ফিচার্ড মত-মতান্তর

নড়াইলে হিন্দু গ্রামে হামলা এবং আমাদের দায় || মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান

নড়াইলে হিন্দু গ্রামে হামলা এবং আমাদের দায় || মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান

গত ১৪ জুলাই আকাশ সাহা নামের এক কলেজছাত্রের আইডি থেকে প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মাদ সা.কে নিয়ে ফেসবুকের একটি পোস্টের নিচে বিতর্কিত কমেন্টের অভিযোগ ওঠে। এর জেরে শুক্রবার (১৫ জুলাই) বিকেলে আকাশ সাহার বাড়িসহ নড়াইলের লোহাগাড়া উপজেলার দিঘলিয়া গ্রামের অনেকগুলো হিন্দু পরিবারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওই গ্রামের হিন্দু পরিবারগুলোর অধিকাংশ সদস্য পাশ্ববর্তী গ্রামগুলিতে আশ্রয় নিয়েছেন।

এটি আমাদের দেশের জন্য চরম দুঃখজনক ঘটনা। কিছু দিন পরপরই এমন ঘটনা ঘটতে থাকে। এমন ঘটনা ঘটার পর এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনাও হয়। কিন্তু এর কোনো স্থায়ী সমাধানের পথ বের করা বড় দুস্কর হয়ে যাচ্ছে। তবে অবশ্যই মূল সমস্যা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। সমস্যা যেহেতু আমাদের, কাজেই সমাধানও আমাদেরই বের করতে হবে। রাসূল সা. বলেন, প্রতিটি রোগের প্রতিশেধক আছে, যে পায় সে পায়, আর যে পায় না সে পায় না। [তহাবি শরীফ] সমস্যা যতই জটিল হোক, এর সমাধান অবশ্যই আমাদের খুঁজে পেতে হবে। তবে রোগ যদি চিহ্নিত করা না যায় তাহলে যতই উন্নত ওষুধ দেয়া হোক তাতে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। সমস্যার মূল চিহ্নিত করে সমাধান করা উচিত।

এককথায় বলা চলে সাম্প্রদায়িকতার মূল হলো ধর্মের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া। বিশেষত পবিত্র ইসলাম ধর্মে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। এটা নিছক কোনো দাবি নয়। আলকুরআনুল কারীম ও প্রিয় নবী সা.-এর সীরাত আমাদের সামনে বিদ্যমান। নবীজীর শিক্ষা এ ক্ষেত্রে খুব স্পষ্ট। ইসলাম ধর্মের ন্যূনতম জ্ঞান যাদের আছে তারা অন্য ধর্মের নিরীহ মানুষের ওপর এভাবে হামলে পড়তে পারে না।

আকাশ সাহার ঘটনাটি যাচাই করে দেখা গেছে আকাশ সাহা এই কমেন্ট করেননি। বরং তার নামে আইডি খুলে অন্য কেউ এমন কমেন্ট করেছে। এভাবে ফেইক আইডি দিয়ে কমেন্ট করার বিষয়টি এই স্যোশাল মিডিয়ার যুগের এক সাধারণ ব্যাপার, বিষয়টি কারো অজানা নয়। যদি ধরেও নেয়া হয় আকাশ সাহা অপরাধ করেছেন তবু আইন নিজ হাতে তুলে নেয়ার অবকাশ ইসলামে নেই। একজনের অপরাধের দায় পুরো গোষ্ঠির উপর দেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। কেবল আকাশ সাহা নয়, প্রায় শতাধিক বাড়ি ঘর দোকান পাট এবং মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে।

ধর্মীয় অঙ্গনে যারা অসাম্প্রদায়িক বলে পরিচিত তারাও এসব ঘটনায় দায় দেন ভারতের ওপর। ভারতের উগ্রতা আমাদের দেশে চলে এসেছে বলে তারা যুক্তি দেন। ভারতের সিনেমা নাটক ও সংস্কৃতির সাথে সাথে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদি উগ্রতাও সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে উপচে পড়ে বলে তারা মন্তব্য করেন। কিন্তু এভাবে তুলনা করে আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িকতাকে হালাল করার কোনো যৌক্তিকতা দেখানো যাবে বলে মনে হয় না। ইসলামিক স্কলারদের মুখে এধরনের কথা একেবারেই বেমানান। রাসূল সা.-এর যুগে মক্কার অমুসলিমরা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন করত, একারণে কি রাসূল সা. বা তার সাহাবিরা মদীনায় বসবাসরত অমুসলিমদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেছেন? এমন একটি ঘটনাও ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বরং পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশনা হচ্ছে এই যে, কোনো ব্যক্তি অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না। [সুরা ফাতির আয়াত: ১৮]

ভারতের দেওবন্দ ধারার অনুসারী কাওমি মাদরাসার আলেমদের একাংশের দৃঢ় ধারণা, এসব উগ্রতা এদেশে আমদানি হয়েছে আরবদের থেকে। সালাফিজমের নামে এই উগ্রতা ছড়ানো হচ্ছে। এভাবে আহলে হাদীস ও সালাফিদেরকেও দোষারোপ করা হয় যে কোনো সাম্প্রদায়িকতার জন্য। কিন্তু পুরো একটা গোষ্ঠির ওপর উগ্রতার দায় চাপিয়ে দেয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত তাও আমাদের ভেবে দেখা উচিত। কারণ আরবের সবাই উগ্র নয় আর আমাদের সবাই ধোয়া তুলশি নয়। এবছর হজের ইমাম ছিলেন একজন সালাফি শায়খ। শায়খ মুহাম্মাদ ইসা সালাফি হওয়া সত্ত্বেও অনেক বেশি উদার এবং অসাম্প্রদায়িক। বরং আমাদের দেশের ধার্মিকরা তার সমালোচনা করছেন। কারণ তিনি ইহুদিদের সাথে কথা বলেছেন। হিন্দু বৌদ্ধ ও খৃস্টানদের সাথে আলাপ আলোচনা করেছেন। ইত্যাদি বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে তার ব্যাপারে।

