ফিচার্ড মত-মতান্তর

কেমন ছিলেন অতীত রাষ্ট্রপতিগন?

বাংলাদেশের-ভবিষ্যৎ-কি

কেমন ছিলেন অতীত রাষ্ট্রপতিগন?

শিতাংশু গুহ, ২৮শে জানুয়ারি ২০২৩, নিউইয়র্ক।। সিইসি জানিয়েছেন, ১৯শে ফেব্রুয়ারি ২০২৩, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। রাজনৈতিক মহলে কিছুটা উৎসাহ থাকলেও জনগণের মধ্যে এ নির্বাচন নিয়ে তেমন চাঞ্চল্য থাকেনা, কারণ নির্বাচনটি পরোক্ষ ভোটে। বাংলাদেশে একদা রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা ছিলো, তখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সবার উৎসাহ থাকতো, কারণ ভোট ছিলো প্রত্যক্ষ। দেশের প্রথম সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া নিহত হলে বিএনপি প্রার্থী বিচারপতি আবদুস সাত্তার ও সম্মিলিত বিরোধী দলীয় প্রার্থী ডঃ কামাল হোসেন-র মধ্যেকার নির্বাচনটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। সাত্তার জিতলেন, ক’দিন পর এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করলেন! পরবর্তীতে পল্টনে এক জনসভায় প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের একটি ভাষণ আমার মনে আছে, তিনি বলেছিলেন, ‘নির্বাচন হলো ডঃ কামাল ও সাত্তারের মধ্যে, জনগণ ভোট দিলো ডঃ কামালকে, জিতলেন সাত্তার, আর ক্ষমতায় বসলেন, হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। ঘটনা তা-ই ছিলো।

বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ক’জন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তাঁরা কারা এবং তাঁদের ভূমিকা জনগণের জানা দরকার। প্রথমেই বলে রাখা ভালো, বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সৌভাগ্যবান, পুরো দুই টার্ম নির্ঝঞ্ঝাট কাটিয়েছেন, কোন বিতর্কে জড়িয়ে যাননি। প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সকল আলোচনার উর্দ্ধে, উইকিপিডিয়া বলছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ১৭ই এপ্রিল ১৯৭১ থেকে ১২ই জানুয়ারি ১৯৭২, মোট ২৭০দিন্ (আওয়ামী লীগ) রাষ্ট্রপতি ছিলেন। দ্বিতীয় দফায় ২৫শে জানুয়ারি ১৯৭৫ থেকে ১৫ই আগষ্ট ১৯৭৫, (বাকশাল) ২০২দিন্, ক্যু ডেটা-য় নিহত হ’ন। উইকিপিডিয়া সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ১৭ই এপ্রিল ১৯৭১-১২ই জানুয়ারি ১৯৭২, মোট ২৭০ দিন (আওয়ামী লীগ) রাষ্ট্রপতি দেখিয়েছে। ঠিক একই সময়ে দু’জন রাষ্ট্রপতি, বিষয়টি বেমানান, বঙ্গবন্ধু’র অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধকালে ‘অস্থায়ী’ রাষ্ট্রপতি ছিলেন। উইকিপিডিয়া সংশোধনযোগ্য, ডিজিটাল বাংলাদেশের কর্মকর্তারা সংশোধনী আনতে পারেন।

আমরা যখন ঢাকায় সাংবাদিকতা করতাম, তখন আমাদের জীবনের অনেকটা সময় কার্ফু’র মধ্যে কেটেছে। কারণ তখন দেশে ঘনঘন সরকার বদল হতো। দৈনিক সংবাদের নিউজ ডেস্কে স্বপন দত্ত সবসময় ওয়ালেটে ৫শ’ টাকা গচ্ছিত রাখতেন, বলতেন, ‘ক্যু ফান্ড’। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ঠিক কতটি ক্যু হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান নেই, কিন্তু কার্ফু ও প্রায়শ: সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকায় স্বপন দত্তের মত অনেকেই ‘আপৎকালীন’ কিছু টাকা রেখে দিতেন। ওই সময়টায়, বিশেষত: বঙ্গবন্ধু ও জিয়া হত্যার পর মনে হতো বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন কি শুধু ‘হত্যাকাণ্ডের’ মধ্যে দিয়েই ঘটবে? এরশাদ বিনা-রক্তপাতে ক্ষমতাসীন হয়ে তা পাল্টে দেন। জিয়ার সন্তান বিএনপি, এরশাদের সন্তান জাতীয় পার্টি। উভয়ের জন্ম ক্যান্টনমেন্টে। এরশাদ গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হ’ন, এরপর দেশে মন্ত্রী-পরিষদ শাসিত সরকার চালু হয়, অন্তত: হত্যাযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের ধারা বন্ধ হয়।

