মৌলিক উপস্থাপনায় উদীচীর বর্ষবরণ ।।। ড. সোয়েব সাঈদ
কানাডার সাংস্কৃতিক রাজধানী মন্ট্রিয়লে বাংলাদেশের সংগঠনগুলো বাঙ্গালি/বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় বরাবরই নিবেদিত প্রাণ। শীতের আড়মোড়া ভেঙ্গে তাপমাত্রা সেন্ট্রিগ্রেডে ডাবল ডিজিটে পৌঁছার ক্ষণে বাংলা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শুরু হয় তোড়জোড়।
মুলত বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানমালা শীতের বিষণ্ণতাকে কাটিয়ে কাঙ্ক্ষিত বসন্ত আর গ্রীষ্মের উৎসবমুখর দিনগুলোর আবাহনে প্রাণের স্পন্দন আর উৎসাহ উদ্দীপনার মুখবন্ধ রচনা করে। আমাদের অভিবাসী জীবনে নানা সংগঠনের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানমালা বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য আকর্ষণ।
কি দেশে কিংবা বিদেশে, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী বরাবরই বর্ণাঢ্য এবং মৌলিক আয়োজনের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে। উদীচীর বর্ষবরণ কেবল উৎসব নয়, বরং অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চেতনার এক সাংস্কৃতিক উপাদান।
মন্ট্রিয়লে গত ১০ই মে উদীচীর বর্ষবরণ (১৪৩৩) অনুষ্ঠানটি মৌলিকত্বের দিক থেকে ছিল একটি অসাধারণ উপস্থাপনা। আমি বার বার মৌলিক শব্দটি ব্যবহার করছি একটি পার্থক্য বোঝানোর জন্যে। প্রবাসে আমাদের সাংস্কৃতিক আয়োজনে মৌলিকত্ব কষ্টসাধ্য বলেই খুব দামী প্রত্যাশা।

মোবাইল কিংবা যান্ত্রিক আয়োজনে মাতোয়ারা অনুষ্ঠানের বিপরীতে প্রতিটি ব্যক্তি বিশেষের অনবদ্য পারফর্মেন্স আর কলাকুশলীদের দীর্ঘদিনের অনুশীলন, টিমওয়ার্কের ফলশ্রুতিতে বুদ্ধিবৃত্তিক আয়োজনের ফলাফলটা হচ্ছে এই মৌলিক আয়োজন যেখানে শিল্পীসত্তা নিজেকে উজার করে বিলিয়ে দেয় শিল্প সৃষ্টির আনন্দে।
এই আনন্দে নিবেদনটা এতোটাই আন্তরিক যে পেশাজীবনের ব্যস্ততা, বৈরি আবহাওয়া, সকল লজিস্টিক সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে বিকশিত হয়ে উঠে নিজের শিল্পীসত্তা।
মন্ট্রিয়লে রয়েছে উদীচীর শিল্পী আর কলাকুশলীর বিশাল দক্ষ বাহিনী যার সুতো ধরে আছেন জনপ্রিয় উপস্থাপিকা শর্মিলা ধর। এই বাহিনী কখনো কখনো তিন প্রজন্মে দৃশ্যমান এবং বহমান। শিল্পীদের অনেকেই বাংলাদেশে থাকাকালীন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ছিলেন।
কানাডায় পারিবারিক পেশাগত ব্যস্ততা, শিক্ষাঙ্গনে কিংবা ক্যারিয়ারের শুরুতে নিজেদের নানাবিধ ব্যস্ততাকে ছাপিয়ে বাংলা সংস্কৃতির শিল্পীসত্তায় উনাদের আন্তরিক নিবেদনে আমাদের অভিবাদন।
অনুষ্ঠানের পুরো অ্যালবাম দেখতে হলে
এবছরের (১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) উদীচীর বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের গ্রন্থনা ছিল চমৎকার। জাতীয় সঙ্গীতে সূচনা পর্ব। নাচে গানে আবৃতি গীতিনাট্যে মুখরিত টানা তিন ঘণ্টার অনুষ্ঠানে দর্শক বিরক্তি না ঘটিয়ে কিছু সাংগঠনিক কাজও সেরে নিলেন উপস্থাপক আর উপস্থাপিকা।
লালন, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ থেকে নৃত্যের তালে তালে ভুপেন হাজারিকার কয়েকটি গানের ছন্দময় উপস্থাপনা ছিল ভিন্ন আঙ্গিকে নতুনত্বে ভরপুর। সারেং বউ সিনেমার নীল দরিয়া গান পরিবেশনায় ধরণটি বেশ চমৎকৃত। গান আর আবৃত্তির হাইব্রিড পরিবেশনা ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় যুগের বৃন্দ আবৃত্তির শিল্পরূপের মত আরেকটি ভিন্নতর আবৃত্তি ঘরানা।
টপ নোট অর্থাৎ আয়োজনে স্তরে স্তরে পিরামিডের শীর্ষে ছোট অবয়বের অংশ থেকে বিচ্ছুরিত আভা পুরো পরিবেশকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। রবিঠাকুরের গীতিনাট্যের আগে নজরুল-প্রমীলার প্রেম কাহিনী ভিত্তিক মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেব খোঁপায় তারার ফুলের ধারাভাষ্যে নৃত্যময় পরিবেশনা ছিল এককথায় অপূর্ব একটি টপ নোট।
গান, কবিতা আর উপন্যাসের ব্যাপ্তি ছাড়িয়ে রবিঠাকুরের অনবদ্য সৃষ্টি উনার অনেকগুলো গীতিনাট্য। গান আর নৃত্যের তালে তালে গল্প বুননের এই অসাধারণ কর্মযজ্ঞ বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সম্পদ। কোন কোন গীতিনাট্যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের গভীর জীবনবোধ শ্রবণ আর দর্শনের নান্দনিক মিথস্ক্রিয়ায় অন্য রকম উচ্চতায় পৌঁছে যায়। চিত্রাঙ্গদা বহুল অভিনিত হলেও আমার প্রিয় গীতিনাট্য হচ্ছে শাপমোচন বিখ্যাত সব গানের জন্যে। এবার উদীচীর পরিবেশনায় ছিল রাজা দশরথ কর্তৃক অন্ধমুনির পুত্রবধের কাহিনী অবলম্বনে ১৮৮২ সালে রচিত কবিগুরুর দ্বিতীয় গীতিনাট্য ‘কালমৃগয়া’। সদ্য বিলেত ফেরত রবীন্দ্রনাথের রচিত এই গীতিনাট্যে বিলেতি সুরের প্রভাব স্পষ্ট।
দিনের পর দিন অনুশীলন করে গীতিনাট্যের মত জটিল সাংস্কৃতিক উপকরণ বিদেশের মঞ্চে মঞ্চায়নের পেছনে থাকে অকথ্য পরিশ্রম। পরিচালক আর কলাকুশলীরা প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন তাঁদের সর্বোচ্চটা দিয়ে। প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের এই গীতিনাট্যে সবার অসাধারণ অভিনয় দর্শকদের পিনপতন নীরবতায় মঞ্চমুখী করে রেখেছিল।
ধন্যবাদ উদীচীকে অনবদ্য সব আয়োজনে।
ছবিঃ সাংবাদিক সদেরা সুজন।
CBNA24 রকমারি সংবাদের সমাহার দেখতে হলে
আমাদের ফেসবুক পেজে ভিজিট করতে ক্লিক করুন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করতে পোস্ট করুন।



