ভ্রমণ

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের  | পর্ব ৪

পূর্ব প্রকাশের পর…

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের  | পর্ব ৪

বিকেলে হেনয় থেকে হো চি মিন শহরে যাবার বিমান। গাইড ঠিক সময়ে পৌঁছে দিল সেখানে। ভিয়েতনাম বিমানের ফ্লাইট। আমার প্রথম এই বিমানে ভ্রমন। বেশ বড় বিমান। দেখে ভালো লাগলো। প্রায় আড়াই ঘন্টার ফ্লাইট। ভালই কাটল। খাবার ভালো। বিকেলে এসে নামলাম “টান সন নাট” বিমান বন্দরে। আমার টিকেটে সায়গন লিখা ছিল। এটা এই শহরের আগের নাম। এই নামেই এখনো পরিচিত। বিশাল বিমান বন্দরটি।

বেশীক্ষণ লাগেনি বের হতে। গাইড বাইরের অপেক্ষা করছিল। এখানে কল করতে হয় নি। শহর বেশী দূরে নয়। লাগেজ তুলে রওনা দিলাম।এখানে বেশ গরম। যেতে যেতে কথা হচ্ছিল। বেশ ভালো ছিলেন ভদ্রলোক। হোটেলে পৌছতে পৌছতে বিকেল। নাম “লেদউ হোটেল”। তিন তারা হোটেল, কিন্তু হেনয় থেকে বড় ও নতুন। আসতে আসতে আগামী কালের প্রোগ্রাম নিয়ে কথা হচ্ছিল। সকালে “চু চি” টানেল যাবার কথা।তাঁকে বুঝিয়ে বললাম “ আমি আগের বার ওটা দেখেছি, এবার যাব না। সে ভাবে প্রোগ্রাম সাজিয়ে নিন। আমার ইন্টারেস্ট এর কথা জানালাম”। হোটেল এর চাবি বুঝিয়ে দিয়ে সে সন্ধ্যায় আসবে জানালো। রাতের খাবারের জন্য। চলে যাবার পর সোজা রুমে। ক্ষুদা লেগেছিল, তাই রুম সারভিসে কল করেছিলাম কিছু খেতে। পছন্দ সই একটি ভেজিটেবল ক্লাব সেন্ডউইচ আনতে বললাম।

হেনয়তে আমার খাবার নিয়ে সমস্যা হওয়াতে আমি সোহেলিকে জানিয়েছিলাম। সোহেলি আবার যোগাযোগ করে ঠিক করে দিয়েছে। তাই শেষ যাত্রায় খাবারের অসুবিধা হয় নি। সন্ধ্যায় নেমে এসে দেখি গাইড বসে আছে। বেরিয়ে পড়লাম। ও নিয়ে গেলো একটি ভারতীয় রেস্তোরায়। বেশ ছিমছাম। নাম বেনারস। মজার ব্যাপার হোল ওখানে পেয়ে গেলাম একবাঙ্গালি পাচক। পশ্চিম বঙ্গ থেকে এসেছে কয়েক বছর আগে। কথা হোল বাংলায়। আমি কি খাব জানালাম। বললাম আমি মাংস খাই না। মাছ চলবে। সবজি লাগবে ভারতীয় স্টাইলে। সাথে চাপাতি। গাইডকে বললাম জয়েন করতে। তার মত অর্ডার দিল গাইড। খেতে খেতে আগামিকালের প্রোগ্রাম ঠিক করে নিলাম। আগামিকাল যাব মেকং ডেল্টা। কারন চু চু টানেল দেখতে যাব না বলে। সারা দিনের প্রোগ্রাম।

মেকং ডেল্টা প্রায় ৪০০০ কিলোমিটার লম্বা, চীন, তিব্বত ও কম্বোডিয়া হয়ে ভিয়েতনামে এসে পড়েছে। ২৫০ কিলোমিটার ভিয়েতনামের। মেকং নদের উৎপত্তি হিমালয় থেকে। চীন, মায়ানমার, থাইল্যান্ড ও কমবোডিয়া হয়ে ভিয়েতনামের মাঝ দিয়ে দক্ষিন চীন সাগরে মিলেছে। প্রায় ১০০০ রকম প্রাণীর সমাহার এখানে, কিন্তু বাঘ নেই। ভিয়েতনামের প্রায় অর্ধেক মাছ এবং ধান এখান থেকে যায়। বিশাল অঞ্চল। প্রায় ১৫০০০ স্কয়ার মাইল। জনসংখ্যা প্রায় ২১ মিলিয়ন। ভিয়েতকং গেরিলারা এখান থেকে আমেরিকানদের সাথে একটি অসভ্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পুরো জায়গাটাই নদীমাতৃক, অনেক গ্রামে যেতে নৌকাই একমাত্র বাহন। পর্যটন শিল্পে মহিলারা ভ্রমণকারীদের নৌকা করে ঘুরে দেখায় মাংগ্রুভ ফরেস্ট। শহর থেকে দু ঘন্টার রাস্তা। তবে রাস্তা খুব সুন্দর। দু ধারে ধান ক্ষেত, নারিকেলের বাগান। রাস্তার ধারে ধারে গ্রাম্য বাজার। খুব সবুজ।

