জীবন ও স্বাস্থ্য ফিচার্ড

কালোজিরার উপকারিতা ও কালোজিরা খাওয়ার নিয়ম

কালোজিরার-উপকারিতা-ও-কালোজিরা-খাওয়ার-নিয়ম

কালোজিরা, একটি অদ্ভুত সুপারফুড, যা আমাদের শরীরকে অনেক অদৃশ্য রোগ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এর ছোট্ট দানাগুলো ভিটামিন ও মিনারেলের ভাণ্ডার, তাই কালোজিরা কে বলা হয় সব রোগের মহৌষধ। কালোজিরার বৈজ্ঞানিক নাম nigella sativa । এর আরো নাম আছে, যেমন- কালো কেওড়া, রোমান করিয়েন্ডার বা রোমান ধনে, নিজেলা, কালঞ্জি ইত্যাদি। তবে যে নামেই ডাকা হোক না কেন কালো এই বীজের স্বাস্থ্য উপকারিতা অপরিসীম। আসুন দেখা যাক কালোজিরার উপকারিতা ও কালোজিরা খাওয়ার নিয়ম।

 

কালোজিরা খাওয়ার উপকারিতা :

কালোজিরা একটি প্রাকৃতিক ক্যামিক্যাল ভিটামিন এবং মিনারেলের উৎস, যা আমাদের শরীরের অতিরিক্ত চর্বি এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। কালোজিরার উপকারিতা অপরিসীম। এটি ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-বি২, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড এবং অ্যামিনো এসিড সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান প্রদান করে।

১। স্মরণ শক্তি বৃদ্ধি : এক চা-চামচ পুদিনা পাতার রস বা কমলার রস বা এক কাপ চায়ের সাথে এক চা-চামচ কালোজিরার তেল মিশিয়ে খেলে মস্তিস্কের রক্ত সঞ্চলন বৃদ্ধি হয় এবং আমাদের দেহে রক্ত সঞ্চালন ঠিকমতো হয়। মস্তিস্কের রক্ত সঞ্চলন বৃদ্ধি পেলে তা আমাদের স্মরণ শক্তি বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে।

২। হার্টের বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে : এক চা-চামচ কালোজিরার তেল সহ এক কাপ দুধের সাথে মিশিয়ে খেলে এবং শুধু কালোজিরার তেল বুকে নিয়মিত মালিশ করলে হার্টের বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

৩। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখতে : কালোজিরা রক্তের শর্করার মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং নিম্ন রক্তচাপকে বৃদ্ধি করে ও উচ্চ রক্তচাপকে হ্রাস করে।

৪। ডায়বেটিক নিয়ন্ত্রণে: ডায়াবেটিক উপশমে বেশ কার্যকরী কালোজিরা। এক চিমটি পরিমাণ কালোজিরা এক গ্লাস পানির সঙ্গে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

৫। দুগ্ধ দানকারী মায়েদের দুধ বৃদ্ধির জন্য : যেসব মায়েদের বুকে পর্যাপ্ত দুধ নেই অর্থ্যাৎ বাচ্চারা পর্যাপ্ত দুধ পায় না, সেসব মায়েদের জন্য কালোজিরা এক অনন্য মহৌষধ। রাতে শোয়ার আগে ৫-১০ গ্রাম কালোজিরা মিহি করে দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খান মাত্র ১০-১৫ দিনে বুকের দুধের প্রবাহ বাড়বে। এছাড়াও কালিজিরা ভর্তা করে ভাত বা রুটির সাথে খেতে পারেন।

৬। শিশুর দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি করতে কালোজিরা : দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের কালোজিরা খাওয়ালে শিশুর দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি দ্রুত ঘটে এবং শিশুর মস্তিষ্কের সুস্থতা এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

৭। ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখে : নিয়মিত কালোজিরা খেলে ত্বকের গঠনের উন্নতি ও ত্বকের তারুণ্য বৃদ্ধি পায়। এতে লিনোলেইক ও লিনোলেনিক নামের এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড থাকে যা পরিবেশের প্রখরতা, স্ট্রেস ইত্যাদি থেকে আপনার ত্বককে রক্ষা করে এবং ত্বককে সুন্দর করে ও ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখে। এছাড়াও মধু ও কালোজিরার পেস্ট বানিয়ে ত্বকে লাগিয়ে আধাঘন্টা পর ধুইলে ত্বক উজ্জ্বল হবে। আপেল সাইডার ভিনেগারের সাথে কালোজিরা মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে ব্রণ এর উপর লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন। এভাবে কয়েকদিন লাগালে ব্রণ দূর হবে এবং ত্বকে কোন ব্রণের দাগ হবে না।

৮। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে কালোজিরা : নিয়মিত কালোজিরা খেলে শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সতেজ থাকে এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে যে কোন জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেহকে প্রস্তুত করে তোলে। ১ চামচ কালোজিরা অথবা কয়েক ফোটা কালোজিরার তেল ও ১ চামচ মধুসহ প্রতিদিন সেবন করলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।

