লেখালেখি

কোভিড-১৯ পেন্ডেমিক এবং বাংলাদেশ

কোভিড-১৯ পেন্ডেমিক এবং বাংলাদেশ দেশে সবচেয়ে বেশি

কোভিড-১৯ পেন্ডেমিক এবং বাংলাদেশ ।। কানাডায় করোনা সন্ত্রাসে বলা যায় আমরা প্রায় গৃহবন্দি। কানাডা নিয়ে যতটা উৎকণ্ঠা, অনেক বেশী উৎকণ্ঠিত জন্মভুমি বাংলাদেশকে নিয়ে, দেশে থাকা স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বিশেষ করে মুরব্বীদের নিয়ে। কানাডাতে সরকারের বলিষ্ঠ ব্যবস্থাপনা উৎকণ্ঠা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উৎকণ্ঠাগুলো অনেক বিক্ষিপ্ত; তৈলাক্ত রাজনীতি, কচ্ছপীয় আমলাতন্ত্র, ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, ডিসাইসিভ সিদ্ধান্তে অক্ষমতা আর ধর্মের নামে মূর্খতা। ফলে বেশ কিছু প্রশ্ন আর উদ্বেগ ব্যস্ত রেখেছে আমাদের মস্তিস্ক। আপাতত ১০টি পয়েন্টে কিছুটা বিশ্লেষণ করতে চাচ্ছিঃ

১।করোনা ধেয়ে আসছে এটি আমরা জেনে আসছি অনেকদিন যাবৎ। ডাঃ মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকদের মাধ্যমে জাতিকে জানান দিচ্ছেন। এই জানাজানির মধ্যে ভেতরে ভেতরে বিপদ সামলানোর প্রস্তুতিটা কি আদৌ পর্যাপ্ত ছিল? পত্রপত্রিকায় এখন দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পিপিই এর মত খুব বেসিক জরুরী চাহিদায় রেডট্যাপের কচ্ছপীয় গতির জন্যে তেমন অগ্রগতি ছিলনা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর আপদকালীন প্রস্তুতির কোন রূপরেখা নিয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ছিলনা, সবই ছিল ভাসা ভাসা। পরিকল্পনার চাইতে “আমরা সফল” এমন মানসিকতা বিপদ ডেকে আনে বৈকি।

২। আমাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো ছিল যেন “গ্রাম্য মেয়ের অবাদ সাঁতারের মত”। যখন টনক নড়ল, হাজার হাজার প্রবাসী মিশে গেছে মূল স্রোতে, অনেকটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠার মত বিপদ তৈরি করে। বিমানবন্দরে যাত্রীদের না ধরে এখন বাড়ি বাড়ি ছুটছে প্রশাসন ডাটাবেজবিহীন অসংখ্য ভুল আর অসম্পূর্ণ ঠিকানায়। ফলে বেঁড়ে গেছে কাজের চাপ। এই দায়িত্বহীনতায় সম্ভবত অনেক বড় ঝুঁকির মুখে পুরো বাংলাদেশ।

৩। সংক্রমণের এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক ধারাটা হচ্ছে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে ঝাঁপ দিয়ে মায়ের কোলে উঠে পড়া অর্থাৎ ফ্লাট গ্রাফ থেকে হঠাৎ করেই এক্সপোনেনশিয়াল ফেজের স্যুনামিটা শুরু হওয়া। চীন, ইরান, ইতালী একই দৃশ্য। সংক্রমণ  ১০০ জন পর্যন্ত পৌঁছে যে  সময়ে, অনেক কম সময়ে ১০০০ জনে পৌঁছে।  যারা আগে থেকেই সতর্ক হয়েছে, এক্সপোনেনশিয়াল ফেজটাকে নিয়ন্ত্রনে রেখে, স্বাস্থ্য সেবার উপর চাপটা কমিয়ে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। কানাডা ফ্লাট গ্রাফটা চেপে ধরার চেষ্টা করছে বটে কিন্তু সব চেষ্টা ছাপিয়ে গ্রাফটা যে ঊর্ধ্বমুখী, প্রায় হাজার খানেক। যারা সময় মত একশনে ছিলনা, মূল্য দিচ্ছে এখন, যেমন ইরান, স্পেন আর ইতালী।উক্রেনিয়ান ফ্লাইট ৭৫২; শোকার্ত কানাডা

