কানাডার সংবাদ ফিচার্ড

মনুমুখ বাজরাকোনার মেয়ে কানাডার পার্লামেন্টে

মনুমুখ বাজরাকোনার মেয়ে কানাডার পার্লামেন্টে

সোহেল আলম ।। ছোট্ট ডলি, বাবা রাজা মিয়া ও মা জবা বেগমের একমাত্র কন্যাসন্তান। বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার স্থানীয় মনুমুখ বাজরাকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষে মনুমুখ পিটি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে বাবা-মায়ের হাত ধরে তার ছোট ভাই মহসিন মিয়া সহ কানাডায় পাড়ি জমান। অল্প বয়সেই বাংলাদেশের অধ‍্যায় চুকিয়ে কানাডাতে শুরু করেন নতুন জীবন। গবেষণা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন সমাজ সেবক হিসেবে।

২০১২ সালে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডন থেকে উন্নয়ন, প্রশাসন ও পরিকল্পনা বিষয়ে স্নাতোকত্তর সম্পন্ন করে তিনি পড়ালেখার সমাপ্তি টেনে সিটি অব টরন্টোতে রিচার্স এনালিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন।

সমাজ সেবায় নিজেকে পুরোপুরি সম্পৃক্ত করতে তিনি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন প্রার্থনা করেন এবং প্রত্যাশানুযায়ী মনোনীত হন। মনোনয়ন প্রাপ্তির পর থেকেই নড়েচড়ে ওঠে কানাডায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাঁরা আশা করছিলেন ডলি জিতবেন, আর জিতলে তা হবে ইতিহাস।

সেই ইতিহাস ডলি গড়লেন। ২০১৮ সালে কানাডার অন্টারিও প্রদেশে প্রাদেশিক নির্বাচনে প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি প্রাদেশিক এমপি নির্বাচিত হলেন। ১৪ হাজার ১৫০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডলি বেগম। এই নির্বাচনে তিনি ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা শক্তিশালী লিবারেল এমপিপি-কে হারিয়ে ইতিহাসের উপরে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন, কারণ যে Scarborough Southwest ঐতিহ্যগতভাবে লিবারেলদের ঘাঁটি ছিল, সেই ঘাঁটিতেই আঘাত হেনে তিনি একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আসলেন।

ডলি এখানেই থেমে থাকেননি বরং তার প্রকৃত রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালের এই প্রাদেশিক এমপি নির্বাচনের মধ্য দিয়েই। তিনি শুধু স্কারবোরো সাউথ ওয়েস্টেই সীমাবদ্ধ থাকতে রাজি নন বরং পরপর তিনবার এই এলাকায় প্রতিনিধিত্ব করে এখন তিনি বাঙালিদের কন্ঠস্বর আরো দৃঢ় করতে ফেডারেল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী, আর তারই প্রেক্ষাপট তিনি NDP ছেড়ে লিবারেল পার্টিতে যোগ দেন। এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী তিনি লিবারেল পার্টির এমপি প্রার্থী হিসেবে আগামী ফেডারেল নির্বাচনে মনোনীত হন।

একটি জরিপে দেখা যায়, যেখানে কনজারভেটিভ ~২২% এবং NDP ~১৫% সমর্থন রয়েছে, সেখানে ডলি বেগম (লিবারেল) ~৫৭% সম্ভাব্য সমর্থন পেয়ে এগিয়ে আছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দল পরিবর্তনের পরেও অটুট রয়েছে, যা “candidate-centric politics”–এর একটি আদর্শ উদাহরণ আমরা দেখতে পাই।

এখানেই শেষ নয়, ডলি বেগমের রয়েছে মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা। যদি তিনি MP নির্বাচিত হন, তাহলে তিনি সম্ভবত Immigration, Women & Gender Equality, Social Development সম্ভাব্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রিত্ব পেতে পারেন। কারণ তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে diversity representation-এ অনেক বড় ফ্যাক্টর। তার এই advocacy ও তার background তাকে মন্ত্রিত্ব পেতে সাহায্য করবে।

ডলি বেগম ইতিমধ্যেই নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত immigrant voice ও Muslim নারী নেতা হিসেবে প্রমাণিত করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না তিনি সুযোগ পেলে ভবিষ্যৎও একজন successful national spokesperson ও minority representation হিসেবে মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন।

সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটি আজকে একজন প্রগতিশীল, শিক্ষিত এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ ও রাজনীতিবিদ। কানাডায় বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য গর্বের একটি নাম “ডলি বেগম”।

আগামী এপ্রিলের ৩, ৪, ৫ ও ৬ তারিখে আগাম ভোট শুরু হবে। এবং মূল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এপ্রিলের ১৩ তারিখে। উপরের আলোচনায় আমরা এতটুকু প্রতিয়মান হতে পারি যে ডলি বেগম নিঃসন্দেহে একজন উপযুক্ত প্রার্থী! আসুন, আরেকটা নতুন ইতিহাসের সূচনা লগ্নে আমরা সবাই একসাথে এগিয়ে আসি এবং প্রথমবারের মতো আমাদের একজন ডলি বেগমকে কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করি। যিনি আমার আপনার আমাদের কথা পার্লামেন্টের নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরবেন।

কে জানে হয়তো আমাদের এই মেয়েটি একদিন অসম্ভবকে সম্ভব করে দেশের কর্নধার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। আর আমরাই হতে পারি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একমাত্র চাবিকাঠি!

আমাদের এই স্বপ্নের যাত্রা শুরু হোক আগামী এপ্রিলের ৩-৬ তারিখের আগাম ভোটের মধ্য দিয়েই …

সোহেল আলম।

 

এসএস/সিএ
সংবাদটি শেয়ার করুন