প্রবাসের সংবাদ ফিচার্ড

ভূমধ্যসাগরে নিহতদের লাশের অপেক্ষা, শোকে ভাসছে মাদারীপুর

ভূমধ্যসাগরে নিহতদের লাশের অপেক্ষা, শোকে ভাসছে মাদারীপুর

ভূমধ্যসাগরে কিছুতেই থামছে না মৃত্যুর মিছিল। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় প্রাণ হারিয়েছেন সাত বাংলাদেশি। এদের মধ্যে কমপক্ষে ৫ জনের বাড়ি মাদারীপুর। এর আগেও মাদারীপুরের কমপক্ষে শতাধিক যুবক নিহত ও নিখোঁজ হয়। বাংলাদেশ দূতাবাস ২৫শে জানুয়ারি বিষয়টি জানতে পারে। ২৯শে জানুয়ারি নিহত ৭ জনের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করেছে ইতালি দূতাবাস। নিহতদের পরিবারকে নিকটস্থ জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে রোম দূতাবাসে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

ইতালির বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ, মিশরসহ বিভিন্ন দেশের ২৮০ জনের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকায় করে লিবিয়ার উপকূল থেকে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। যাত্রা শুরুর একদিন পরে ভূমধ্যসাগরে প্রচণ্ড ঝড় বাতাসের পর টানা বৃষ্টি হয়।

নৌকাটি ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছায়। পরে ইতালিয়ান কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাদের উদ্ধার করেন। এসময় প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় মারা যান ৭ জন। এদের ৫ জনের বাড়ি মাদারীপুর। নিহতরা হলেন- মাদারীপুর সদর উপজেলার পশ্চিম পেয়ারপুর গ্রামের শাজাহান হাওলাদারের ছেলে ইমরান হোসেন, বড়াইবাড়ি গ্রামের প্রেমানন্দ তালুকদারের ছেলে রতন তালুকদার জয়, ঘটকচরের সাফায়েত, মোস্তফাপুরের জহিরুল ইসলাম এবং মাদারীপুর সদরের বাপ্পী। নিহতদের খবরে এসব পরিবারে চলছে শোকের মাতম। সরজমিন, মাদারীপুর সদর উপজেলার পশ্চিম পেয়ারপুর গ্রামের নিহত ইমরানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গতবছর অক্টোবর মাসে ধার দেনা করে দালাল সামাদের কাছে প্রথম কিস্তিতে ৪ লাখ টাকা দেয়া হয়। পরে লিবিয়া পৌঁছানোর পরে আরও সাড়ে তিন লাখ টাকা দেয়া হয় দালালের কাছে। নিহত ইমরানের বাবা ভ্যানচালক। বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে সুদে এবং এনজিও থেকে ঋণ করে ছেলেকে ইউরোপে পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় মারা যায় ইমরান।

রতন তালুকদার জয়। তার চার চাচাতো ভাই। তাদের স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে চাকরি করে সংসারে সচ্ছলতা আনবেন। সেই উদ্দেশ্যে দালালের মাধ্যমে তারা ইউরোপে যাচ্ছিলেন। নৌকায় করে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেন। ওই চারজনের মধ্যে জয় মারা যান। জয়ের মৃত্যুর খবরে মাদারীপুরে তার বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিহত জয় তালুকদারের (২৩) বাড়ি সদর উপজেলার পেয়ারপুর ইউনিয়নের বড়াইলবাড়ি গ্রামে। তার বাবা পলাশ তালুকদার জয়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

নিহত মাদারীপুরের জয়ের পরিবারের সদস্যরা বলেন, দালালের প্রলোভনে পড়ে গত ২৮শে নভেম্বর পেয়ারপুর ইউনিয়নের বড়াইবাড়ি থেকে জয় তালুকদার ও তারই চাচাতো ভাই প্রদীপ তালুকদার (২১), মিঠু তালুকদার (২২), তন্ময় তালুকদারসহ (১৯) ছয় তরুণ ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মাদারীপুর ছাড়েন। তারা দুবাই হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। পরে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় প্রায় দেড় মাস বন্দি থাকেন। গত ২২শে জানুয়ারি তাদের সাগরপথে যাত্রা শুরু হয়। গন্তব্য ইতালি। ওই রাতে এ সময় নৌকা থেকে সাত বাংলাদেশির লাশ উদ্ধার করা হয়। যার মধ্যে মাদারীপুরের জয়ও ছিলেন। বড়াইলবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জয়ের বাড়িতে গভীর নীরবতা। ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে আহাজারি করছেন মা লক্ষ্মী তালুকদার। ছেলের মুখ দেখার জন্য সবার কাছে আকুতি জানাচ্ছেন। সাগরপথে যাত্রা হওয়ার আগে ২২শে জানুয়ারি সকালে জয়ের সঙ্গে তার মায়ের মুঠোফোনে কথা হয়েছিল। ছেলের সঙ্গে সবশেষ বলা কথা স্মরণ করে কেঁদে উঠছেন তিনি। বলছেন, ‘আমার বাজানে মরে নাই। ও কইছে, ইতালি গিয়া ফোন দিবে। ওরে একবার ফোন দিতে কও। আমি বাজানের মুখটা একটু দেখতে চাই।’ জয়ের মা’য়ের কান্নায় চারপাশের প্রকৃতিও শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