৪।ইরান বিপদ ডেকে এনেছে নিজে থেকেই। টুরিস্ট প্রধান ধর্মীয় পবিত্র স্থানগুলো লকডাউন না করে। এখন প্রতিদিন মারা যাচ্ছে শত শত, তবুও ইরানীদের নওরোজে বাড়ী ফেরার ধাক্কাধাক্কি কমেনি। একই কালচার বাংলাদেশেও, আমরা তা দেখছি দোয়ার নামে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ। এর আয়োজকরা কাণ্ডজ্ঞানের পরীক্ষায় ফেল মেরে সৃষ্টিকর্তার কাছে মানুষ হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন। ধর্মীয় জমায়েতগুলো বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ ত্বরান্বিত করার অভিযোগে ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত হয়েছে,  নিন্দা কুড়িয়েছে মানবতা বিরোধী আচরণের জন্যে।

৫। উষ্ণতা আর আর্দ্রতার কারণে কি সাউথ এশিয়ায় সংক্রমণে ধীর গতি? দক্ষিণ এশিয়া আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মে-জুনের উচ্চ তাপমাত্রা আর আর্দ্রতার কারণে করোনার সংক্রমণে প্রভাব পড়বে বলে আমার বিশ্বাস। সামাজিক মাধ্যমে দেখলাম বাংলাদেশের এক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এক প্রেজেন্টশনে বলছেন  ৬৯.৯ তেও নয়, এই  ভাইরাসটি মরবে একেবারে ৭০ সেন্ট্রিগ্রেডে।  বিস্তারিত ডাটার অপ্রতুলতায়  বিষয়টি আমার কাছে আমাদের সংস্কৃতির স্বভাবসুলভ অতিকথন মনে হল। এখানে আরো  অনেক ফ্যাক্টর কাজ করে।  তাছাড়া ভাইরাস ধ্বংস হবার তাপমাত্রা আর এর বিস্তার লাভের অনুকূল তাপমাত্রার একটা পার্থক্য তো থাকবেই। করোনা গ্রুপের অনেক ভাইরাসের বিস্তার হ্রাসে উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব প্রমাণিত। সেই সব টেকনিক্যাল বিষয়ের দিকে যাচ্ছি  না।  করোনা বিস্তার  হ্রাসে  তাপমাত্রার প্রভাবের এই  হাইপোথেসিস যদি কোভিড-১৯ এর ভাইরাস SARS CoV-2 এর ক্ষেত্রে সত্য হয়, তবে ভাগ্য হয়তো আমাদের জন্যে ভাল, নতুবা সংকটটা  যে মোকাবিলা করতেই হবে।

৬। আইসোলেশন বা জনসমাবেশ থেকে দূরে থাকা সহ সরকারের আপদকালীন নির্দেশনা যারা মানছে না, তাঁরা আসলে তাদের বাসার মুরব্বি, প্রতিবেশী মুরব্বি, নিজের সংসার, অন্যের সংসার তছনছ করে দেবার মত ভয়াবহ অন্যায়ে ইন্ধন যোগাচ্ছেন। সরকারের নির্দেশনা মানতেই হবে, প্রয়োজনে বল প্রয়োগ। এটিই বৈশ্বিক বাস্তবতা। জিরো টলারেন্স।

৭। কিছু কুশিক্ষিত বা মূর্খ বকধার্মিকের কারণে করোনা ইস্যুতে ধর্মকে দাড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে ক্লাউনের ভূমিকায় মিথ্যা, বানানো তথ্য, অশ্লীল বক্তব্য আর সীমাহীন মূর্খতায়। ইউটিউব সহ সামাজিক মাধ্যেমে এরা ধর্মকে পণ্য বানিয়ে বিক্রি করে নিজেরা লাভবান  হচ্ছে। অনেক কিছু বলার আছে,  আপাতত বিরত থাকলাম।