৯। যৌন শক্তি বৃদ্ধির জন্য : কালোজিরা নারী-পুরুষ উভয়ের যৌন ক্ষমতা বাড়ায়। কালোজিরা খাবারের সাথে খেলে বা এক-চামচ জাইতুন তেল সমপরিমাণ কালোজিরার তেল ও মধু মিশিয়ে খেলে পুরুষের স্পার্ম সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং পুরুষত্বহীনতা থেকে মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি করে। এছাড়াও পুরুষের লিঙ্গ শক্ত না হওয়া, দ্রুত বীর্যপাত বা অন্যান্য যৌন সমস্যার জন্য কালোজিরা ও মধু প্রতিদিন সকালবেলা খালি পেটে সেবন করলে উপকার পাওয়া যায়।

পুরুষাঙ্গে কালোজিরার তেল ব্যবহারের নিয়ম:

পুরুষাঙ্গে কালোজিরার তেল নিয়মিত মাখলে পুরুষাঙ্গ শক্ত ও মোটা হয়। যাদের দ্রুত বীর্যপাতের সমস্যা রয়েছে তাদের নিয়মিত পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি প্রতিদিন কয়েক ফোঁটা কালো জিরার তেল হাতের তালুতে নিয়ে লিঙ্গের গোড়ার দিক থেকে সামনের দিক পর্যন্ত ভালোভাবে মালিশ করলে কার্যকরী ফল পাবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে লিঙ্গে তেল মালিশ করার সময় যেন উত্তেজিত হয়ে বীর্যপাত না হয়, তাহলে তা উপকার না করে ক্ষতির কারণ হবে।

১০। বাতের ব্যাথা ও বিভিন্ন প্রকার চর্মরোগ সারাতে : ব্যাথার স্থান বা চর্মরোগে আক্রান্ত স্থান ধুয়ে পরিষ্কার করে তাতে এক চামচ কাঁচা হলুদের রসের সাথে সমপরিমাণ কালোজিরার তেল মিশিয়ে নিয়মিত মালিশ করলে বাতের ব্যাথা দূর হবে ও চর্মরোগে আক্রান্ত স্থান সেরে উঠবে।

১১। মাথা ব্যাথা নিরাময়ে : মাথা ব্যাথা নিরাময়ে কালো জিরার তেল অত্যন্ত কার্যকরী। পরিমান মত কালো জিরার তেল মাথায়, কপালে উভয় চিবুকে ও কানের পার্শ্ববর্তি স্থানে মালিশ করলে মাথা ব্যাথা দ্রুতই কমে যাবে।

১২। দাঁত ব্যথা দূরীকরণে : দাঁতে ব্যথা হলে কুসুম গরম পানিতে কালোজিরা দিয়ে কুলি করলে ব্যথা কমে যায়। এছাড়াও মুখের ভেতরে জিহ্বা, তালু, দাঁতের মাড়ির জীবাণু ধংস করে।

১৩। সর্দি-কাশি, শ্বাস কষ্ট বা হাঁপানি রোগ সারাতে : এক চামচ কালোজিরার সঙ্গে তিন চামচ মধু ও দুই চামচ তুলসী পাতার রস মিশিয়ে খেলে জ্বর, ব্যথা, সর্দি-কাশি দূর হয়। হাঁপানী বা শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যায় কালোজিরা অনেক বেশি উপকারী। গরম ভাত বা রুটির সাথে কালোজিরার ভর্তা খান অথবা এক চামচ কালোজিরার তেল, এক কাপ দুধ বা রং চায়ের সাথে খাদ্য তালিকায় রাখুন। এতে হাঁপানি বা শ্বাস কষ্টজনিত সমস্যা উপশম হবে।

১৪। চুল পড়া বন্ধ করতে : কালিজিরার পুষ্টিগুন চুল পর্যন্ত পৌছে যায় ফলে চুল পড়া বন্ধ হয়, নতুন চুল গজায় ও চুলের গোড়া মজবুত হয়। আরো ভালো ফল পেতে নিয়মিত চুলে কালোজিরার তেল মালিশ করুন।

১৫।  শান্তিপূর্ণ ঘুমের জন্য : কালোজিরার তেল মাথায় ও শরীরে ব্যবহারে  রাতভর শান্তিপূর্ণ ঘুম হয়।

১৬। স্নায়ুবিক উত্তেজনা : কফির সাথে কয়েক ফোটা করে কালোজিরার তেল সেবন করলে স্নায়ুবিক উত্তেজনা দূর হয়।

১৭। আঁচিল : আঁচিলের উপর হেলেঞ্চা মুল দিয়ে ঘষার পর কালোজিরা তেল লাগান। এভাবে ১৫-২০ দিন নিয়মিত লাগালে আঁচিল ঝরে পরে যাবে।

১৮। অনিয়মিত মাসিক স্রাব বা মেহ/প্রমেহ রোগের ক্ষেত্রে : এক কাপ কাঁচা হলুদের রস বা সমপরিমাণ আতপ চাল ধোয়া পানির সাথে এক চা-চামচ কালোজিরার তেল মিশিয়ে দৈনিক ৩বার করে নিয়মিত সেবন করলে অনিয়মিত মাসিক স্রাব বা মেহ/প্রমেহ রোগের ক্ষেত্রে শতভাগ কার্যকরী।

