আমেরিকার অ্যারিজোনায় প্রবাস জীবনের এক নিদারুণ এবং পৈশাচিক সমাপ্তি: এক রাউন্ড গুলিতেই ধ্বংস হলো ১৮ বছরের সাজানো সংসার
ভয়াবহ সেই রোববারের বর্ণনা এবং একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু
আমেরিকার ফিনিক্স শহরের আকাশ সেদিন অন্যদিনের মতোই পরিষ্কার ছিল, কিন্তু লাভীন এলাকার একটি বাড়ির ভেতরে ঘনীভূত হচ্ছিল এক পৈশাচিক অন্ধকার। ২০০৬ সালে মাগুরা থেকে একবুক আশা নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিলেন আবুল আহসান হাবিব এবং তাঁর স্ত্রী সৈয়দা সোহেলী আক্তার।
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তিলে তিলে গড়া তাঁদের সেই সংসারটি মাত্র ৫ মিনিটের এক উন্মত্ততায় রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে, তা হয়তো প্রতিবেশী বা তাঁদের দুই সন্তান কল্পনাও করতে পারেনি। এটি কেবল একটি মৃত্যু নয়, এটি প্রবাস জীবনের সেই রূঢ় বাস্তবতা যা বড় বড় সংবাদ মাধ্যমগুলো প্রায়ই এড়িয়ে যায়। আজ সেই ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত এবং নেপথ্যের করুণ কাহিনী বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
কেন ঘটেছিল এই নৃশংস ঘটনা?
এই ট্র্যাজেডির মূলে ছিল এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা এবং অর্থনৈতিক ধস। হাবিব এবং সোহেলী অ্যারিজোনায় বেশ সফলভাবেই জীবন শুরু করেছিলেন। হাবিবের একটি রেস্তোরাঁ ছিল এবং সোহেলী একটি বিউটি পার্লার চালাতেন।
কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির কালো থাবা তাঁদের সাজানো জীবনে প্রথম আঘাত হানে। লকডাউনের সময় ব্যবসা দুটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। এই বেকারত্ব এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা হাবিবের মনে এক গভীর হতাশা এবং ক্ষোভের জন্ম দেয়।
দীর্ঘদিনের সফল মানুষটি যখন হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়েন, তখন তাঁর মানসিক ভারসাম্য বিচলিত হতে শুরু করে। সেই অর্থনৈতিক চাপের সাথে যুক্ত হয়েছিল প্রবাস জীবনের একাকীত্ব এবং পারিবারিক কলহ। এই বিষাক্ত মিশ্রণই শেষ পর্যন্ত হাবিবকে একজন খুনি এবং আত্মঘাতীতে পরিণত করেছিল।
সেই অভিশপ্ত রোববারের রক্তক্ষয়ী ৫ মিনিট
ঘটনাটি ঘটেছিল গত রবিবার সকালে। সকাল থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র ঝগড়া চলছিল। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সোহেলী ভয়ে ৯১১-এ ফোন করে পুলিশের সাহায্য চান। পুলিশ আসার খবর পেয়ে হাবিব দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পুলিশ এসে সোহেলীকে আশ্বস্ত করে এবং তাঁকে পরামর্শ দেয় যে, পরদিন সোমবার যেন তিনি আদালতে গিয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে একটি সুরক্ষা আদেশ বা প্রটেকশন অর্ডার গ্রহণ করেন।
পুলিশ চলে যাওয়ার পর এক ধরণের ছদ্ম-শান্তি বিরাজ করছিল বাড়িতে।
সোহেলীর বড় ছেলে হাসিব তখন বাড়িতেই ছিলেন। ঘরোয়া কিছু খাবার কেনার জন্য তিনি পাশের দোকানে যান। বাড়ি তখন একদম নির্জন। ঠিক এই সুযোগটিই নিয়েছিলেন হাবিব। তিনি দূর থেকে ওত পেতে দেখছিলেন কখন পুলিশ এবং ছেলে বাড়ি থেকে বের হয়। হাসিব দোকান থেকে ফেরার আগেই হাবিব গোপনে পেছনের দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়েন।
