দেশের সংবাদ ফিচার্ড

শেখ হাসিনার পর কে?

শেখ হাসিনার পর কে?

বৃহস্পতিবার পঞ্চম মেয়াদে শপথ নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে আধিপত্য আরও মজবুত করলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু একইসঙ্গে তার যোগ্য উত্তরসূরির অভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিরোধী দলকে নিষ্ক্রিয় করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জনসংখ্যার হিসাবে বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশটির প্রধানমন্ত্রী এখন ক্ষমতার শীর্ষে রয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনা যদি তার মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেন, তবে তার বয়স হবে ৮১ বছর। তিনি হয়ত এ সময়ের মধ্যে তার উত্তরসূরিকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করতে সক্ষম হবেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কে তার উত্তরসূরি হবেন এখন সেটাই বড় প্রশ্ন। শেখ হাসিনার পর দলের কী হবে- তা নিয়ে আওয়ামী লীগের বেশক’জন নেতার কাছে প্রশ্ন করেছিল এএফপি। কিন্তু বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে কেউই এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক শাখায় কাজ করা একজন মধ্যম সারির নেতা এএফপিকে বলেন- তিনি এই উত্তরাধিকার ইস্যু নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করছেন না।

হাসিনা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতার কন্যা এবং দেশের বংশানুক্রমিক রাজনীতির ঐতিহ্যের প্রতীক। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের পিয়ের প্রকাশ এএফপিকে বলেছেন যে, হাসিনার তার পরিবারের বাইরে থেকে উপযুক্ত উত্তরসূরি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে তার পিতার রাজনৈতিক দলটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। প্রকাশ বলেছিলেন যে, দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর তার লৌহকঠিন দৃঢ়তার কারণে যোগ্য তরুণ নেতাদের উত্থান আটকে আছে। পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাস করেন যে, হাসিনার উত্তরসূরি হতে পারেন তারই পরিবারের ঘনিষ্ঠ তিনজন সদস্যদের মধ্যে একজন।

শেখ হাসিনার পুত্র
সজীব ওয়াজেদ জয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড় ছেলে এবং দেশের বাইরে থাকা সত্ত্বেও তিনি তার সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। ৫২ বছর বয়সী জয় বাংলাদেশে ইন্টারনেট পরিষেবার সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং নভেম্বর পর্যন্ত তার মায়ের ডিজিটাল উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়াতে তিনি সরকারের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত দু’টি বিশিষ্ট থিঙ্ক-ট্যাঙ্কের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। রাজনৈতিক প্রচারের সময় পোস্টারগুলোতে তার মায়ের পাশাপাশি তার মুখও প্রদর্শিত হয়। তবে হাসিনার ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র আইন প্রণেতার মতে, জয় রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়তে চান না। তার পরিবারের সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেই পছন্দ করেন। জয় গত নভেম্বরে সংক্ষিপ্তভাবে বাংলাদেশ সফর করলেও সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেননি। দলের এক আইন প্রণেতা এএফপিকে বলেছেন- ২০১৬ সালে তার অনুমতি ছাড়াই তাকে আনুষ্ঠানিক পার্টির সদস্য করার জন্য দলীয় কর্মকর্তাদের রীতিমতো তিরস্কার করেছিলেন জয়।

শেখ হাসিনার বোন
শেখ হাসিনার পিতা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের সময় বিপথগামী সেনা কর্মকর্তাদের হাতে নিহত হন। একই সময়ে তার মা, তিন ভাই এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা (৬৮) সেই সময় তার সঙ্গে বিদেশে ছিলেন। হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার পর তাদের মধ্যেকার বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

১৯৮০’র দশকে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠার সময় রেহানা কীভাবে তার দুই সন্তানের দেখাশোনা করেছিলেন তা বর্ণনা করে গত সপ্তাহের নির্বাচনের কয়েকদিন আগে হাসিনা তার বোনকে কৃতজ্ঞতা জানান। রেহানা নিয়মিতভাবে শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রচারে এবং বিদেশি নেতাদের সঙ্গে বিদেশে বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। রোববারের ভোটের পর এই জুটিকে একসঙ্গে বিজয় উদযাপন করতে দেখা গেছে। লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের অবিনাশ পালিওয়াল এএফপিকে বলেছেন, ঢাকার পাওয়ার করিডোরের মধ্যে শেখ রেহানার অভিজ্ঞতা এবং প্রভাব তাকে একজন বিশ্বাসযোগ্য উত্তরসূরি করে তোলে’।

শেখ হাসিনার কন্যা
৫১ বছর বয়সী সায়মা ওয়াজেদ শেখ হাসিনার দুই সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। গত বছর পর্যন্ত সেভাবে প্রচারের আলোয় আসেননি তিনি। তবে গত নভেম্বরে জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতার অভাব থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে মনোনীত করা হয় সায়মাকে। মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেট ওয়াজেদের প্রার্থিতার স্বচ্ছতা এবং স্বজনপ্রীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও অভিযোগগুলো তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ওয়াজেদ তার মায়ের হাই- প্রোফাইল কূটনৈতিক সফরে নিয়মিত সদস্য। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতিতে তার অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। পালিওয়াল বলেছেন যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বচ্ছ ভাবমূর্তি থাকার কারণে তরুণ বাংলাদেশিদের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেন।

ভবিষ্যৎ
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রকাশ বলেছেন যে, তিনজনের মধ্যে কেউই শেষ পর্যন্ত হাসিনার মতো উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবেন না। তিনি বছরের পর বছর ধরে রাজনীতি সামলে রেখেছেন। প্রকাশের মতে, হাসিনা যেভাবে সবটা সামলেছেন দলীয় ঐক্য বজায় রাখার জন্য পরিবারের বাকি তিন সদস্যের সেই ক্ষমতা বা অভিজ্ঞতা রয়েছে কিনা তা নিয়ে বিশ্লেষকদের সন্দেহ আছে। শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যরা তার শক্তিশালী রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অভাব পূরণ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে বাংলাদেশি ভোটাররাও এএফপি’র কাছে সংশয় প্রকাশ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক আহমেদ ইউসুফ (২৫) এএফপি’কে বলেন, ওয়াজেদ জয় দেশের মাটি ও তরুণদের চেনেন না। শেখ রেহানা আমাদের প্রতিষ্ঠাতার মেয়ে কিন্তু তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার অভাব রয়েছে। সায়মার ক্ষেত্রেও তাই। তারা কি শেখ হাসিনার মতো ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন?

সংবাদটি শেয়ার করুন