৮। গণস্বাস্থ্যের ডঃ বিজন একজন কৃষিবিদ এবং মাইক্রোবায়োলজিস্ট, উনি যে ডিটেকশন কিট বের করেছেন ফেলো কৃষিবিদ এবং মাইক্রোবায়োলজিস্ট হিসেবে উনাকে অভিনন্দন। উনি এটি ব্লাড স্যাম্পল থেকে করবেন অর্থাৎ এন্টিজেনের নয়, সম্ভবত সেরোলজিক অর্থাৎ এন্টিবডি ডিটেকশন (???)। এই ক্ষেত্রে বিলম্বিত  ডিটেকশন নয়, রিয়েল টাইম ডিটেকশনে কতটা কার্যকরী এবং কতটা দ্রুততার সাথে করা যাবে, বিষয়টি খোলাসা করা উচিত। ক্রাইসিস সময়ে রোগ নির্ণয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির গুরুত্ব সীমাহীন। ডিটেকশন কিট নিয়ে টম এন্ড জেরী খেলার সুযোগ নেই।

৯।সরকারের তথ্য প্রকাশে জনগনের আস্থা থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার প্রধানমন্ত্রী নির্ভরযোগ্য তথ্যে  অর্থাৎ WHO বা সরকারি ব্রিফিং এ আস্থার বিষয়ে জোর দিয়েছেন। আমাদের  রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরকারি প্রেসনোট/ব্রিফিং এ কখনোই আস্থা তৈরি হয়নি। সংকটকালে এই অনাস্থা গুজব তৈরিতে উৎসাহিত করে। মিডিয়া আর সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্ব এখন ভীষণ দরকার।
১০।সংকটকালে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা, আমলারা প্রধানমন্ত্রীর নির্ভরযোগ্য ওয়ার্কফোর্স হিসেবে রেজিমেন্টেড ভাবে কাজ করবে এটাই দেখছি কানাডা সহ সারা বিশ্বে। মন্ত্রীদের নিজেদের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে অতিকথন, সারাক্ষণ নিজেদের গুণকীর্তন, টিম স্পিরিটটাকে ব্যাহত করে। পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রতিদিনই সরকার প্রধানের ব্রিফিং এর পর মন্ত্রী আমলারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত বলছেন, ফলে সরকার আর জনগণের মধ্যে ইন্টারেকশন থাকছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর রোজকার ব্রিফিং এবং তারপর মন্ত্রী, কর্মকর্তাদের বিস্তারিত  ব্রিফিং এবং কোয়ালিটি সাংবাদিকতা  এখন বৈশ্বিক রোলমডেল।

সামনে অনেক কঠিন পথ, শুধু রোগ সামলানো নয়, বিমান, পর্যটন সহ ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটে নিপতিত প্রতিষ্ঠান, কর্মহীন বিপুল মানুষের পুনর্বাসন বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমা বিশ্বে ইতিমধ্যেই হাজার হাজার মানুষ চাকুরী হারিয়েছে, সরকার জরুরী প্যাকেজে সাহায্য করছে। আমাদের অর্থনীতির সেই  সক্ষমতা নেই, ফলে  প্রবল চাপ তৈরি হবে। এই চাপ সামলানো বা বিপর্যয়রোধ করা আগামীতে দুরূহ এক পথ চলা। পণ্য উৎপাদন, পরিবহণ  আর সাপ্লাই চেইনে দীর্ঘায়িত  বিপর্যস্ততা সময়টাকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে।  সার্বিক প্রস্তুতিটা এখন এক নম্বর  অগ্রাধিকার, অনেকটা যুদ্ধকালীন প্রতিরক্ষা।

 



cbna24-7th-anniversary
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

18 + 14 =