বিশ্ব

রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান: রুটি বিক্রেতা থেকে যুদ্ধংদেহী তুর্কী প্রেসিডেন্ট

রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান
চার আঙ্গুল তুলে বিশেষ কায়দায় শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান।

অত্যন্ত সাধারণ জীবন দিয়ে শুরু হলেও রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বর্তমানে এমন এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন যিনি আধুনিক তুরস্কের জনক মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের শাসনামলের পর অন্য যে কোন নেতার চেয়ে দেশটিকে সবচেয়ে বেশি বদলে দিয়েছেন।

তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে দেশটির অর্থনীতির অবনতি হয়েছে।

মুদ্রাস্ফীতির হার প্রায় ১২% এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে তুর্কী মুদ্রা লিরার মূল্য রেকর্ড পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে তুরস্কের এই অর্থনৈতিক দুর্দশা আরো বেশি খারাপ হয়েছে।

ইসলাম নিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে বাকযুদ্ধে জড়িয়ে বর্তমানে তিনি আলোচিত এক রাজনীতিকে পরিণত হয়েছেন।

মি. এরদোয়ান ২০০৩ সালের মার্চ মাসে যখন তুরস্কের নেতা নির্বাচিত হন, সেসময় এক ডলারে পাওয়া যেত ১ দশমিক ৬ লিরা। কিন্তু এখন এক ডলারের মূল্য আট লিরারও বেশি।

তার শাসনামলের শুরুর দিকে দেশে বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল, হয়েছিল ব্যাপক উন্নয়নও।

 

সামরিক পেশি

সাম্প্রতিক কালে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বহির্বিশ্বে তার শক্তি প্রদর্শনের জন্য খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন যা অনেক দেশকে ক্ষুব্ধ করেছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা জোট নেটোতে তুরস্কের মিত্র দেশগুলোও তুর্কী প্রেসিডেন্টের এই তৎপরতায় ক্ষুব্ধ।

লিবিয়া ও সিরিয়ার সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে তুরস্কের সামরিক বাহিনী। ককেশাস অঞ্চলে নাগর্নো-কারাবাখকে কেন্দ্র করে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে তাতেও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে তুরস্ক।

দুটো দেশের মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হওয়ার আগে তুরস্ক ও আজারবাইজান মিলে চালিয়েছে যৌথ মহড়া। যুদ্ধে আজারবাইজানকে সরাসরি সমর্থন দিয়ে অনেক দেশের সমালোচনার শিকার হয়েছে তুরস্ক।

আজারবাইজানিরা ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক-ভাবে তুরস্কের ঘনিষ্ঠ। এছাড়াও তেলসমৃদ্ধ এই দেশটিকে তেল রপ্তানির জন্য নির্ভর করতে হয় তুরস্কের ওপর। তাদের তেলের পাইপলাইন গেছে তুরস্কের ভেতর দিয়ে। কিন্তু রাশিয়া কয়েক শতাব্দী ধরে এই ককেশাস অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তার করে আসছে।

লিবিয়া ও সিরিয়া এবং সবশেষ ককেশাসে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা ও সেই লক্ষ্যে সামরিক তৎপরতার কারণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও তার বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।

পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সম্প্রতি গ্যাসের যে বিশাল ভাণ্ডারের খোঁজ পাওয়া গেছে সেটিও উঠে এসেছে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডায়।

সাইপ্রাসের সমুদ্র উপকূলে গ্যাসের সন্ধানে তুরস্কের তৎপরতায় সাইপ্রাস ও গ্রিসের সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এই দুটো দেশই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য। এবিষয়ে ই.ইউও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে সতর্ক করে দিয়েছে।

পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ অবজ্ঞা করে মি. এরদোয়ান উত্তর সাইপ্রাসে তুর্কী জাতীয়তাবাদী নেতাদের স্বঘোষিত সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তুরস্কই একমাত্র দেশ যারা এই স্বীকৃতি দিল।

সম্প্রতি ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ ফ্রান্সে ইসলামপন্থীদের দমনে তৎপর হলে এবং ইসলাম ধর্মের সমালোচনা করলে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ফরাসি প্রেসিডেন্টের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার কথা বলেছেন। ফরাসী পণ্য বয়কটেরও ডাক দিয়েছেন তিনি। এতো ফ্রান্স ক্ষুব্ধ হয়েছে।

সমালোচকরা বলছেন, বহু আগে থেকেই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বেশ কিছু ইসলামপন্থী এজেন্ডা রয়েছে। মিশরে নিষিদ্ধ-ঘোষিত রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে রয়েছে তার আদর্শগত মিল।

মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা-কর্মীদের মতো তিনিও চার আঙ্গুল তুলে স্যালুট দেওয়ার জন্য পরিচিত। এভাবে শুভেচ্ছা জানানোকে বলা হয় ‘রাবা’।

এবছরের জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক একটি ভবন হাইয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন। এতে বহু খ্রিস্টান ও পশ্চিমা দেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে।

দেড় হাজার বছর আগে এই ভবনটি নির্মিত হয়েছিল গির্জা হিসেবে। অটোমান টার্কের আমলে এটিকে মসজিদে পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু পরে কামাল আতাতুর্ক ভবনটিকে যাদুঘরে পরিণত করেন, যা ধর্মনিরপেক্ষ নতুন তুরস্কের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

 

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের নেতৃত্বে ইসলামপন্থী দল জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা একেপি ২০১৯ সালে সারা দেশের স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে জয়লাভ করে। কিন্তু বড় তিনটি শহর- ইস্তাম্বুল, রাজধানী আঙ্কারা এবং ইজমিরে তার দল পরাজিত হয়।

ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচনে বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির কাছে একেপির পরাজয় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের জন্য ছিল একটি বড় ধরনের ধাক্কা। কেননা মি. এরদোয়ান ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত এই চার বছর এই শহরের মেয়র ছিলেন। আর এই শহরেই তার দুর্গের পতন ঘটেছে।

মূলত তুরস্কের রক্ষণশীল গ্রামীণ এলাকা এবং আনাতোলিয়ার ছোট ছোট শহরগুলোই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দল একেপির ভোটের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

 

যেখান থেকে শুরু

মুসলিম মূল্যবোধের পক্ষে সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার কারণে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বহু তুর্কীর কাছে জনপ্রিয়।
যেখান থেকে শুরু

এই ইস্তাম্বুল শহরেই মি. এরদোয়ানের উত্থানের শুরু। বর্তমানে এই শহরের জনসংখ্যা দেড় কোটিরও বেশি।

তার প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার যাত্রার শুরুতে এই শহর ছাড়াও রাজধানী আঙ্কারায় স্থানীয় নির্বাচনে সাফল্য অর্জন করে তারই দল একেপি। এর পর দলটি ধীরে ধীরে তুরস্কের প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে মি. এরদোয়ান ২০০৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট হন ২০১৪ সালের অগাস্ট মাসে। তিনি তুরস্কের দ্বাদশ প্রেসিডেন্ট।

২০১৮ সালের জুন মাসে প্রথম রাউন্ড নির্বাচনে ব্যাপক ভোটে বিজয়ী হয়ে মি. এরদোয়ান দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

এর আগের বছর ২০১৭ সালে সংবিধান সংশোধনের ওপর অনুষ্ঠিত বিতর্কিত এক গণভোটেও তিনি জয়ী হন। ফলে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন তিনি।

ফলে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের হাতে যেসব ক্ষমতা চলে আসে:

  • সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট সরাসরি নিয়োগের ক্ষমতা
  • দেশটির বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের ক্ষমতা
  • জরুরি অবস্থা জারি করার ক্ষমতা

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নও আরো জোরালো ভাবে শুরু হয়।

 

অভ্যুত্থান থেকে প্রাণে রক্ষা

তার বিরোধীদের ওপর এই দমন অভিযান শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর।

সেসময় সামরিক বাহিনীর দিক থেকে তার ক্ষমতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। তার জবাবে শুরু হয় – পাইকারি গ্রেফতার ও নাম মাত্র বিচার।

পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনীতিকরাসহ মানবাধিকার গ্রুপগুলো প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের এই দমন-পীড়ন অভিযানের তীব্র সমালোচনা করে।

তুরস্কে ১৯৬০ সালে এবং এর পরে বিভিন্ন সময়ে আরো তিনবার সামরিক বাহিনী দেশটির রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে। তুর্কী সামরিক বাহিনী তুরস্ককে কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবেই দেখতে আগ্রহী।

সামরিক বাহিনীর এই হস্তক্ষেপের ঘটনায় জাতীয়তাবাদীদের প্রভাব “ডিপ স্টেট” বা রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দল এই সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা খর্ব করতে সর্বদাই সচেষ্ট ছিল।

