদি নিরাপদ মাত্রার বেশী হয়) স্বাস্থ্যের জন্যে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, এতো জানা কথা। যে কোন খাদ্য-দ্রব্যে হেভিমেটালগুলোর একটি নিরাপদ মাত্রা থাকে (১-২ পিপিএম ইত্যাদি)।
বেগুন তো নিজে হেভিমেটাল তৈরি করে না; এটি কীটনাশক, মাটি, পানি ক্ষেত্র বিশেষে বায়ুদূষণের (যেমন লেড) ফলে বেগুনে সংশ্লেষিত হতে পারে এবং সমস্যাটি খুব সম্ভবত স্থানীয় এবং প্রতিকারযোগ্য। কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের যে অভ্যাস তাতে যদি নির্দিষ্ট সবজিতে হেভিমেটালের পরিমান নিরাপদ মাত্রা থেকে বেশী পাওয়া যায় তখন এই অভ্যাস পরিবর্তন কিংবা কম মাত্রার হেভিমেটালের কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
বাংলাদেশের অনেক জায়গায় এই সমস্যাটি নাও থাকতে পারে। হেভিমেটাল আর্সেনিক তো বাংলাদেশের সব জায়গার পানির উৎসে থাকে না। কিন্তু এই প্রতিবেদন তো পুরো দেশের এমনকি বৈশ্বিক প্রেক্ষিতেও বেগুনকে সুস্বাস্থ্যের ভিলেন বানিয়ে দিল। আর ইলিশ এবং অন্যান্য মাছের ঝোলের সাথে বেগুন যাঁদের প্রিয় তাঁদের সংশয়ে ফেলে দিল।
খ্রিস্টপূর্ব শত শত বছর পূর্ব থেকে এশিয়ায় প্রচলিত এই সবজিটির খোসা নানা বর্ণের। বেগুনের খোসা ক্যান্সার নিরোধী এন্টিঅক্সিডেন্টের জন্যে বিখ্যাত; একটু গুগুল সার্চ দিলেই নামীদামী জার্নালের অসংখ্য বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ পাবেন। ভাইরে, বেগুনের সাথে ক্যান্সারের তকমা লাগিয়ে প্রতিবেদন করা আগে একটু ব্যাকগ্রাউন্ড স্টাডি করা কি উচিত ছিলনা?
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এই প্রতিবেদনের গণ প্রচারণার বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত ছিল। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, কৃষকদের প্রতি, জাতির প্রতি কমিটেড।
বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার পাবলিকেশন হচ্ছে। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো খুব সাবধানতার সাথে ম্যানেজ করা হয় যাতে অসম্পূর্ণ কোন উপসংহারে বিভ্রান্তি না ছড়ায়।
গবেষণা প্রবন্ধের তথ্যগুলো নীতি নির্ধারণী কর্তৃপক্ষের বিবেচনার আগে মিডিয়ায় চলে গেলে বিশেষ করে বাংলাদেশের মিডিয়ায় যেখানে বিজ্ঞান সাংবাদিকতার চূড়ান্ত দুর্দশা সেখানে ভালো কিছু আশা করা যায় না। ফলে পত্রিকায় চমকপ্রদ প্রতিবেদনের নামে আজকে দেখছি নিয়মিত বেগুন খেলে ক্যান্সার হয়, কালকে দেখবো নিয়মিত পটল খেলে পটল তুলতে হবে, হাবিজাবি শিরোনামে বিভ্রান্তিকর খবরের ছড়াছড়ি।
গবেষক এবং প্রতিবেদকের দায়িত্বশীলতায় আর কৃষকদের প্রতি মমতায় “নিয়মিত বেগুন খেলে ক্যান্সার হয়” কিংবা “ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান পাওয়া গেছে” এ ধরণের আতংক সৃষ্টিকারী শিরোনামের বদলে খবরটি হতে পারতো এরকম যে কিছু এলাকার বেগুনে উচ্চমাত্রার হেভিমেটাল পাওয়া গেছে এবং কারণ নির্ণয় করে প্রতিরোধ করতে হবে। সস্তা প্রচারণায় দায়িত্বশীলতা হারিয়ে যায়।
বেগুনে ক্যান্সারের উপাদান!