কানাডায় প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশির আশ্রয় আবেদন ঝুলে আছে
কানাডায় আশ্রয়ের আবেদন করা প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। দেশটির ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডের (আইআরবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশকে নিপীড়নের দেশ হিসেবে উল্লেখ করা ১৯ হাজার ২৭৫টি আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশিদের ৮২৪টি নতুন আবেদন আইআরবির রিফিউজি প্রোটেকশন ডিভিশনে পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে ৫২৪টি আবেদন গ্রহণ এবং ৫৯৭টি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এ ছাড়া ৬১টি আবেদন পরিত্যক্ত এবং ৪৫৬টি আবেদন প্রত্যাহার বা অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে।
বিপুলসংখ্যক মামলা জমে থাকায় অনেক বাংলাদেশি আবেদনকারীকে শুনানির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এই সময়ে আবেদনকারীদের কর্মসংস্থান, বাসস্থান, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
কমছে অনুমোদনের হার
১৫ জুলাই প্রকাশিত ঢাকা ট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন আগের তুলনায় কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। অভিবাসন আইনজীবীদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ২০২৩–২৪ সময়ে বাংলাদেশিদের আবেদন অনুমোদনের হার প্রায় ৭৭ শতাংশ থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা কমে এসেছে। ২০২৫–২৬ সময়ের প্রথমার্ধে অনুমোদনের হার প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে আসার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে প্রতিটি আশ্রয় আবেদন আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। আবেদনকারীর রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, যৌন অভিমুখিতা বা নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার কারণে ব্যক্তিগতভাবে নিপীড়ন কিংবা গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে কি না—তা প্রমাণের ওপর সিদ্ধান্ত নির্ভর করে।
কার্যকর হয়েছে এক বছরের নতুন নিয়ম
কানাডার নতুন Bill C-12 আইনের অধীনে আশ্রয় আবেদনের যোগ্যতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২০ সালের ২৪ জুনের পর প্রথমবার কানাডায় প্রবেশকারী কোনো ব্যক্তি প্রবেশের এক বছরের বেশি সময় পরে আশ্রয়ের আবেদন করলে সেটি সাধারণত আইআরবিতে শুনানির জন্য পাঠানো হবে না।
এই নিয়ম ২০২৫ সালের ৩ জুন বা তার পরে জমা দেওয়া আবেদনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আবেদনকারী কানাডা থেকে বেরিয়ে পুনরায় প্রবেশ করলেও এক বছরের সময় গণনা তাঁর প্রথম প্রবেশের তারিখ থেকেই হবে। তবে অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত দিয়ে প্রবেশেও কঠোরতা
কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র স্থলসীমান্তের অনুমোদিত প্রবেশপথের বাইরে দিয়ে কানাডায় প্রবেশ করে ১৪ দিনের বেশি সময় পরে আশ্রয়ের আবেদন করলে সেটিও সাধারণত আইআরবিতে পাঠানো হবে না।
একই সঙ্গে ‘সেফ থার্ড কান্ট্রি অ্যাগ্রিমেন্ট’ বহাল রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডার স্থলসীমান্তে এসে আশ্রয় চাইলে অধিকাংশ আবেদনকারীকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত পাঠানো হতে পারে। তবে কানাডায় নিকটাত্মীয় থাকা, অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়াসহ নির্ধারিত কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে।
কাজ ও চিকিৎসার সুযোগ
যোগ্য আশ্রয়প্রার্থীরা আবেদন জমা দেওয়ার সময় বিনা ফিতে ওপেন ওয়ার্ক পারমিটের অনুরোধ করতে পারেন। আবেদনটি যোগ্য বলে বিবেচিত হওয়া, বায়োমেট্রিকস প্রদান এবং বাধ্যতামূলক মেডিকেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হতে পারে।
ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার পর বৈধভাবে কাজ করার জন্য সোশ্যাল ইনস্যুরেন্স নম্বর বা SIN সংগ্রহ করতে হয়। যোগ্য আবেদনকারীরা ইন্টারিম ফেডারেল হেলথ প্রোগ্রামের অধীনে নির্দিষ্ট চিকিৎসাসেবাও পেতে পারেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরা সাধারণত আলাদা স্টাডি পারমিট ছাড়াই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারে।
শক্ত প্রমাণ ছাড়া আশ্রয় পাওয়া কঠিন
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সাধারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, আর্থিক সংকট কিংবা কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসের ইচ্ছা আশ্রয় পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। আবেদনকারীকে ব্যক্তিগতভাবে নিপীড়ন, নির্যাতন বা জীবননাশের বাস্তব আশঙ্কা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
আবেদনে অসংগত বক্তব্য, মিথ্যা রাজনৈতিক পরিচয়, সাজানো মামলা বা জাল কাগজপত্র পাওয়া গেলে দাবি প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। এর পাশাপাশি আবেদনকারীর ভবিষ্যৎ ভিসা ও অভিবাসন আবেদনেও গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।
কঠোরতা বাড়লেও কানাডার আশ্রয়ব্যবস্থা বন্ধ হয়নি। প্রকৃতপক্ষে নিপীড়ন বা গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশিরা এখনো আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন। তবে নতুন সময়সীমা মেনে দ্রুত আবেদন করা এবং যথাযথ প্রমাণসহ সঠিকভাবে মামলা উপস্থাপন করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: কানাডার ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড, কানাডা সরকার—নতুন আশ্রয় আইন, ঢাকা ট্রিবিউন



