দেশের সংবাদ ফিচার্ড

নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ

এপ্রিলে যোগ হতে পারে দেশের গ্রিডে

নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ

প্রায় দেড় বছর যাবৎ চলছিল নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আনার প্রক্রিয়া। প্রাথমকিভাবে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হলেও ভারতের গ্রিড ব্যবহারের পূর্ণ অনুমতি না পাওয়ায় এতদিন আটকে ছিল। তবে এবার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতের সম্মতি পাওয়া গেছে। এপ্রিলের শুরুতেই  হতে পারে এ সংক্রান্ত চুক্তি। সব ঠিকঠাক থাকলে এপ্রিলেই দেশের গ্রিডে যোগ হবে সর্বনিম্ন মূল্যের নেপালের এই জলবিদ্যুৎ। দেশটি হতে ৩ থেকে ৫ টাকা ইউনিট মূল্যের এই ৪০ মেগাওয়াটের পাশাপাশি আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনারও প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে ভুটান থেকেও জলবিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যা সম্প্রতি ভুটানের রাজার সফরের সময় নৈতিকভাবে সম্মত হয়েছে দুই দেশই। স্বল্পমূল্যে আনা এসব বিদ্যুৎ দেশের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দেশের ভেড়ামারায় অবস্থিত এইচভিডিসি সাবস্টেশনের অব্যবহৃত ক্যাপাসিটি ব্যবহার করে ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে আসবে নেপালের এই জলবিদ্যুৎ। এক্ষেত্রে নেপালের ইলেক্ট্রিক অথরিটি (এনইএ) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে মূল্য নির্ধারণ বিষয়ে আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের ভিভিএন এর সঙ্গে বিপিডিবির ট্রেডিং মার্জিং নির্ধারণও  চলমান রয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতের ক্রস বর্ডার ইলেকট্রিসিটি গাইডলাইন অনুসারে হুইলিং চার্জ যোগ হবে। যা খুব শীঘ্রই চূড়ান্ত হবে জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, এতদিন ভারতের সম্মতির অপেক্ষায় বিষয়টি আটকে ছিল। তবে এবার আর কোনো বাধা নেই। আশা করছি এপ্রিলেই দেশের গ্রিডে নেপালের জলবিদ্যুৎ যোগ হবে।

কয়লা, তেল, গ্যাসের উচ্চ খরচের বিদ্যুৎ থেকে বের হতে নানা বিকল্প উপায় খুঁজছে সরকার। নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নানা কৌশল গ্রহণে ব্যস্ত বিদ্যুৎ বিভাগ। ইতোমধ্যে দেশের অভ্যন্তরে জোর দেওয়া হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে। সব ঠিকঠাক থাকলে এবার দেশের গ্রিডে যোগ হতে যাচ্ছে জলবিদ্যুৎও। প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র নেপাল থেকে আনা এই ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম পড়বে মাত্র ৩ থেকে ৫ টাকা। এর বাইরেও দেশটি থেকে আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির জন্য শীঘ্রই চুক্তি হচ্ছে।

এসব তথ্য নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জনকণ্ঠকে বলেন, নেপাল থেকে ভারত হয়ে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানির সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন যেকোনো সময় আমদানি কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভা-ারী আমার কার্যালয়ে এসেছিলেন। তার সঙ্গে আমাদের চূড়ান্ত আলোচনা হয়েছে। এই ৪০ মেগাওয়াটের পাশাপাশি আরও ৫০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি এগিয়ে চলেছে। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হবে। এ কমিটি নেপালের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবসা কীভাবে আরও বাড়ানো যায় তা নিয়ে কাজ করবে।

জলবিদ্যুৎ তুলনামূলক সস্তা ও পরিবেশবান্ধব হলেও বাংলাদেশে এর উৎপাদন সম্ভব না হওয়ায়  নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে এ বিষয়ে সহযোগিতা বাড়াতে কাজ চালিয়ে আসছিল বর্তমান সরকার।  নেপাল থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করতে ভারতের একটি কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতাও হয়েছে। ভারতের জিএমআর এনার্জি নেপালে ’আপার কারনালি’ প্রকল্পের আওতায় ৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এই কেন্দ্র থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার জন্য ২০১৭ সালে জিএমআরইয়ের সঙ্গে ওই সমঝোতা স্মারকে সই করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। ভারত হয়ে আন্তঃদেশীয় গ্রিড লাইনের মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ আনার পরিকল্পনা করা হয়। তবে এর আগেই ওই বিদ্যুতের বাইরে দেশটি থেকে আরও ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হবে।

গত বছর নয়া দিল্লীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমলের একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে ভারতের সঞ্চালন লাইন ব্যবহারের সম্মতি সাপেক্ষে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ওইদিন বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই চুক্তির ফলে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। নেপালে উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ ভারত ছাড়াও বাংলাদেশে রপ্তানির জন্য তারা অনেক দিন ধরেই সচেষ্ট ছিলেন। অবশেষে তা বাস্তবায়িত হতে চলেছে জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এই চুক্তি বাস্তবায়নে আঞ্চলিক উপকার হচ্ছে। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিবেশী উপকৃত হলে সেটাই হয় প্রকৃত প্রতিবেশী বান্ধব নীতি। বিনয় কোয়াত্রা বলেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সহযোগিতা ভারত ও অন্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সামগ্রিকভাবে সবাই উপকৃত হয়। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল সবাই। আমাদের এই অঞ্চলে এর প্রাচুর্য রয়েছে। সুযোগের  সেই সদ্ব্যবহারে সচেষ্ট হওয়াই সহযোগিতার ধর্ম।

