প্রবাসের সংবাদ ফিচার্ড

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৫১ ভাগ আবেদন প্রত্যাখ্যান

australian-visa

চলতি বছরে রেকর্ড হারে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত এবং নেপালের শিক্ষার্থীরা।

অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থী ভিসার ওপর কঠোর ব্যবস্থা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে ৩২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি গত ২০ বছরের মধ্যে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সর্বোচ্চ । এতে শিক্ষার্থীরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু অস্থায়ী ভিসার জন্য দেশের অভ্যন্তর থেকে আবেদন নিষিদ্ধ করে ‘ভিসা-হপিং’-এর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিক শিক্ষা অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শিল্প। যা অর্থনীতিতে বিলিয়ন ডলার অবদান রাখে এবং হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করে। কিন্তু ভিসা প্রত্যাখ্যানের ক্রমবর্ধমান হার বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকারী শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানা যায়, গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত ভুয়া আবেদনকারী এবং জাল নথিপত্রের বিরুদ্ধে সরকার কর্তৃক কঠোর পদক্ষেপের কারণে ৪৭.২ শতাংশ থেকে ৫১ শতাংশ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদন বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এ বছরের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশকে এভিডেন্স লেভেল ৩ (উচ্চ-ঝুঁকি) রাখা হয়েছে। ফলে যাচাই-বাছাই আরও কঠোর হয়েছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে। এবং গত ফেব্রুয়ারিতে অফশোর শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বাংলাদের ৫১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এবং ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ৪০ শতাংশ, নেপালী শিক্ষার্থীদের ৬০.২ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার শিক্ষার্থীদের ৩৮ শতাংশ ও ভুটানের শিক্ষার্থীদের ৩৬ শতাংশ ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার ছিল। এবং চীনের শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৩ শতাংশে অপরিবর্তিত ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে নির্দিষ্ট কিছু দেশের জন্য অফশোর আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি ছিল। যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৬৫% পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

জিহাদ নামের এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, সম্প্রতি তার ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে অস্ট্রেলিয়া। মেলবোর্নের ড্যানফোর্ড উচ্চ শিক্ষা ইনস্টিটিউটে সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন একটি যথোপযুক্ত ভিসা আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন এবং কাগজপত্র সব ঠিকঠাক ছিল। প্রাথমিক টিউশন ফি জমা দিয়েছিলেন। অন্যান্য তহবিলের ব্যবস্থাও করেছিলেন এবং ইংরেজি ভাষার শর্তও পূরণ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পথটি বেশ সহজ হবে মনে হচ্ছিল তার কাছে। সব কিছু জমা দেয়ার কিছুদিন পরেই ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। স্বরাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক জারি করা এই সিদ্ধান্তে তিনি ‘প্রকৃত অস্থায়ী প্রবেশকারী’ হওয়ার শর্ত পূরণ করেছেন কি না সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তার ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান হওয়ায় অনেক টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা ও উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে বলে তিনি জানান।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের এখন কঠোর শর্তাবলীর সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে ৩ মাস পুরোনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট, জীবনযাত্রার খরচের জন্য ন্যূনতম ২৯,৭১০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার তহবিল এবং শিক্ষার্থী হিসেবে প্রকৃত উদ্দেশ্যের জোরালো প্রমাণ। ভিসার জন্য ইংরেজি ভাষায় উচ্চতর স্কোরের প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে দেশটির সরকার। পাশাপাশি আরও কঠোর শর্তাবলী কার্যকর করা হয়েছে। যার মূল লক্ষ্য হলো আবেদনকারী সত্যিই পড়াশোনা করতে ইচ্ছুক কিনা তা যাচাই করা। ভিসা পরিবর্তনের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ভিজিটর এবং টেম্পোরারি গ্র্যাজুয়েট ভিসাধারীদের অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরে থাকাকালীন স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক ‘অগ্রাধিকার’ ভিসা প্রক্রিয়াকরণ মর্যাদা প্রাপ্ত ছাত্র ভিসার সংখ্যা – যা একটি কার্যকর বার্ষিক সীমা – ২০২৬ সালের প্রথম নাগাদ ২৭০,০০০ থেকে বাড়িয়ে ২৯৫,০০০ করেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভিসা ফি বাড়িয়ে ২,০০০ ডলার করেছে সরকার। ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝুঁকি রেটিংও কমিয়েছে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি ঝুঁকি রেটিং কম হয় তার শিক্ষার্থীদের ভিসা তত দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ করা হয়ে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষার্থীরা অস্ট্রেলিয়ার আইন মেনে চলার বিষয়টি।