নিহত জয়ের বাবা পলাশ তালুকদার পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে জয় মেজ। দালালের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। যে কাম-কাজ করি, তা দিয়া সংসার চালানো খুবই কষ্ট হয়। আমাগো এলাকার ছেলে জামাল। জামালই ইতালিতে নেয়ার প্রস্তাব দেয়। পরে ওরে বিশ্বাস কইরা ধারদেনা আর জমি বেইচা সাত লাখ টাকা জোগাড় করি। প্রথমে দালালরে ৫০ হাজার টাকা দিছি। পরে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরে সাড়ে ছয় লাখ দিছি। এতগুলো টাকা গেল, তবু যদি পোলাডা বাঁইচা থাকতো, তাহলে দুঃখ থাকতো না। আমাগো সব শ্যাষ হইয়া গেল। এহন আমি কী যে করমু, কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার পোলার লাশটা যেন পাই। আর কোনো আবদার নাই।’

জয়ের কাকা গোবিন্দ তালুকদার বলেন, ‘আমার ছেলে প্রদীপ, ভাতিজা জয়সহ আমাগো বাড়ির চার ছেলে এই পথে ইতালিতে যায়। ওরা তিনজন কোনোমতে কষ্টে ইতালিতে পৌঁছালেও জয় পথেই মারা গেল। আমরা ছেলে প্রদীপ জয়ের মৃত্যুর সংবাদ আমাগো জানাইছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জামাল খান বড়াইলবাড়ি এলাকার সোনা মিয়া খানের ছেলে। ইতালিতে যাওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে জামাল সাত লাখ টাকা করে নেন। জয়ের মৃত্যুর খবরের পর থেকে তিনি এলাকায় নেই। দীর্ঘদিন ধরে জামাল মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদারীপুর সদর থানায় মানব পাচার আইনে একটি মামলা রয়েছে। এই মামলায় তিনি দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে বের হন। আবার শুরু করেন দালালি পেশা।

পেয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান লাভলু তালুকদার বলেন, ‘আমার এলাকায় কিছু দালাল আছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলাও আছে। বিচার না হওয়ায় দালাল চক্র ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে কিছু টাকা আর ভয়ভীতি দেখিয়ে দালালেরা মীমাংসা করে নেয়। এ কারণে অবৈধপথে বিদেশযাত্রা কোনো ভাবেই থামানো যাচ্ছে না।’
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘ঠাণ্ডার কারণে ভূমধ্যসাগরে মৃত সাত বাংলাদেশির মধ্যে ৫ জনের বাড়ি মাদারীপুর সদরের। তার পরিবারকে থানায় দালালদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে দালালের বিরুদ্ধে মামলা নেয়া হবে।’

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুদ্দিন গিয়াস বলেন, দূতাবাস থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের পরিচয় শনাক্ত করণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রেরণ করতে বলা হয়েছে। সে মোতাবেক আমরা নিহতদের পরিবারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিলে মরদেহ দেশে আনার সকল ব্যবস্থা সরকার গ্রহণ করবে।

সূত্রঃ মানবজমিন

 





সর্বশেষ সংবাদ

দেশ-বিদেশের টাটকা খবর আর অন্যান্য সংবাদপত্র পড়তে হলে CBNA24.com

সুন্দর সুন্দর ভিডিও দেখতে হলে প্লিজ আমাদের চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

আমাদের ফেসবুক পেজ   https://www.facebook.com/deshdiganta.cbna24 লাইক দিন এবং অভিমত জানান

সংবাদটি শেয়ার করুন