১৯। গ্যাষ্ট্রীক, আমাশয়, জন্ডিস বা লিভারের বিভিন্ন সমস্যা নিরাময়ে : একগ্লাস ত্রিপলার শরবতের সাথে এক চা-চামচ কালোজিরার তেল নিয়মিত সেবন করলে আপনার গ্যাষ্ট্রীক, আমাশয়, জন্ডিস বা লিভারের বিভিন্ন সমস্যা নিরাময় হবে।

২০। হজমের সমস্যা দূরীকরণে ও লিভারের সুরক্ষায় : খাবার হজমে সমস্যা হলে এক বা দুই চামচ কালিজিরা বেটে পানির সঙ্গে খাবেন। প্রতিদিন দু-তিনবার খেলে এক মাসের মধ্যে আপনার হজমশক্তি বেড়ে যাবে এবং পেট ফাঁপা ভাবও দূর হবে। এছাড়াও লিভার ক্যান্সারের জন্য দায়ী আফলাটক্সিন নামক বিষ ধ্বংস করে কালিজিরা।

এছাড়াও অরুচি, পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া, গলা ব্যথা, চোখে ব্যাথা পুরাতন মাথা ব্যথা, মাইগ্রেন, খোসপঁচড়া, শ্বেতি, দাদ, একজিমাতেও কালোজিরা সফল ঔষধ হিসেবে কাজ করে। এটি ভাইরাস প্রতিরোধক, টিউমার এবং ক্যান্সার প্রতিরোধক, ব্যকটেরিয়া এবং কৃমিনাষক, রক্তের স্বাভাবিকতা রক্ষাকারক, যকৃতের বিষক্রিয়ানাষক, এলার্জি প্রতিরোধক, বাতব্যথা নাশক। অরুচি, উদরাময় নিরাময়ে কালোজিরা সহায়তা করে। এতে রয়েছে ক্ষুধা বাড়ানোর উপাদান। পেটের যাবতীয় রোগ-জীবাণু ও গ্যাস দূর করে ক্ষুধা বাড়ায় এবং দেহের কাটা-ছেঁড়া শুকানোর জন্য কাজ করে। এছাড়া শরীরে সহজে ঘা, ফোড়া, সংক্রামক রোগ (ছোঁয়াচে রোগ) হয় না। তিলের তেলের সঙ্গে কালিজিরা বাঁটা বা কালোজিরার তেল মিশিয়ে ফোড়াতে লাগালে ফোড়ার উপশম হয়।

 

প্রতিদিন কতটুকু কালোজিরা খাওয়া উচিত?

আপনার প্রতিদিন কতটুকু কালোজিরা খাওয়া উচিত? এ প্রশ্নের নির্ধারিত কোন উত্তর নেই। আপনি প্রতিদিন কতটুকু কালোজিরা খাবেন তা আপনার জীবনযাপনের ধরণ, বয়স, লিঙ্গ, এবং শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। তবে  সাধারণভাবে একটি আদর্শ পরিমান হলো প্রতিদিন ১-২ গ্রাম বা ১-২ চা-চামচ খাওয়া উপযুক্ত। প্রয়োজন অনুসারে এর ব্যবহার বা খাওয়ার পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী আপনার চিকিৎসকের কাছে পরিমান জেনে নিন।

 

প্রতিদিন কালোজিরা খেলে কি ক্ষতি হয়?

আপনি যদি প্রতিদিন পরিমানমত কালোজিরা খান তাহলে এর কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা কোন ধরনের ক্ষতি নেই। তবে যদি প্রতিদিন অতিরিক্ত কালোজিরা খান তাহলে পেট খারাপ এবং বদহজম জনিত সমস্যা হতে পারে। কিছু কিছু লোকের কালোজিরা খেলে অ্যালার্জির সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, তাই কালোজিরা গ্রহণ করার আগে যেকোনো সম্ভাব্য অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার। গর্ভাবস্থায় ও দুই বছরের কম বয়সের বাচ্চাদের কালোজিরার তেল সেবন করা উচিত নয়। তবে বাহ্যিক ভাবে ব্যবহার করা যাবে। এছাড়াও অধিক পরিমান কালোজিরা খেলে অত্যধিক চর্বি, এবং অতিরিক্ত গ্লাইসেমিক স্তর বৃদ্ধি পায়।

একটি স্বাস্থ্যকর ও সুস্থ জীবনের জন্য কালোজিরা ও কালোজিরার তেল একটি অমূল্য ঐতিহ্যিক উপাদান, যা আপনার জীবনকে উজ্জ্বল করতে সাহায্য করতে পারে। নিয়মিত কালোজিরা খান, এর সঠিক ব্যবহার করুন এবং জীবনকে সুন্দর করুন।

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট (এফএইচ/বিডি)
সংবাদটি শেয়ার করুন