ঈদুল আজহা উদযাপনে রোববার বিকাল থেকেই ঢাকা ছাড়তে শুরু করেন ঘরমুখো মানুষ। সাতদিনের লম্বা ছুটি পেয়ে অনেকেই গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। ইতিমধ্যে ফাঁকা হতে শুরু করেছে রাজধানী। তবে ফাঁকা ঢাকায় হর-হামেশায় ঘটছে চুরি-ছিনতাই। নাড়ির টানে বাড়ি ফিরলেও বাসাবাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় সাধারণ মানুষ।
এমনই একজন নাজমুল ইসলাম। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি বলেন, আমি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করি। এবার ঈদে বেশ কিছুদিন ছুটি পেয়েছি। তাই পরিবারের সকলকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি। ওখানে বাবা-মা আছেন। আত্মীয়-স্বজন আছেন। গরুও কেনা হয়েছে। তাই গ্রামের বাড়িতেই সবার সঙ্গে ঈদ করবো। অনেক মজা হবে। কিন্তু যে আকারে চুরি-ছিনতাই হচ্ছে। উপরন্তু আমি যেই বাসায় ভাড়া থাকি সেই বিল্ডিংয়ের দুই-একজন ছাড়া প্রায় সকলেই গ্রামে চলে গেছেন। তাই বাসা নিয়ে একটু বাড়তি চিন্তা হচ্ছে। কী হবে কিছুই বুঝতে পারছি না। আল্লাহর নামে সব রেখে যাচ্ছি। নাজমুলের সঙ্গে একই বাসে গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ যাচ্ছেন আরিফুর রহমান। তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি বলেন, নতুন বিয়ে করেছি। বিয়ের পর এটাই আমাদের প্রথম কোরবানি। তাই বাড়িতো যেতেই হবে।
কিন্তু বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যেই অবস্থা, দিনে দুপুরে সকলের সামনে মানুষকে রাস্তায় ফেলে গুলি করে মারছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেরা বাসায় থাকাকালীনই আতঙ্ক লাগে। আর এখন তো বাসা ফাঁকা। কেউ নেই। বিয়ের সোনা-গয়নাসহ বাসায় অনেক জিনিস রয়েছে। তাই দারোয়ানকে বারবার করে বলে এসেছি- বাসার দিকে খেয়াল রাখতে। কিছু বকশিসও দিয়েছি। কিন্তু এরপরও কী হবে তা ঈদের পরই এসে দেখতে পারবো।
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে নাটোরের উদ্দেশ্যে রওনা করা জুবায়ের হোসেন বলেন, প্রতিবার ট্রেনেই যাতায়াত করি। কিন্তু এবার ট্রেনের টিকিট পাইনি। তাই বাসে যাচ্ছি। তিনি বলেন, বাড়িতে সবাই মিলে ঈদ করলে অনেক ভালো লাগে কিন্তু মনের ভেতরে একটা চাপা ভয় থেকেই যায়। শুধু মনে হয় বাসার কি খবর? সব ঠিক আছে তো? তিনি বলেন, গত কোরবানি ঈদেও বাড়িতে গিয়েছিলাম। এসে শুনি আমাদের পাশের বাসার ৭ তলায় জানালার গ্রিল কেটে চোর ঢুকে সব নিয়ে গেছে। এখন ওই ঘটনা শুধু মনে পড়ছে। গতকাল কমলাপুর রেলস্টেশনে বাবা-মা’কে ট্রেনে উঠাতে আসা মো. আনিস বলেন, ছোট ভাই-বোন সকলে মিলে এবার বাড়িতে ঈদ করবে। তাই বাবা-মা’কে পৌঁছে দিতে এসেছিলাম। তবে এবার আর আমরা ঈদে বাড়িতে যাচ্ছি না। পরিস্থিতি ভালো না। ঢাকাতেই থাকবো। ফাঁকা ঢাকায় প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিবো। ঘুরবো। তবে ঢাকার ফাঁকা রাস্তাতেও আবার ভয় লাগে। কখন গলায় চাপাতি ধরে সব কেড়ে নেয়। চুরি-ডাকাতি তো আছেই। ফেসবুকে ঢুকলে দেখা যায় কীভাবে মানুষকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সব কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন একদিকে ব্যবস্থা নিলে আরেক দিকে বড় ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। সব মিলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো না।
তবে ঈদে ঢাকার নিরাপত্তার বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ- ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, আমাদের নিয়মিত ডিউটির পাশাপাশি ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে আরও কয়েকটি বিষয় মাথায় নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা শহরের ম্যাক্সিমাম এরিয়া আমাদের সিসিটিভির আওতায় থাকবে। পুলিশের নিয়ন্ত্রণে ঢাকা সিটিতে ২ হাজারের বেশি সিসি ক্যামেরা আছে। সেগুলোর মাধ্যমে আমরা ঢাকা সিটির গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো মনিটর করবো। কোথাও কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করলে সেখানে দ্রুত রেসপন্স করা হবে। এ ছাড়াও ঈদকেন্দ্রিক রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত ৭ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। ট্রাফিক পুলিশের ডেপ্লয়মেন্ট আলাদা হবে।
বিষয়টি নিয়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, আগের ঈদগুলোতে কী ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করেই এবারের ঈদনির্ভর কার্যক্রম ঢেলে সাজানো হচ্ছে। বাড়তি চেকপোস্টের পাশাপাশি আমাদের অতিরিক্ত টহলের ব্যবস্থা থাকছে। ছিনতাই-রাহাজানির এই কাজগুলো যেকোনো সময় হয়। সেই সময় নির্ধারণ করে আমাদের টহল কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি ঈদে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের ডগ স্কোয়াড, বোম্ব ডিসপোজাল টিম সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত থাকবে। এ ছাড়া র্যাব হেডকোয়ার্টার্সের সাইবার মনিটরিং টিম সার্বক্ষণিক চলমান থাকবে। সবাইকে সচেতন থাকার পাশাপাশি কোনো সন্দেহজনক তথ্য বা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা দেখলে দ্রুত নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা র্যাবকে জানানোর আহ্বানও জানান এই কর্মকর্তা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ঈদের আগে লাখো মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন। তাদের যাত্রা নিরাপদ ও যানজটমুক্ত রাখতে বাস, লঞ্চ টার্মিনাল ও রেলস্টেশনগুলোতে পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী বাস টার্মিনাল, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ও কমলাপুর রেলস্টেশনে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়া ঈদের জামাত এবং ঈদের ছুটিতে ফাঁকা হয়ে যাওয়া ঢাকার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নেয়া হয়েছে বহুমুখী পরিকল্পনা। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নিয়মিত সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ডিবিসহ সাদা পোশাকের পুলিশের বিশেষ টিম ২৪ ঘণ্টা মোতায়েন রয়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি অতিরিক্ত মোবাইল টিম, ফুট পেট্রোল ও চেকপোস্ট কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে।
সূত্র: মানবজমিন
এফএইচ/বিডি
CBNA24 রকমারি সংবাদের সমাহার দেখতে হলে
আমাদের ফেসবুক পেজে ভিজিট করতে ক্লিক করুন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করতে পোস্ট করুন।