এখানে সঠিক তথ্য প্রদান এবং আর্থিক নথিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ভিসা-সংক্রান্ত জালিয়াতি ও ভুয়া পরামর্শদাতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। বাংলাদেশের কিছু কিছু এজেন্সির কারণে শিক্ষার্থীদের বর্তমান এ অবস্থা। বাংলাদেশ সরকার যদি এ প্রতারক এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে তাহলে শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে পারবে। তা না হলে যত সময় যাবে তত কঠোর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। গত বছরও বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় অনেক শিক্ষার্থী এসেছে। অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে এই সুযোগ ধরে রাখতে হলে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও নিয়ম মেনে চলা জরুরি বলে মত দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
অস্ট্রেলিয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৫,৬৫,৬০১ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছেন।

যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ভর্তির ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ কম। কোর্স শুরুর সংখ্যা (৩৭,৯৮৮) চার শতাংশ কমেছে। উচ্চশিক্ষা খাতে ভর্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে ৫৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা পাঁচটি উৎস দেশ থেকে এসেছেন। এদের মধ্যে চীনের ২৩শতাংশ, ভারতের ১৭ শতাংশ, নেপালের ৯ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৪ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী রয়েছে। উচ্চশিক্ষায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্ষেত্র প্রথমে ম্যানেজমেন্ট ও কমার্স। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইনফরমেশন টেকনোলজি। অন্যদিকে বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে (ভেট) ছিল ম্যানেজমেন্ট ও কমার্স। আর্কিটেকচার ও বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন রয়েছে।

ইউনিভার্সিটিজ অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী লিউক শিহি দ্য অস্ট্রেলিয়ান ফিনান্সিয়াল রিভিউকে বলেছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শিক্ষার্থী ভিসার নীতিতে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের গতি পুরো খাত জুড়েই রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ধীরে চলা নীতির পরিবর্তে স্থিতিশীল ও অনুমানযোগ্য নীতি প্রয়োজন। যাতে তারা শিক্ষার্থী এবং দেশের জন্য তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। একদিকে অভিবাসন কমানোর জন্য ওয়ান নেশন ও কোয়ালিশনের রাজনৈতিক চাপ এবং অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার ব্যবসায়িক মডেলের মূল ভিত্তি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে আলবানিজ সরকার।

অভিবাসন বিভাগের প্রাক্তন উপ-সচিব আবুল রিজভী বলেছেন, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে তবে সরকারের পক্ষে ২০২৬-২৭ সালের জন্য ট্রেজারির ২,২৫,০০০-এর পূর্বাভাস পূরণ করার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না।অভিবাসীর আগমন কমাতে সরকারের হাতে শিক্ষার্থী ভিসাই প্রধান হাতিয়ার এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আকস্মিক ধাক্কা অনুভব করবে। গত বছর আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার ছিল ৪.৯ শতাংশ থেকে ১৫.৫ শতাংশ পর্যন্ত।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল এমপি বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া উচ্চমানের শিক্ষা প্রত্যাশী প্রকৃত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানো অব্যাহত রেখেছে। শিক্ষার্থী ভিসার সিদ্ধান্ত প্রতিটি স্বতন্ত্র আবেদনের যোগ্যতার ভিত্তিতে নেয়া হয়।

সূত্র: মানবজমিন

এফএইচ/বিডি


CBNA24  রকমারি সংবাদের সমাহার দেখতে হলে
আমাদের ফেসবুক পেজে ভিজিট করতে ক্লিক করুন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করতে পোস্ট করুন।

সংবাদটি শেয়ার করুন