ফিচার্ড বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

প্রযুক্তি কতটুকু বদলে দিচ্ছে বাংলা ভাষাকে?

প্রযুক্তি-কতটুকু-বদলে-দিচ্ছে-বাংলা-ভাষাকে

সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি। তার প্রয়োজনেই ধীরে ধীরে ভাষায় আসে বিবর্তন, কয়েক যুগের মধ্যেই নতুন সব শব্দ ও বাক্য চলিত ভাষায় স্থান করে নেয়। প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজকর্ম যেমন পাল্টে গেছে, তেমনই বাংলা ভাষায়ও এসেছে বড়সড় পরিবর্তন।

বাকি সব প্রযুক্তির তুলনায় পুরো বিশ্বেই ভাষার বিবর্তনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে ইন্টারনেট।

আজ সেটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা জেনারেটিভ এআই, যেমন—চ্যাটজিপিটি বা গুগল জেমিনি। এআইয়ের তৈরি কনটেন্টের মাধ্যমে ভাষায় পরিবর্তন আসবে আরো দ্রুত।

 

ব্যবহৃত হচ্ছে জটিল সব শব্দ

শুরু থেকেই কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের প্রধান ভাষা বা লিঙ্গুয়া ফাংকা হচ্ছে ইংরেজি। এর ফলে যত বেশি তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তি পৌঁছতে শুরু করেছে, ততই একেবারে প্রান্তিক মানুষও শুরু করেছে ইংরেজি চর্চা।

এর প্রভাবে আজ বাংলার মধ্যেও বায়োমেট্রিক বা ইউটিউব-এর মতো বেশ জটিল শব্দও হরহামেশা ব্যবহৃত হচ্ছে। ফোন ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পরিভাষা যেমন—মেসেজিং, ডায়াল, ডাটা বা রিচার্জ শব্দগুলো প্রায় সবাই ইংরেজিতে পড়তে পারে। ইংরেজি ভাষায়ও প্রবেশ করতে শুরু করেছে অন্যান্য ভাষার শব্দ, ফলে তৈরি হয়েছে হিংলিশ, কংলিশ বা স্প্যাংলিশের মতো অপভ্রংশ। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বের প্রতি প্রান্তের নানা সংস্কৃতি একত্র হচ্ছে সহজেই, যেসব আদান-প্রদান হয়তো ১০০ বছর আগেও সম্ভব ছিল না, সেটাও হচ্ছে আজ। ফলে দ্রুতই ভাষাগুলোর মধ্যে চলছে শব্দ আদান-প্রদান।

 

তৈরি হচ্ছে নতুন সব শব্দ ও ব্যাকরণ

ইন্টারনেট সংস্কৃতির ফলে প্রতিনিয়ত নতুন সব শব্দ ও ব্যাকরণের সৃষ্টি হচ্ছে। মিম-কালচারের ফলে অদ্ভুত সব শব্দ যেমন রিজ বা ক্লাউট আজ অভিধানেও স্থান করে নিয়েছে। এদিকে প্রচলিত কিছু শব্দ, যেমন—ট্যাবলেট বা ক্লাউড আজ সম্পূর্ণ নতুন অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলায়ও এর প্রভাব দেখা গেছে, আজ বিকাশ করা অর্থ মোবাইল ওয়ালেটের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, বা এমবি অর্থ মোবাইল ইন্টারনেট।

এ ধরনের অপভ্রংশ ধীরে ধীরে অভিধানে একসময় জায়গাও করে নেবে। ইন্টারনেটের বিভিন্ন অংশের আছে নিজস্ব ব্যাকরণ। যেমন—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সময়ই দেখা যায় এক শব্দ বা অসম্পূর্ণ বাক্য ব্যবহার করেই কমেন্ট করছে ব্যবহারকারীরা, অন্যরাও সেভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে আলোচনা। অতিশয়োক্তির ব্যবহার বহু আগেই মূলধারায় প্রবেশ করেছে, আজ সিনেমা-নাটকেও ব্যবহার করা হচ্ছে ‘মাইরালা’র মতো শব্দ। ইন্টারনেটের আগে এত দ্রুত নতুন শব্দের প্রসার ঘটত না।

 

ইমোজি এখন লিখিত ভাষার অংশ

নানা মেসেঞ্জার ব্যবহারের ফলে আবেগ প্রকাশের জন্য ইমোজির ব্যবহারও ধীরে ধীরে লিখিত ভাষার অংশ হয়ে উঠেছে। চিঠির জায়গা ই-মেইল আর ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং নিয়ে নেওয়ায় ইমোজিকে আজ লিখিত অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের অংশ বলা যায়। ইমোজির ব্যবহার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আজ আনুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টগুলোও করছে, আগামী দিনে সেটা আনুষ্ঠানিক ভাষার অংশও হতে পারে।

 