২০১৬ সালের ওই ব্যর্থ অভ্যুত্থানে কমপক্ষে ২৪০ জন নিহত হয়।

সেসময় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান মারমারিসের একটি অবকাশ কেন্দ্রে ছুটি কাটাচ্ছিলেন এবং বলা হয় যে তিনি অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন।

অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তিনি তার নিয়ন্ত্রণ পুন-প্রতিষ্ঠা করে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তখন জাতীয় টেলিভিশনের পর্দায় হাজির হন এবং ইস্তাম্বুলে তার সমর্থকদের বিশাল সমাবেশে যোগ দান করেন যেখানে তিনি নিজেকে “প্রধান অধিনায়ক” হিসেবে ঘোষণা করেন।

তবে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ওপর এই ঘটনায় কী ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল সেটা বোঝা যায় এর পরের একটি ঘটনায়। বিদ্রোহী সৈন্যদের গুলিতে নিহত তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর জানাজায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি জনসমক্ষে কেঁদে ফেলেন।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সমালোচকরা তাকে একজন স্বৈরাচারী হিসেবে অভিহিত করেন। তারা বলেন ভিন্নমতের প্রতি মি. এরদোয়ান মোটেও সহনশীল নন, যারাই তার বিরোধিতা করেন তাদেরকে তিনি কঠোর হস্তে দমন করেন।

তাদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী শিশু থেকে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় জয়ী সাবেক মিস তুর্কীও রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে অপমান করার অভিযোগে ওই শিশুকে গ্রেফতার করা হয়েছিল আর প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করে একটি কবিতা শেয়ার করায় সাবেক মিস তুর্কীকেও পড়তে হয়েছিল বড় ধরনের বিপদে।

সমালোচনা দমন

মি. এরদোয়ান জাতীয় পর্যায়ে ক্ষমতায় আসেন ২০০৩ সালে। সরাসরি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের অগাস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে ১১ বছর তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

তুরস্কে একসময় প্রেসিডেন্টের পদটি আলঙ্কারিক হলেও এখন তিনিই সর্বসময় ক্ষমতার অধিকারী। ফলে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করা এখন কঠিন। কেউ তার বিরোধিতা কিম্বা সমালোচনা করলে তাকে পড়তে হচ্ছে রোষানলে।

ভিন্নমতের ওপর এই দমন-পীড়নের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। এর জের ধরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছে। পরিণতিতে স্থবির হয়ে গেছে এই জোটে তুরস্কের যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াও।

ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর ৫০ হাজারেরও বেশি লোক গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সৈনিক, সাংবাদিক, আইনজীবী, পুলিশ অফিসার, শিক্ষক এবং কুর্দী রাজনীতিক।

কর্তৃপক্ষ দেড় লাখেরও বেশি সরকারি কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে। এছাড়াও তার দল একেপির বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও অভিযোগ উঠেছে।

ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার জন্য প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনকে দায়ী করেছেন। মি. এরদোয়ানের একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন এই ধর্মীয় নেতা।

সারা বিশ্বেই মি. গুলেনের সমর্থকদের একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয়। তার মধ্যে রয়েছে গুলেন স্কুল। এছাড়াও বহু তুর্কীর জীবনে তার হিজমেত আন্দোলনেরও বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে।

তবে ফেতুল্লাহ গুলেন একেপি সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান পরিকল্পনার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

মি. এরদোয়ানের কর্তৃত্ববাদী শাসন শুধু তুরস্কের সীমান্তের ভেতরেই সীমিত নেই। তার দেহরক্ষীরা যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের হয়রানি করেছে, টেলিভিশনে মি. এরদোয়ানের সমালোচনা করায় জার্মানিতে একজন জার্মান কমেডিয়ানের বিরুদ্ধেও তদন্ত করা হয়েছে।

 

ক্ষমতার উত্থান

রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের জন্ম ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। একজন উপকূল-রক্ষীর সন্তান তিনি। বেড়ে উঠেছেন তুরস্কের কৃষ্ণ সাগর সমুদ্র উপকূলে।

তার বয়স যখন ১৩, তার পিতা সন্তানদের আরো ভালো লেখাপড়া করানোর স্বপ্ন নিয়ে ইস্তাম্বুলে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

কিশোর এরদোয়ান বাড়তি কিছু অর্থ রোজগারের জন্য রাস্তায় লেবুর শরবত এবং রুটি বিক্রি করতেন।

ইসলামিক স্কুলে লেখাপড়া করেছেন তিনি। পরে ইস্তাম্বুলের মারমারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। একজন পেশাদার ফুটবলারও ছিলেন তিনি।