দুপুরের আগেই নদী বন্দরে চলে আসলাম। ছিমছাম জায়গা। লোকজন আছে কিন্তু হৈচৈ নেই। ঝকঝকে তকতকে সব জায়গা। গাড়ি পারকিং এ দেখলাম ড্রাইভাররা দু গাছের মাঝখানে কাপড় বেধে গুমুচ্ছে। বাংলাদেশের নদী বন্দরে এটা ভাবাই অসম্ভব। গাড়ি শুদ্ধ চুরি হয়ে যাবে। গাইড নৌকার টিকেট নিতে গেলো। আমি অপেক্ষা করছিলাম একটি উপহারের এর দোকানে। কিছুক্ষন পর ফিরে এলো গাইড। যাব নদীর ওপার।

মেকং নদ টা অনেক বড়।ওটাই দেখবার স্থান। দেখাবে কি ভাবে এখানকার মানুষ বাস করে, কি তাদের জীবিকা, কি পাওয়া যায় ওখানে। মেকং নদী পৃথিবীর ১০ তম দীর্ঘ নদী এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় নদী। চড়ায় প্রায় দেড় থেকে তিন কিলোমিটার। বড় বড় স্মাপান চলছে মালামাল নিয়ে। একটার পর একটা নৌকা আসছে। যাত্রী নিতে। কোন ধাক্কা ধাক্কি নেই। হৈ চৈ নেই। আমরা উঠে পড়লাম বজরায়। নদীর পানি খুব পরিষ্কার নয়। মনে হয় উর্বরা পলিমাটি বহন করে বলে। প্রচুর কচুরি পানা ভাসছে। একটু দূরে দেখা যাচ্ছিল বিশাল সেতু। নদীর কথা মাথায় রেখে তৈরি করা। বাতাসটা ভালো লাগছিল।