এখনো পিছিয়ে বাংলা ভাষা

প্রযুক্তিকে ইংরেজিকেন্দ্রিক করে রাখা নিয়ে তুমুল সমালোচনাও উঠেছে বারবার। বলা যায়, নীরব আন্দোলনের মাধ্যমেই বেশ কিছু ভাষাকে প্রযুক্তি দুনিয়ায় নিজেদের জায়গা করে নিতে হয়েছে। আমাদের দেশে আইন করা হয়েছে যাতে কম্পিউটারের কি-বোর্ডে থাকে বাংলা লে-আউট, দেশে বিক্রি হওয়া প্রতিটি ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বা ডেস্কটপে বাংলা ইনপুট ও ইন্টারফেসের অপশন রাখা করা হয়েছে বাধ্যতামূলক। প্রযুক্তিপণ্য ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বহুবার অনুরোধ করার পর তারা পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরের ভাষাগুলো সমর্থন করতে শুরু করেছে, যদিও এখনো বাংলা সমর্থনে পিছিয়ে আছে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান।

 

বাংলা এআই সেবা

অনলাইনে নানা সেবা বাংলায় আনা নিয়ে বেশ কিছু প্রজেক্ট চলমান। নতুনের মধ্যে আছে সঠিক ডট এআই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে বাংলা বানান ও ব্যাকরণ ঠিক আছে কি না সেটা পরীক্ষার সেবা। এর পাশাপাশি সেটি ব্যবহার করে দীর্ঘ লেখার সারাংশ তৈরি এবং বেশ কিছু কপিরাইটিং কনটেন্টও তৈরি করা যায়। আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রজেক্ট বেঙ্গলি ডট এআই। তারা তৈরি করে যাচ্ছে বাংলা ভাষায় দক্ষ এআই ট্রেনিং দেওয়ার জন্য ডাটাসেট। এর মধ্যে আছে হাতে লেখা বাংলা অক্ষর ও শব্দের ভাণ্ডার তৈরি, কথোপকথনের রেকর্ড সংগ্রহ থেকে বাংলা বইয়ের স্ক্যান সংগ্রহের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও খরচসাপেক্ষ সব উদ্যোগ। এসব ডাটাবেইস ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আরো নিখুঁত ও সাবলীলভাবে বাংলা বুঝতে ও ব্যবহার করতে পারবে এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করা যাবে বলে সে দলটি আশাবাদী।

 

জেমিনি আর বাংলা

গুগল তাদের সর্বশেষ প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছে জেনারেটিভ এআই জেমিনি। চ্যাটজিপিটির মতোই এটিও চ্যাটবট হিসেবে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে কাজ বুঝে নিতে পারে, তৈরি করতে পারে লিখিত কনটেন্ট, সফটওয়্যারের জন্য কোড এবং প্রম্পট অনুযায়ী ছবিও। জেমিনি সম্প্রতি বাংলা ভাষা বুঝতে ও ব্যবহার করতে শুরু করেছে। বড়সড় প্রতিষ্ঠানের তৈরি শক্তিশালী এআই সেবার মধ্যে জেমিনিই প্রথম বাংলায় কাজ করছে, যদিও তার বাংলা ভাষার ওপর দখল এখনো দুর্বল। জেমিনির লেখা বাক্যের গঠন ও ব্যবহৃত শব্দগুলো বেশ খটমটে, অনেকটা লাতিন ভাষাগুলোর মতো। বাংলা এআই ট্রেনিং করার জন্য ভালো মানের ডাটাসেটের অভাব জেমিনির কথোপকথনেই পরিষ্কার। জেমিনি ছাড়াও আরো বেশ কিছু এআই কনটেন্ট জেনারেটিভ এআই সেবাও বাংলা নিয়ে কাজ করছে, যেমন—সিম্পলিফায়েড এআই। তাদের বাংলা ডাটাসেটেও আছে চরম সীমাবদ্ধতা।

 

কমছে ভাষার মান

ইন্টারনেট সংস্কৃতির প্রভাবে ভাষার মান নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক গবেষক ও ভাষাবিদ। সঠিক বাক্য গঠনে অবহেলা, শব্দের প্রকৃত অর্থের বিকৃতি থেকে শুরু করে কিছু ক্ষেত্রে অশ্লীলতাও ইন্টারনেটের কারণে দৈনন্দিন কথোপকথনের অংশ হয়ে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে তাঁরা শঙ্কিত। প্রচুর ওয়েবসাইটের কনটেন্ট, ভিডিওর স্ক্রিপ্ট থেকে সাহিত্যের বইও আজ এআইয়ের মাধ্যমে লেখা হচ্ছে। সেসব সেবার মূল ভিত্তি যেসব ডাটাসেট, সেগুলো কতটুকু নির্ভুল সেটা নিয়ে প্রশ্নও কাটছে না। এআইয়ের লেখা কনটেন্টে শুধু ভুলই রয়ে যাচ্ছে তা নয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুল শনাক্ত করার জন্যও ব্যবহৃত হচ্ছে আরেকটি এআই সেবা। সেটিও হয়তো একই ডাটাসেটের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া, তাই প্রথম এআইয়ের ভুল সেটি ধরতেও পারছে না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে লিখিত ভাষার ধরনই বদলে যেতে পারে। তবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেলে আজ যেটাকে ভুল বা অপভ্রংশ বলা হচ্ছে, সেটাই হয়তো আগামী দিনে শুদ্ধ ভাষায় পরিণত হবে।

সূত্রঃ কালের কন্ঠ (এ এম তাহমিদের রিপোর্ট)

CBNA24 ডেস্ক রিপোর্ট (এফ/এইচ, বিডি)

সংবাদটি শেয়ার করুন