বাংলাদেশি নারী পাচারের দায়ে কানাডায় দুই বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী দোষী সাব্যস্ত
সাত সপ্তাহের বিচার শেষে আদালতের রায়; একজন তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগেও দোষী, সাজা ঘোষণার অপেক্ষায় দুজনই কারাগারে।
বাংলাদেশ থেকে কানাডায় আসা এক নারীকে মানবপাচার ও শ্রমশোষণের ঘটনায় সাসকাচুয়ানের দুই বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন কানাডার একটি আদালত। সাত সপ্তাহব্যাপী বিচার শেষে শুক্রবার (৭ আগস্ট) এ রায় দেওয়া হয়।
সাসকাচুয়ান প্রাদেশিক আদালতের বিচারক মিগুয়েল মার্টিনেজ ৫৫ বছর বয়সী সোহেল হায়দার এবং ৪৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ মাসুমকে মানবপাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। একই মামলায় মাসুমকে ওই নারীর ওপর তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
আদালতের প্রকাশনা নিষেধাজ্ঞার কারণে ভুক্তভোগী নারীর পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। আদালতের নথিতে তাঁকে এস.কে. (S.K.) নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, অভিযুক্ত দুজনের অপরাধের বিষয়ে তাঁর কোনো যুক্তিসংগত সন্দেহ নেই। রায়ের পর দুজনকেই হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। সাজা ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কারাগারেই থাকবেন।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরি করতেন ভুক্তভোগী
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, এস.কে. ২০২২ সালের আগস্টে ভিজিটর ভিসায় বাংলাদেশ থেকে কানাডায় আসেন। প্রথমে তিনি টরন্টোতে অবস্থান করেন।
উচ্চশিক্ষিত এই নারীর দুটি মাস্টার্স ডিগ্রি রয়েছে। কানাডায় আসার আগে তিনি প্রায় ১৯ বছর বাংলাদেশ সরকারের অধীনে চাকরি করেছিলেন।
সাসকাচুয়ানের গাল লেকে এম্পায়ার ডাইনার (Empire Diner) পরিচালনাকারী সোহেল হায়দার একটি চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তাঁকে টরন্টো থেকে রেজাইনা এবং সেখান থেকে গাল লেকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সাসকাচুয়ানে পৌঁছানোর পর ওই নারীকে তাঁর পরিচিতজন ও সহায়তার নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। ওয়ার্ক পারমিট করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং এ-সংক্রান্ত ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো।
আদালত শুনেছেন, প্রথমদিকে তাঁকে একটি এয়ার ম্যাট্রেসে ঘুমাতে দেওয়া হতো। পরে মেঝেতে একটি ফোমের ম্যাট্রেস দেওয়া হয়।
তিনি মূলত ওয়েট্রেস হিসেবে দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করতেন। দীর্ঘ কর্মদিবসে তাঁকে মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যাহ্নভোজের বিরতি দেওয়া হতো বলে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।
ওয়ার্ক পারমিটের জন্য ১০ থেকে ১২ হাজার ডলার
ভুক্তভোগী আদালতে জানান, ওয়ার্ক পারমিটের বিষয়ে তাঁকে বারবার অপেক্ষা করতে বলা হতো। একপর্যায়ে তাঁকে জানানো হয়, কানাডায় ওয়ার্ক পারমিট পেতে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিতে হবে।
পরে সেই অর্থের পরিমাণ ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার ডলার নির্ধারণ করা হয় এবং প্রতি মাসে এক হাজার ডলার করে তা পরিশোধ করতে বলা হয়েছিল বলে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে হায়দার তাঁকে মোহাম্মদ মাসুমের সঙ্গে টিসডেলের লিটল টাউন রেস্টুরেন্টে (Little Town Restaurant) কাজ করার ব্যবস্থা করেন।
ওই নারী সেখানে যেতে না চেয়ে রেজাইনা অথবা সাসকাটুনে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, যাতে তিনি টরন্টো কিংবা বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারেন। নিজের কাজের পাওনা অর্থও তিনি দাবি করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সাক্ষ্য অনুযায়ী, হায়দার তাঁকে জানান যে তাঁর কাছে দেওয়ার মতো অর্থ নেই।
পরে মাসুম তাঁকে এলরোজে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁর ওয়ার্ক পারমিটটি ববস ডাইনার (Bob’s Diner), এলরোজের সঙ্গে যুক্ত।
২০২৩ সালে আরসিএমপির তদন্ত ও গ্রেপ্তার
ঘটনাটি ২০২৩ সালে প্রকাশ্যে আসে। সে সময় রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (RCMP) সাসকাচুয়ানের গাল লেক, এলরোজ ও টিসডেলের কয়েকটি রেস্তোরাঁয় জোরপূর্বক শ্রম করানোর অভিযোগে তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের সময় পুলিশ জানায়, ওই বাংলাদেশি নারীকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা হতো। কাজের বাইরে তাঁকে পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত, অসমাপ্ত কংক্রিটের একটি বেসমেন্টে রাখা হয়েছিল, যেখানে আলোর ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত সীমিত।
পুলিশের অভিযোগ ছিল, তাঁর ওয়ার্ক পারমিটকে কেন্দ্র করে ভয়ভীতি ও হুমকির মাধ্যমে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো।
২০২৩ সালের জুনে মোহাম্মদ মাসুম ও সোহেল হায়দারকে গ্রেপ্তার করে আরসিএমপি। দুজনের বিরুদ্ধেই মানবপাচারের অভিযোগ আনা হয়। মাসুমের বিরুদ্ধে অতিরিক্তভাবে যৌন নিপীড়নের অভিযোগও আনা হয়েছিল।
তদন্তের সময় তৃতীয় একজনকে আটক করা হলেও পরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সে সময় আরসিএমপি বলেছিল, মানবপাচার কেবল বড় শহরেই ঘটে না। ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকাতেও জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে মানবপাচারের ঘটনা ঘটতে পারে।
আরসিএমপির সুপারিনটেনডেন্ট গ্লেন চার্চ বলেছিলেন, এই তদন্ত দেখিয়েছে যে মানবপাচার বিভিন্ন রূপে ঘটতে পারে এবং জোরপূর্বক শ্রমও মানবপাচারের একটি রূপ।
সাজা ঘোষণার অপেক্ষায়
সাত সপ্তাহ ধরে সাক্ষ্য ও প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে বিচারক আসামিপক্ষের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগগুলো যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে আদালত সিদ্ধান্ত দেন।
এরপর সোহেল হায়দার ও মোহাম্মদ মাসুমকে মানবপাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মোহাম্মদ মাসুমকে একই সঙ্গে তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগেও দোষী সাব্যস্ত করেন আদালত।
রায় ঘোষণার পর দুজনকেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এখন তাঁদের বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণার অপেক্ষা।
এই মামলা কানাডায় নতুন অভিবাসী ও বিদেশি কর্মীদের শ্রমশোষণ এবং মানবপাচারের ঝুঁকির বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে চাকরি, বাসস্থান ও অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্রের জন্য নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরা কীভাবে শোষণের শিকার হতে পারেন, মামলাটি তার একটি গুরুতর উদাহরণ।
CBNA24 রকমারি সংবাদের সমাহার দেখতে হলে
আমাদের ফেসবুক পেজে ভিজিট করতে ক্লিক করুন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করতে পোস্ট করুন।