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু’র সাথে প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট ছিলেন, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, ১২ই জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৭৩, (আওয়ামী লীগ), ১বছর ৩৪৬ দিন, তিনি ভালো সময় কাটিয়েছেন। এরপর আসেন, মোহাম্মদ মোহাম্মদুল্ল্যাহ, (আওয়ামী লীগ), ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৭৩ থেকে ২৭শে জানুয়ারি ১৯৭৪, এবং ২৭শে জানুয়ারি ১৯৭৪ থেকে ২৫শে জানুয়ারি ১৯৭৫, মোট ১বছর ৩২দিন্, তিনি হাসির পাত্র ছিলেন, তাঁকে রাষ্ট্রপতি নয়, বঙ্গবন্ধু’র সেক্রেটারী মনে হতো।

বঙ্গবন্ধু’র রক্তের ওপর দিয়ে বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মুশতাক আহমদ, ১৫ই আগষ্ট ১৯৭৫ থেকে ৬ই নভেম্বর ১৯৭৫, মোট ৮৩দিন্, প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তাকেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হিসাবে বলা হয়েছে, তবে তিনি শান্তিতে ছিলেন না? এরপর আসেন, ‘ঠুঁঠো জগন্নাথ’ আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, ৬ই নভেম্বর ১৯৭৫ থেকে ২১শে এপ্রিল ১৯৭৭, মোট ১বছর ১৬৬ দিন্। জিয়াউর রহমান এ সময়টায় নিজেকে গুছিয়ে আনেন, এবং সায়েমকে বিতাড়িত করে ২১শে এপ্রিল ১৯৭৭ থেকে ৩০শে মে ১৯৮১, মোট ৪বছর ৩৯দিন্ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন, তিনি নিহত হ’ন, উইকিপিডিয়া তাঁকে মিলিটারি/বিএনপি বলে বর্ণনা করেছে।

জিয়া হত্যার পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার-র কপাল খুলে, তিনি ৩০শে মে ১৯৮১ থেকে ২০শে নভেম্বর ১৯৮১ এবং পুনরায় ২০শে নভেম্বর ১৯8১ থেকে ২৪শে মার্চ ১৯৮২, মোট ২৯৮ দিন্ (বিএনপি) ক্ষমতায় ছিলেন, এবং তিনি অপসারিত হ’ন, এরশাদ তাঁকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন্, তিনি নীরবে প্রস্থান করেন। আহসানউদ্দিন চৌধুরী নামে অপর একজন অর্থর্ব নির্দলীয় হিসাবে ২৭শে মার্চ ১৯৮২ -১০ই ডিসেম্বর ১৯৮৩, মোট ১বছর ২৫৮দিন্ প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তিনিও অপসারিত হ’ন।

জিয়া এবং এরশাদ দু’জনেই বেছে বেছে বিচারপতিদের ধরে এনে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছেন এবং প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে বিদায় করে দিয়েছেন। এ কারণে ঐ সময়টায় বিচারপতিদের প্রতি মানুষের এক ধরণের বিরক্তি ছিলো। এরপর প্রেসিডেন্ট হ’ন হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ, তিনি ১১ই ডিসেম্বর ১৯৮৩-৬ই ডিসেম্বর ১৯৯০, মোট ৬বছর ৩৬০ দিন ক্ষমতায় ছিলেন, উইকিপিডিয়া তাকে মিলিটারি/ জাতীয় পার্টি হিসাবে বর্ণনা করে। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্যে শাহাবুদ্দিন আহমদ, ৮ই ডিসেম্বর ১৯৯০-১০ই অক্টবর ১৯৯১, মোট ৩০৮দিন, নির্দলীয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন, এসময় তাঁর ভূমিকা ভালো ছিলো। বিএনপি ক্ষমতায় এলে আবদুর রহমান বিশ্বাস, ১০ই অক্টবর ১৯৯১-৯ই অক্টবর ১৯৯৬, মোট ৫বছর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তখন তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু ছিলো, তিনি অন্যায়ভাবে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে বিএনপিকে ক্ষমতায় রাখতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হ’ন, যদিও সেনাবাহিনীর চমৎকার ভূমিকায় তাঁর সেই প্রচেষ্টা ভণ্ডল হয়ে যায়। এ সময় ১৯৯৬’র ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কথা কারো ভোলার কথা নয়! রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস এ অপকর্মে জড়িত ছিলেন। ১২দিনের মাথায় এই সরকারের পতন ঘটে, তত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, এবং জুন মাসে নির্বাচনে এদের পতন ঘটে, আওয়ামী লীগ ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসে।