 

মুসলিম পুনর্জাগরণ

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ইসলামি মূল্যবোধ আরোপের চেষ্টা করছেন- সমালোচকদের এই অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, ধর্মনিরেপক্ষতার বিষয়ে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তিনি বলেছেন, তুর্কীরা যাতে আরো খোলামেলাভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে পারেন, সেই অধিকারকে তিনি সমর্থন করেন।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের অনেক সমর্থক তাকে “সুলতান” নামে ভূষিত করেছেন যা অটোমান সাম্রাজ্যের সময়ে ব্যবহার করা হতো।

তুরস্কের রাষ্ট্রীয় অফিসগুলোতে নারীদের হিজাব পরার ওপর কয়েক দশক ধরে যে নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল সেটা ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী এবং পুলিশ নতুন এই আইনের বাইরে ছিল।

এছাড়াও মি. এরদোয়ান ব্যভিচারকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, চালু করার চেষ্টা করেনে “অ্যালকোহলমুক্ত এলাকা”- সমালোচকরা বলছেন, এসবই এরদোয়ানের ইসলামপন্থী আকাঙ্ক্ষাকে প্রমাণ করে।

 

ব্যক্তিগত জীবন

একটি বিলাসবহুল প্রাসাদে থাকেন তুর্কী প্রেসিডেন্ট। সমালোচকরা বলেন, এটাও তার উচ্চাকাঙ্ক্ষী মনোভাবের প্রতীক। বিশাল আয়তনের এলাকায় প্রচুর অর্থ খরচ করে এই ভবন নির্মাণের কারণেও তিনি সমালোচিত হয়েছেন।

চার সন্তানের পিতা মি. এরদোয়ান বলেছেন, কোন মুসলিম পরিবারের জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়। ২০১৬ সালের মে মাসে তিনি একবার বলেছিলেন, “আমরা আমাদের বংশধরের সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি করবো।”

মাতৃত্বের উচ্চ প্রশংসা করেন মি. এরদোয়ান। নারীবাদীদের সমালোচনা করেন। তবে তিনি বলেন, নারী ও পুরুষকে সমানভাবে দেখা উচিত নয়।

 

টাইম লাইন

১৯৪৫: রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের জন্ম

১৯৭০-১৯৮০: ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোতে সক্রিয় ছিলেন, নেকমেতিন এরবাকান্স ওয়েলফেয়ার পার্টির সদস্য

১৯৯৪-১৯৯৮: ইস্তাম্বুলের মেয়র ছিলেন, সামরিক কর্মকর্তাদের ক্ষমতা দখলের আগ পর্যন্ত, ওয়েলফেয়ার পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়

১৯৯৯: জনসমক্ষে জাতীয়তাবাদী একটি কবিতা পড়ার জন্য তার চার মাসের জেল হয়েছিল। কবিতার কয়েকটি লাইন ছিল এরকম: “মসজিদগুলো আমাদের ব্যারাক, গম্বুজগুলো আমাদের হেলমেট, মিনারগুলো আমাদের বেয়নেট এবং বিশ্বাস হলো আমাদের সৈন্য।”

অগাস্ট ২০০১: আব্দুল্লাহ গুলকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামপন্থী দল একেপি

২০০২-২০০৩: পার্লামেন্ট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে একেপি, এরদোয়ান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন

জুন ২০১৩: ইস্তাম্বুলে গেজি পার্কে ভবন নির্মাণের একটি প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রতিবাদকারীদের ওপর আক্রমণ করে নিরাপত্তা বাহিনী

ডিসেম্বর ২০১৩: এরদোয়ান সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তিনজন মন্ত্রীর সন্তানদের গ্রেফতার করা হয়, এরদোয়ান এজন্য গুলেনপন্থীদের দায়ী করেন।

অগাস্ট ২০১৪: তুরস্কে এই প্রথমবারের মতো সরাসরি ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মি. এরদোয়ান

জুলাই ২০১৬: সামরিক বাহিনীর ভেতরে ব্যর্থ অভ্যুত্থান থেকে রক্ষা পান

এপ্রিল ২০১৭: প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এক গণভোটে জয়ী হন।

সূত্রঃ বিবিসি

বাঅ/এমএ


সর্বশেষ সংবাদ

দেশ-বিদেশের টাটকা খবর আর অন্যান্য সংবাদপত্র পড়তে হলে CBNA24.com

সুন্দর সুন্দর ভিডিও দেখতে হলে প্লিজ আমাদের চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

সংবাদটি শেয়ার করুন