সোহেলী যখন দেখতে পান তাঁর স্বামী ফিরে এসেছেন, তখন তিনি ভয়ে সিঁটিয়ে যান। তিনি দ্রুত তাঁর ছেলেকে ফোন করে চিৎকার করে বলতে থাকেন যে তাঁর বাবা ফিরে এসেছে। হাসিব তখন পাগলের মতো বাড়ির দিকে দৌড়াতে থাকেন। একই সাথে সোহেলী দ্বিতীয়বার ৯১১ অপারেটরকে ফোন করেন। পুলিশ অপারেটর যখন সোহেলীর সাথে ফোনে কথা বলছিলেন, ঠিক তখনই ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসে পর পর দুটি কান ফাটানো গুলির শব্দ। এরপর সব নিস্তব্ধ। পুলিশ কয়েক মিনিটের মধ্যে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে।
বীভৎস দৃশ্য এবং শেষ পরিণতি
পুলিশ ভেতরে ঢুকে শয়নকক্ষে সোহেলী এবং হাবিবের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে। পুরো ঘর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। ৫২ বছর বয়সী হাবিবের লাশের পাশেই পড়ে ছিল তাঁর ব্যবহৃত সেই পিস্তলটি। তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, হাবিব প্রথমে সোহেলীকে লক্ষ্য করে গুলি করেন এবং পরে সেই একই অস্ত্র নিজের মাথায় ঠেকিয়ে ট্রিগার চাপেন। সন্তানদের চোখের সামনেই তাঁদের আশ্রয়দাতা বাবা এবং গর্ভধারিণী মা চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে চলে যান।
যে সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা দেশ ছেড়েছিলেন, সেই দুই সন্তানকে বিদেশের মাটিতে আজ সম্পূর্ণ একা এবং এতিম করে দিয়ে গেলেন তাঁরা। ২০০৬ সালে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক স্বপ্ন নিয়ে, ২০ বছর পর সেই স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটল একটি মর্মান্তিক খুনের মামলার ফাইল হয়ে। ময়নাতদন্ত শেষে দুই ছেলেকে তাঁদের বাবা-মাকে ফিনিক্সের মাটিতেই দাফন করতে হয়েছে।
কেন এই ঘটনাটি পুনরায় সামনে আনা জরুরি?
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ সংবাদ নয়; এটি প্রবাসে থাকা হাজার হাজার মানুষের মানসিক লড়াইয়ের এক প্রতিচ্ছবি। বড় বড় মিডিয়াগুলো প্রায়ই প্রবাসীদের এই ধরণের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা, মানসিক বিষণ্ণতা এবং পারিবারিক সহিংসতার বিষয়গুলো খুব সংক্ষিপ্তভাবে প্রচার করে। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকা কারণগুলো নিয়ে আলোচনা হয় না। প্রবাস জীবনের উজ্জ্বল আলোর নিচে যে অন্ধকার থাকে, যেখানে অভাব আর মানসিক চাপ মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে দেয়, সেই সত্যটি তুলে ধরার জন্যই এই ঘটনাটি আজ পুনরায় বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হলো।
প্রবাসী অধিকার এবং মানসিক সচেতনতা
বিদেশে যাওয়ার পর প্রবাসীরা কেবল টাকা উপার্জনের যন্ত্রে পরিণত হন। সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে তাঁরা প্রায়ই তাঁদের মানসিক সমস্যাগুলো লুকিয়ে রাখেন। হাবিব এবং সোহেলীর এই পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানসিক স্বাস্থ্য কোনো অবহেলার বিষয় নয়। পরিবারের ভেতরে অশান্তি বা বিষণ্ণতা থাকলে তা সময়মতো শেয়ার করা এবং প্রয়োজনে আইনি বা চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রবাসে আমরা একে অপরের পরিপূরক হতে না পারলে, একদিন হয়তো আরও অনেক হাসিবকে তাঁর বাবা-মায়ের রক্তভেজা লাশ দেখতে হবে।
নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন, প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে আসুন এবং মনে রাখবেন—বিদেশের মাটিতে আপনি একা নন। এই ধরণের করুণ মৃত্যু আর কোনো পরিবারে যেন না ঘটে, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য। প্রবাসীদের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এবং প্রতিটি লড়াইয়ের পাশে থাকাই আমাদের অঙ্গীকার।