শেখ হাসিনা বিশ্বাস করে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেন, তিনি ৯ই অক্টবর ১৯৯৬ থেকে ১৪ই নভেম্বর ২০০১, নির্দলীয় হিসাবে মোট ৫বছর ৩৬দিন্ প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়েই তিনি স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেন, এবং বিএনপি-কে ক্ষমতায় আনতে সবকিছু করেন, শেখ হাসিনা তাঁর ভুল বুঝতে পারেন, এবং নির্বাচনে পরাজিত হ’ন। বিএনপি’র বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ১৪ই নভেম্বর ২০০১-২১শে জুন ২০০২, ২১৯ দিন্ প্রেসিডেন্ট ছিলেন, এবং খালেদা জিয়ার রোষ থেকে বাঁচতে দৌড়ে পালাতে বাধ্য হ’ন। মোহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার, বিএনপি, ২১শে জুন ২০০২-৬ই সেপ্টেম্বর ২০০২, মোট ৭৭ দিন্ প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ভাইস চ্যাঞ্চেলর ইয়াজউদ্দিন আহমদ, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০০২-১২ই ফেব্রুয়ারি ২০০৯, মোট ৬বছর ১৫৯ দিন্ ক্ষমতায় ছিলেন, উইকিপিডিয়া তাকে নির্দলীয় বলেছে, যদিও তিনি খালেদা জিয়ার চাইতেও বড় বিএনপি ছিলেন, এবং তাঁর কথাবার্তা ও কর্মকান্ডে সম্ভবত: ভিসি’রা এখনো লজ্জ্বিত, তিনি রাষ্ট্রপতি পদটি কলংকিত করেছেন! ২০০৯-এ ভোটে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে জিল্লুর রহমান ১২ই-ফেব্রুয়ারি ২০০৯-২০শে মার্চ ২০১৩ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তিনি ক্ষমতাসীন অবস্থায় স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন, যা ইতিহাস, তিনি মোট ৪বছর ৩৬দিন্ প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অত:পর বর্তমান প্রেসিডেন্ট, মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ, ১৪ই মার্চ ২০১৩-২৪শে এপ্রিল ২০১৩; ২৪শে এপ্রিল ২০১৮ এবং ২৪শে এপ্রিল ২০১৮- চলছে, –.।

উইকিপিডিয়া মুশতাক, সায়েম ও সাত্তারকে ‘অপসারিত’ বলেছে। বদরুদ্দোজা চৌধুরীও অপসারিত?  একটা সময় ছিলো, বিচারপতিরা অনায়াসে রাষ্ট্রপতি হচ্ছিলেন, এবং তাঁদের ভূমিকা গৌরবের ছিলোনা। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ছিলেন ‘অথর্ব’, হয়তো এজন্যে জিয়া তাকে কাছে টেনে নেন, এবং এরশাদ তাঁকে বন্দুকের নলের জোরে বের করে দেন্ এবং তিনি সুবোধ বালকের মত কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফেরেন। ২০০৬-২০০৮ ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকার-কে রাজনীতিকরা গালাগালি দেন বটে কিন্তু সাধারণ মানুষ তাঁদের গালি দেননা, কারণ ওই দুই বছর মানুষ শান্তিতে ছিলো। একইভাবে জিয়া-এরশাদ যেভাবে সেনাবাহিনীর নামে বদনাম কুঁড়িয়েছেন, রাজনৈতিক শাসনামলে, বিশেষত: শেখ হাসিনা’র সময়ে তাঁদের ভাবমূর্তি এখন অনেক উজ্জ্বল। দেশে এখন উন্নয়নের জোয়ার বইছে, প্রশ্ন হচ্ছে, এবার কে হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি? উত্তর হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাঁকে চাইবেন, তিনিই হবেন আগামী রাষ্ট্রপতি। আবদুল হামিদ স্পীকার থেকে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, বর্তনাম স্পীকার শিরিন শারমিন-র কপাল খুললে তিনি হবেন প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি? আওয়ামী লীগ সভাপতিকে সবাই সভানেত্রী বলে থাকেন, শিরিন শারমিন রাষ্ট্রপতি হলে কি তাকে ‘রাষ্ট্রনেত্রী বলা হবে, নাকি শুধুই মিসেস প্রেসিডেন্ট? আবদুল হামিদকে কোন ক্রাইসিস মোকাবেলা করতে হয়নি, আশা করি পরবর্তী রাষ্ট্রপতিকেও তা করতে হবেনা, যদি ক্রাইসিস হয়, রাষ্ট্রপতিকে তা যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে, তাই ‘অনুগত’ অথচ দক্ষ-অভিজ্ঞ রাষ্ট্রপতি চাই। সর্বশেষ বলা যায়, রাষ্ট্রপতি নামগুলো সব একই রকমের, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে কিছুটা বৈচিত্র আনলে মন্দ কি?  [email protected];

 


সংবাদটি শেয়ার করুন