মদীনার মসজিদে রাসূল সা. নাজরানের খৃস্টানের সাথে বসেছেন। খৃস্টানরা মসজিদে নববীতে অবস্থান করেছে এবং নবীজীর মসজিদেরই একপাশে তারা তাদের ধর্মের ইবাদত করেছে। এ ঘটনা হাদীস তাফসীর ও ইতিহাসের গ্রন্থে আজও আছে। কেউ কোনো অমুসলিমের সাথে বসলেই সে ধর্মচ্যুত হয়ে যায় না। একটি সমাজে বিভিন্ন ধর্ম মতের মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে গেলে পরস্পরে আলাপ আলোচনা করতে হবে। একসাথে বসতে হবে এবং যেসব কাজ একসাথে করা যায় সেসব কাজ একসাথে করতে হবে। অবশ্যই প্রত্যেকে তার দ্বীন ধর্ম ঠিক রেখেই সম্প্রীতি ও সৌহার্দের চেষ্টা করবে। ইসলামে এতে কোনো বিধিনিষেধ নেই। কোরআনের একটি আয়াত বা হাদীসভাণ্ডারের একটি হাদীসেও এটিকে নিরুৎসাহিত করা হয়নি। বরং নবীজীর সিরাতে অসংখ্য ঘটনা আছে, রাসূল সা. অমুসলিমদের উপঢৌকন গ্রহণ করেছেন এবং অমুসলিমদের আর্থিক সাহায্য করেছেন তাদের সাথে সুন্দরভাবে কথা বলেছেন। কখনওই তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেননি।
সালাফিদের মাঝেও অনেক ভালো মানুষ আছেন এবং হানাফিদের মাঝেও অনেক উগ্র মানুষ আছে কাজেই এভাবে বিশেষ সম্প্রদায়ের ওপর উগ্রতার ট্যাগ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না।

আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাটির দায় একদল ভারতের ওপর আরেকদল আরবের ওপর চাপিয়ে নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করেন। অনেকে ইংরেজ উপনিবেশ আমলের কথা টেনে আনেন।  একথা সত্য, উপনিবেশ আমলের আগে হাজার বছর ধরে উপমহাদেশে হিন্দু মুসলিম একসাথে ছিল। খুব সৌহার্দ ও সম্প্রীতির সাথে ছিল। কিন্তু অতীতে পড়ে না থেকে এবং অন্যকে দোষারোপের রাজনীতি না করে নিজেদের দায় স্বীকার করা জরুরি। যখন আপনি নিজের দায় স্বীকার করবেন না তখন কেবলই অন্যের সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হবেন এবং নিজের দায়িত্বে অবহেলার পরিচয় দেবেন।
নড়াইলের ঘটনাটি ঘটেছে শুক্রবার। হিন্দুদের উপর হামলার বহু ঘটনাই শুক্রবার ঘটে। এর একটা কারণ আমাদের মসজিদগুলো থেকে খতিব সাহেবরা ইসলাম রক্ষা করার আহ্বান জানান। খতিব সাহেবরা কোনো ভুল কথা বলেন না। কিন্তু উত্তেজিত জনতা নিয়ন্ত্রণহারা হয়ে যায়। উত্তেজিত জনতাকে ভুল পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে স্বার্থান্বেষী মহল। এসব ঘটনার জন্য আলেম উলামা ও খতিব সাহেবদের ওপর কোনোভাবেই দায় চাপানো যায় না। কারণ এসব হামলা তারা পরিচালনা করেন না। একটি ঘটনাও দেখানো যাবে না যেখানে কোনো ইসলামিক স্কলার বা আলেম এমন ঘটনা পরিচালনা করছেন। তবে ইসলামিক স্কলারদের আলোচনার পর যখন মুসল্লিদের মন নরম থাকে তখন একটা মহল তাদের আবেগ উসকে দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামার অপচেষ্টা করে।

এ থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। সর্বস্তরের মুসলিমদেরই এ বিষয়ে ভাবতে হবে। ইসলামের মূল শিক্ষা আমাদের ধারণ করতে হবে। হযরত ইবনু উমর রা. খাশি জবাই করে মাংস পাঠিয়েছেন ইহুদি প্রতিবেশির বাড়িতে। আপনি কি কখনও কোনো হিন্দু প্রতিবেশির বাড়িতে উপহার পাঠিয়েছেন? ইসলামের উদারতার শিক্ষা আমাদের হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। এর চর্চা করতে হবে। এবং সম্মিলিতভাবে এধরনের সাম্প্রদায়িকতার ঘটনাকে প্রতিহত করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাওফিক দান করুন। আমীন।

সূত্রঃ সময় অনলাইন

 



সংবাদটি শেয়ার করুন