আর ভারতের এই বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের কারণেই নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি সম্ভব হচ্ছে জানিয়ে পাওয়ার সেলের মহাপরিচারক মোহাম্মদ হোসাইন জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা আশা করছি আগামী মাসের শুরুতেই ভারতের সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশের গ্রিডে যুক্ত হবে।

এতে করে আমাদের বিদ্যুৎ খাতে একটা বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন হবে বলে আশা করছি। মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এনে কি হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই বিদ্যুৎ আমরা অনেক কম দামে পাচ্ছি। যেখানে তেল, গ্যাস বা কয়লা দিয়ে প্রদি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত লাগে সেখানে এই বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে মাত্র ৩ থেকে ৫ টাকায়। তাই এটা থেকে যা পাওয়া যায় তাই আমাদের জন্য লাভ। এই বিদ্যুৎ ভারতের বহরমপুর এবং বাংলাদেশের ভেড়ামারা গ্রিডের মাধ্যমে আমদানি করবে বাংলাদেশ। তাহলে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি কি শীঘ্রই হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নেপালে বাস্তবায়িতব্য ভারতের জিএমআর গ্রুপের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়েও খুব শীঘ্রই চুক্তি সই হবে বলে আশা করছি। আগামী ৬ মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি সই হওয়ার বিষয়ে দু’দেশ সম্মতি দিয়েছে। তবে নেপাল থেকে যে জলবিদ্যুৎ আমদানি করা হবে তার দর এখনো চূড়ান্ত হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই দুই দেশের আলোচনার ভিত্তিতে দর নির্ধারণ করে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সই হবে। তবে দাম তুলনামূলক কম পড়বে। নেপালের সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত না থাকায় দেশটি থেকে বাংলাদেশে এই বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে ভারতীয় সঞ্চালন লাইন ব্যবহারের জন্য তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ চার্জ দিতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তিও সই হবে। কাটিহার-পার্বতীপুর-বরানগর ৭৬৫ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন যৌথ কোম্পানির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।

এর আগে ২০১৮ সালে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে নেপালের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে বাংলাদেশ। ওই সমঝোতার আওতায় নেপাল থেকে ভারত হয়ে জলবিদ্যুৎ আমদানি ছাড়াও  নেপালের বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের সরকারি বা বেসরকারি কোম্পানির বিনিয়োগের বিষয়গুলো রয়েছে। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে দেশটির জ্বালানি, পানি ও সেচ মন্ত্রণালয়ের এক অনুষ্ঠানে ওই সমঝোতা স্মারকে সই করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও নেপালের জ্বালামি মন্ত্রী বর্ষা মান পুন অনন্ত।

সরকারের মাস্টারপ্ল্যানে ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার একটি অংশ আসবে আমদানি করা বিদ্যুৎ থেকে জানিয়ে নসরুল হামিদ বলেন, নেপালে ৪০ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে বাংলাদেশের সরকারি বা বেসরকারি কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করে সে বিদ্যুৎ দেশে আনতে পারবে। এতে করে আমরা অল্প পয়সায় বিদ্যুৎ পাব।

এদিকে সম্প্রতি ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুকের সঙ্গে দেশটি থেকে জলবিদ্যুৎ আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুকের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রী জানান, ভুটান থেকে আনার জলবিদ্যুৎ বিষয়টি আলোচনা করেছি। আমরা ইতোমধ্যে নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আনার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। সেক্ষেত্রে ভারত আমাদের ফ্যাসিলেটেড করেছে। ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আনার ক্ষেত্রেও ভারত আমাদের ফ্যাসিলেটেড করবে। আমরা আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। তিবলেন, ভারতের ওপর দিয়েই তো লাইন আসতে হবে। ভারত কিন্তু নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানিতে ফ্যাসিলিটেড করেছে। সুতরাং ভুটান থেকে আমদানির ক্ষেত্রেও সহায়তা করবে এটাই স্বাভাবিক।

এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে কি না জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, ভুটানের জলবিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে দুই দেশের আলোচনা হলেও এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আগামী মাসে অর্থাৎ এপ্রিল মাসে বিদ্যুৎ বিভাগের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধির ভুটান সফরের কথা রয়েছে। সেই সফর থেকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

ভুটানের জলবিদ্যুৎ’ও কি নেপালের বিদ্যুতের মতো কম মূল্যে পাওয়া যাবে- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ অনেক কম। নেপালের বিদ্যুৎ আমরা ৩ থেকে ৫ টাকা দরে পাচ্ছি। ভুটানের ক্ষেত্রেও এই দরের তারতম্য হবে না।

সূত্র: জনকন্ঠ


CBNA24  রকমারি সংবাদের সমাহার দেখতে হলে
আমাদের ফেসবুক পেজে ভিজিট করতে ক্লিক করুন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করতে পোস্ট করুন।

সংবাদটি শেয়ার করুন