ফিচার্ড সাহিত্য ও কবিতা

জন্মভূমি ||| শীতল চট্টোপাধ্যায়

জন্মভূমি ||| শীতল চট্টোপাধ্যায়


পাড়া থেকে পথ পায়ে-পায়ে গিয়েছে পুবের দিকে
পাড়ার বাইরে এসে তাকালে পথটা দূরেতে ফিকে ৷
ছোট এই গাঁয়ে জন্মে আমি ছুঁয়েছি গ্রামের মাটি
মাটির গন্ধ নিতে-নিতে রোজ জন্মভূমিতে হাঁটি ৷
গ্রামের মাটিতে ছিল থাকবার একতলা মাটি বাড়ি
পাশেতে গোয়াল, চাষের লাঙ্গল,ছিল যে গরুর গাড়ি৷
কালো গাই গরু,চেঁদো বাছুর, চাষ করা দু’টো হেলে
উঠোনে মা করে ধান সেদ্ধ চারপাকাটাকে জ্বেলে ৷
পুকুরে দুবেলা বাসন মাজা, দূর থেকে জল আনা
গ্রামটাতে ছিল গ্রাম রঙে মাখা তার সারা মন খানা ৷
বর্ষায় মাঠে ধান রোয়া শুরু সে তো চাষিদের উৎসব
মেঠো জলে পেয়ে চাঁদের আলো ব্যাঙেদের কলরব৷
গ্রামের পাড়াতে তৈরী হয়েছে নতুন ধানের গাদা
খড় পাকানো বড় দিয়ে চলে ধানেরই মরাই বাঁধা ৷
বনের হাওয়া ছোটে আর বলে – গ্রামেতেই আমি বই
গরুর গাড়িতে কুটুম আসে লাগানো রয়েছে ছই ৷
কুটুম এসেছে মাছ ধরা তাই পুকুরেতে জাল টেনে
জালের মাছ ওপরে লাফায় ধরা পড়ে গেছে জেনে ৷
নানান নামেতে পুকুর, পাখি, পুজো-পার্বণও নানা
সারা মাঠটায় মন উড়াতে রাখালেরই মালিকানা ৷
মাটির ওপরে দাগ টেনে ঘেরা- চু ..কিৎ কিৎ খেলা ঘর
লুকোচুরি খেলায় লুকিয়ে পড়ার গাছ ছিল পর-পর ৷
নাইতে গেলেই আমাদের দেখে রোগা নদী পেত ভয়
যা বলি জলের সরু দেহকে সবই তা শুনতে হয় ৷
খেলার সময়ে ছিঁড়লে – কাটলে  ডাক্তার বুনো পাতা
হাত দিয়ে দ’লে সে পাতার রস লাগালেই সারে ব্যাথা ৷
এই গ্রামেতেও ডিজিটাল যুগ এসে হাঁটে চুপি – চুপি
নতুন স্বপ্ন ফেরি দেখে গ্রাম সবই নিতে চায় লুফি ৷
গ্রামের মাটিতে স্বপ্ন চাষে মনমাটি ক্রমে হারা
নিত্য নতুন বদলে যাওয়ার গ্রামেতে নতুন ধারা ৷
কাঠের পুতুল ,মাটির পুতুল, বিয়ে হওয়া বর -কনে
সেই বাঁধা ঘর ভেঙে মোবাইল বেঁধেছে ঘর সে মনে ৷
প্রকল্পে গড়া জলাধার থেকে গ্রামে পাইপের জল
অন লাইনের ডেলিভারী দিতে গ্রামেতে বাইক দল ৷
লাঙ্গল-গরু ছুটি দিয়ে চলে ট্রাকটারে জমি চাষ
গরুর গাড়ির চাকা দু’টো খোলা উইপোকা করে বাস ৷
মাটি পথ মুছে ঢেলেছে ঢালাই  সদর দরজা থেকে
গরুর গাড়ির দাগ আঁকা পথ কালো পিচে গেল ঢেকে ৷
জাগেনা গ্রাম আর সূর্যের ডাকে , জাগে মোবাইল টোনে
ছোট গ্রামেতেও বড় বিশ্ব আঙুল ছোঁয়ানো ফোনে ৷
মাটির বাড়িতে খড়ের চাল মুছে যায় ধীরে-ধীরে
নতুন-নতুন পাকার বাড়ি দাঁড়ালো শক্ত শিরে ৷
রান্না হয়না মাটির উনুনে , চারপাকা গেছে নিভে
জ্বলে ওঠা গ্যাসে রান্নায় নেই আলু পোড়া স্বাদ জিভে ৷
গ্রামের প্রাণেতে গাছেদের প্রাণ হত্যা শবেতে পড়ে
কাটা তাল গাছে বাবুইয়ের বাসা স্মৃতিই রাখল গড়ে ৷
গ্রামের চেহারা মানুষের মন পাল্টানো গতি বাড়ে
অদৃশ্য ঝড়ে গ্রাম বুক থেকে গ্রামটাকে ভাঙে-কাড়ে ৷
আল্পনা দিয়ে লক্ষ্মীর পা বাঁকাচোরা করে আঁকা
সে আঁকায় ছিল পায়ের দাগেতে মায়ের ভক্তি মাখা ৷
দরজা মাথায় গিরী মাটি আঁকা মুছে সে দরজা পার
গ্রামে হারালো পুরনো নানান বইত যা লোকাচার ৷
জন্মভূমিটা – জন্মভূমিতে কোথাও নেই যে লেগে
এক চাষি দাদু ,বলে- সেই গ্রাম ‘ আমার দু’চোখে জেগে ‘৷
আমি বলি- তবে তাই থাক দাদু , দুই চোখ রেখো ভালো
তোমারই চোখেতে গ্রাম অস্তের লেগে থাক শেষ আলো ৷



সংবাদটি শেয়ার করুন