জাতিসংঘ পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য ফিচার্ড

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর আহ্বান

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর আহ্বান

কুনমিং, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬—২০২৬ সালের অক্টোবরে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের অংশ হিসেবে জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের পক্ষগুলোর ১৭তম সম্মেলন (কপ–১৭) সামনে রেখে চীনের কুনমিংয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

৭ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই সংলাপে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিসহ আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সম্প্রদায়, নারী, যুবসমাজ এবং অন্যান্য অংশীজনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। কুনমিং-মন্ট্রিয়ল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক বা বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামো বাস্তবায়নে বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি কীভাবে দূর করা যায়, তা নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেন। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সময়সীমা বর্তমানে অর্ধেক পথে পৌঁছেছে।

সংলাপে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন চীনের পরিবেশ ও প্রতিবেশবিষয়ক মন্ত্রী এবং জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের ১৫তম সম্মেলনের সভাপতি হুয়াং রানচিউ এবং কানাডার প্রকৃতিবিষয়ক সেক্রেটারি অব স্টেট ও মন্ট্রিয়লে অনুষ্ঠিত কপ–১৫-এর স্বাগতিক প্রতিনিধি নাতালি প্রোভো।

সংলাপটির উদ্দেশ্য ছিল কুনমিং-মন্ট্রিয়ল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে তৈরি প্রথম বৈশ্বিক খসড়া প্রতিবেদন ‘স্টেট অব বায়োডাইভার্সিটি অ্যাকশন’-এ চিহ্নিত ঘাটতিগুলো মোকাবিলার উপায় বের করা। প্রতিবেদনটি আগামী মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হবে।

জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের নির্বাহী সচিব অ্যাস্ট্রিড শোমেকার বলেন, “সমষ্টিগতভাবে আমরা প্রয়োজনীয় মাত্রা ও গতিতে এগোতে পারছি না। ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সমাজের সর্বস্তরে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যাপক উদ্যোগ প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, “স্টেট অব বায়োডাইভার্সিটি অ্যাকশন প্রতিবেদনে চিহ্নিত ঘাটতিগুলো সরকার এবং তাদের অংশীজনেরা কীভাবে মোকাবিলা করতে পারে, তা নির্ধারণের একটি সময়োপযোগী সুযোগ সৃষ্টি করেছে এই সংলাপ। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার পথও এতে উঠে এসেছে।”

কুনমিং সংলাপের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন ২০২৬ সালের জাতিসংঘ জীববৈচিত্র্য সম্মেলনে সমষ্টিগত অগ্রগতির প্রথম বৈশ্বিক পর্যালোচনায় কাজে লাগানো হবে। কপ–১৭-সহ এই সম্মেলন আগামী ১৯ থেকে ৩০ অক্টোবর ইয়েরেভানে অনুষ্ঠিত হবে।

আলোচনায় অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে কয়েকটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধকতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • জাতীয় পর্যায়ের কার্যক্রমের পরিধি ও আওতার ঘাটতি;
  • বাস্তবায়নের ধীরগতি;
  • অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের অন্যান্য উপায়ের অভাব;
  • সরকার ও সমাজের সর্বস্তরের সমন্বিত অংশগ্রহণের ঘাটতি;
  • অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও জ্ঞানের অভাব।

সভা শেষে যৌথ সভাপতিদের সারসংক্ষেপে বলা হয়, এসব ঘাটতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের ঘাটতি পূরণকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পরোক্ষ কারণ মোকাবিলাসংক্রান্ত যেসব লক্ষ্যমাত্রা পিছিয়ে রয়েছে, সেগুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা গড়ে তোলা এবং সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরে কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে কিছু ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। এ জন্য জীববৈচিত্র্য কাঠামোর অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি এর ধারণা ও পরিভাষাগুলো সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় উপস্থাপন করতে হবে।

সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা স্বীকার করেন, কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সহায়তা সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রয়োজনীয় মাত্রায় এখনো সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।

অংশগ্রহণকারীদের মতে, জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর ভর্তুকি সংস্কার, জীববৈচিত্র্য রক্ষার অর্থনৈতিক সুফল তুলে ধরা এবং তিনটি রিও কনভেনশনসহ অন্যান্য বহুপক্ষীয় পরিবেশ চুক্তির মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে কার্যক্রমের কার্যকারিতা বাড়বে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সরকারি-বেসরকারি অর্থায়নের সুযোগও সম্প্রসারিত হবে।

চীনের পরিবেশ ও প্রতিবেশবিষয়ক মন্ত্রী এবং কুনমিং সংলাপের যৌথ সভাপতি হুয়াং রানচিউ বলেন, “বাস্তবায়নের গুরুতর চ্যালেঞ্জ ও বড় ধরনের ঘাটতির মুখে সব পক্ষকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে। দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জরুরি মনোভাব এবং কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে কুনমিং-মন্ট্রিয়ল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর লক্ষ্যমাত্রাগুলো জাতীয় নীতি ও বাস্তব কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করতে হবে।”

তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানান।

কানাডার প্রকৃতিবিষয়ক সেক্রেটারি অব স্টেট এবং সংলাপের যৌথ সভাপতি নাতালি প্রোভো বলেন, “প্রকৃতি রক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—দুটিই প্রয়োজন। একটি অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করলে কী অর্জন করা সম্ভব, কুনমিং-মন্ট্রিয়ল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক তার প্রমাণ।”

তিনি বলেন, “এই কাঠামোর সফল বাস্তবায়নের জন্য আমাদের অব্যাহত সহযোগিতা অপরিহার্য। কুনমিং সংলাপে অংশগ্রহণকারীদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা প্রকৃতি রক্ষায় আমাদের অভিন্ন উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিরই প্রমাণ।”

কুনমিং সংলাপের ফলাফল কপ–১৭-এর বৈশ্বিক পর্যালোচনাকে প্রভাবিত করবে। সেখানে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো সম্মিলিত অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরবর্তী পথ নির্ধারণ করবে। ‘প্রকৃতির জন্য পদক্ষেপ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত কপ–১৭ বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে।

আর্মেনিয়ার পরিবেশমন্ত্রী ও কপ–১৭-এর মনোনীত সভাপতি হামবার্ডজুম মাতেভোসিয়ান বলেন, “কপ–১৭-এর আসন্ন সভাপতি হিসেবে আমরা চাই ইয়েরেভান এমন একটি স্থান হয়ে উঠুক, যেখানে বিদ্যমান ঘাটতি নিয়ে সততার সঙ্গে আলোচনা করার পাশাপাশি সমাধানের ক্ষেত্রেও সমান উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখানো হবে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই বৈশ্বিক পর্যালোচনা বাস্তবায়নকে শক্তিশালী করবে, কার্যক্রমকে গতিশীল করবে এবং দেশ ও সব অংশীজনকে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেবে। কুনমিং থেকে ইয়েরেভান পর্যন্ত যাত্রা তাই প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের পথে যাত্রা।”

এসএস/সিএ
সংবাদটি শেয়ার করুন