প্রায় ৩০ মিনিট পর ওপারে পৌঁছলাম। একটু হেটেই আমরা বসলাম একটি জায়গায়। খাবার এবং মধু তৈরির ডিসপ্লে। ওখানেই মৌচাক আছে। অবাক কান্ড, মৌমাছি গুলো আশেপাশে ঘুরছে, বোতলে বসছে, কিন্তু কাউকে কামড়াচ্ছে না। আমি প্রথমে একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তারা আমাদেরকে সরবত খেতে দিল। গ্রিন টি মধু দিয়ে। সাথে কিছু নাস্তা। একটি মেয়ে এসে দেখাল কি ভাবে তারা মধু তৈরি করে, ওয়াক্স কি ভাবে বানায়। কয়েকটা দোকান ছিল রকমারি স্থানীয় শিল্পের পশরা নিয়ে। কিছুক্ষন বসে গ্রামের পথ ঘরে হাঁটছি। দু ধারে হাতে বানানো জিনিষের সমাহার, বেশ রঙ্গিন, ফলের দোকান। কত রকম যে ফল, বাংলাদেশে এর অনেক গুলোই আছে, কিন্তু এদের মত এত টসটসে নয়। মাঝখানে দেখাবার জন্য রেখেছে এক বিরাট অজগর সাপ এবং বিশাল বড় তেলাপিয়া। এদের স্থানে ওদের বাস। ওরা জানালো এত বড় তেলাপিয়া ওরা খায় না, শরীরের জন্য ভালো নয়। সবচেয়ে বড় তেলাপিয়া খায় যা ৭০০ গ্রামের মত। ওদের বাড়ি ঘর দেখতে দেখতে হাটছি।জায়গা টা কৃষি ভিত্তিক বুঝা যায়। গ্রামের রাস্তা। রাস্তার দু ধারে ফলের বাগান।  প্রায় ২০ মিনিট হেটে আমরা এসে পৌঁছলাম একটি সাজানো খাবারের দোকানে। যেয়ে বসলাম একটি টেবিলে। বেশ কয়েক রকম ফল দিয়ে গেলো সামনে। প্রথমে একটি মেয়ে তাদের দেশী গান গেয়ে শুনাল।এরপর দেখলাম এক বেহালা বাদক। আপন মনে বাজাচ্ছে বেহালা। বেশ ভালো লাগলো। ঠিক ভারতের মত। ওখানে আরও দেখলাম কি ভাবে ওরা থাকে। কিছুক্ষন বসে, আবার হাটা গ্রামের সরু পথ ধরে। প্রায় ৩০ মিনিট হাটার পর ঢুকলাম একটি গ্রাম্য বাজারে, সব মেয়েরা দোকানে বসেছে। তাদের বাচ্ছারা গুমুচ্ছে কাপড় দিয়ে তৈরি দোলনায়। বেশ নাদুশ নুদুস। সবাই অনেকটা এক রকম। খারাপ ও শুকনো শরীর নিয়ে কাউকে চোখে পড়ে নি। পুরুষরা মাঠে অথবা মাছ ধরতে যায়। নৌকা পারাপার করে অনেকে। বাজারের পাশেই সরু নদী। তাকিয়ে দেখি অনেক নৌকা , ছোট ছোট, ভাসছে, মেয়েরা চালাচ্ছে ভ্রমকারিদের নিয়ে সরু নদীর বাকে বাকে। অনেকটা ভাসন্ত বাজারের মত। তাদের যাতায়াত নৌকা করেই। বাংলাদেশের মত ছোট নৌকা। বইঠা দিয়ে চালায়। কোন ইঞ্জিন নৌকা চালানো বারন। এটাই মেংরুভ ফরেস্ট। গাইড আমাকে নিয়ে একটি নৌকায় বসল। আকা বাকা সরু নদী, দু ধারে পানির ভিতর সবুজ গাছ। সেখানে একটি ফলের গাছ দেখাল, যা ওরা এখানে খায়। ফলের দোকানেও দেখেছি। ভিতরে আমাদের দেশের ডাবের ভিতরের শাঁসের মত। মিষ্টি। ছোট ছোট ছেলেরা দেখলাম পানিতে খেলছে।বুঝলাম নিরাপদ। সুন্দরবনে ভিতরের খালে এটা সম্ভব নয় বাঘ আর কুমিরের জন্য। সুন্দরবনেও এ রকম ডাব গাছ আছে, ফল ও দেখেছি, কিন্তু কেউ খায় না। সারি বেধে নদীর পাড়ে জন্মায়। বেশ অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম অপূর্ব এক পরিবেশে। মাঝে মাঝে নদীর ধারে বাড়ি দেখতে পেলাম। মনে হয় সরকারি। ভাবতে অবাক লাগে কি সুন্দরকরে পর্যটন শিল্প দাঁড় করিয়েছে এই অজ পাড়াগাঁয়ে, যাদের পেশা মাছ ধরা আর ফলের চাষ করা। বাংলাদেশের জেলেদের অবস্থা করুন, সুন্দরবনের কাছাকাছি গ্রামের অবস্থা সেই রকমই। সুন্দর বনে ত মধু হয়। ওখানে মধু চাষিও আছে। ওদের কে নিয়ে সরকার ভাবতে পারে। মডেল গ্রাম তৈরি করতে পারে। সুন্দরবনের বর্তমান আয়োজন খুবই অল্প ভ্রমণকারীদের জন্য। এমন কি বাঘ দেখার বা পর্যবেক্ষণ করার মত ভালো ব্যাবস্থা নেই। তবে হরিন দেখবার জায়গাটা ভালো। অনেকক্ষণ ধরে দেখা যায়। দল বেধে ওরা থাকে। গাইড পাতা পেড়ে দিলে ওরা দল বেধে আসে। আমার সময় পুলিশ সুন্দর আলী ছিল। কাদায় নেমে পাতা পেড়ে দিয়েছে। ওখানে দাঁড়িয়ে গান শুনিয়েছে। পরিবার ছাড়া থাকতে হয় জীবিকার জন্য এই সুন্দরবনে। তাদের জীবন টা বড়ই কঠিন। কিন্তু দেখে মনে হল সরকার তাদের বেতন খুব একটা ভালো দেয় না।

আমার দেখা ভিয়েতনাম |||| আবুল জাকের  | পর্ব ৪  লেখকঃ  পাস্ট ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল,  বাংলাদেশ।  মন্ট্রিয়ল, কানাডা।

লেখকের অন্যান্য ভ্রমণ কাহিনী….
আমার দেখা ভিয়েতনাম ১  |আমার দেখা ভিয়েতনাম ২  |আমার দেখা ভিয়েতনাম ৩
আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ১     আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ২     আমার ভূটান দেখা |||| আবুল জাকের  || পর্ব ৩
আপনার মন্তব্য লিখুন